হিমাংশু সিংহ: বাংলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ভোট চাইতে আসছেন নরেন্দ্র মোদি? আগামী শনিবার ব্রিগেড তাঁর মহতী সভা। তেমন সাড়া না পড়লেও কাড়ানাকাড়া বাজতে শুরু করেছে উচ্চগ্রামে। এক সপ্তাহে ইরানে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় দু’হাজার। আর এসআইআরে বাংলায় বাদ ৬৩ লক্ষ, ঝুলে আরও ৬০ লক্ষ। সব মেলালে সওয়া এক কোটিরও বেশি মানুষকে ‘ভ্যানিশ’ করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন থুড়ি জ্ঞানেশ কুমার। সংখ্যাটা মোটেই হেলাফেলার নয়। ভোটার তালিকার প্রায় সাড়ে ১৬ শতাংশ! তাতেই বোঝা যাচ্ছে কোন হামলার তীব্রতা বেশি। ঢাল-তরোয়াল-সংগঠন কিচ্ছু না থাকলেও বিজেপি বাংলা দখলে কতটা বেপরোয়া। ইরানের মতো এখানে যুদ্ধ লাগলেও এত মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত না। রাজ্যের মহামান্য সিইও বলেছেন, তিনি নাকি ওই ঝুলে থাকা ৬০ লক্ষের ব্যাপারে কিছুই জানেন না, দায়িত্বও নেবেন না। কী আশ্চর্য প্রতিক্রিয়া। তাঁর আরও উন্নতি হোক, তিনি শতায়ু হোন। কিন্তু প্রশ্ন উঠবেই, তাহলে জানবে কে, নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ? ব্রিগেডে দাঁড়িয়ে শতাব্দীর সেরা গুজরাতিকে এই প্রশ্ন করবেন না বাংলার মানুষ? জানতে চাইবেন না, কেন বছরের পর বছর বাংলায় একশো দিনের কাজের টাকা বন্ধ। জানতে চাইবেন না, বাকি সব জায়গায় এসআইআর শেষ, তালিকাও চূড়ান্ত। বাংলায় কেন অসম্পূর্ণ। নির্বাচন কমিশন কি বাংলা দখলে নরেন্দ্র মোদির ‘উপেন’-এর ভূমিকায়। যত ফষ্টিনষ্টিই করুন ওই দু‘বিঘার বাংলা আর আপনার পাওয়া হল না!
ঘরে বাইরে লড়াই তীব্র হচ্ছে। ভোটের আগে বাংলা কি কোনোভাবে তার বাইরে থাকতে পারে? শুক্রবার এক ধাক্কায় রান্নার গ্যাসের দাম বেড়েছে সিলিন্ডারে ৬০ টাকা। ভোটার লিস্টের সঙ্গে হেঁশেলেও আগুন লাগিয়েছে কেন্দ্রের সরকার। ৯৩৯ টাকা দিয়ে ক’জনের গ্যাস কেনার ক্ষমতা আছে, এরপরও কোনো প্রশ্ন না তুলে ভোট দেবেন বিজেপিকে? উজ্জ্বলা প্রকল্পেরই বা কী হাল? গরিব মানুষ, পরিযায়ীদের পেটে লাথি মেরেছে কোন সরকার? আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে সরকার স্পিকটি নট, কিন্তু বাড়লে তেরাত্তিরও কাটে না। অগ্নিগর্ভ মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ট্র্যাজেডির তুলনায় বাংলার ৬০ লক্ষ মানুষের ভাগ্যকে অনিশ্চয়তার দাঁড়িপাল্লায় ঝুলিয়ে রেখে নির্বাচন কমিশনের তালিকা প্রকাশ কি কম বড়ো প্রহসন? অ্যাডজুডিকেশনের আড়ালে এই ৬০ লক্ষ মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার বশংবদ কমিশনকে কে দিল? কেন্দ্রের সরকার না মোদি সাহেব স্বয়ং? দু’দিন বাদে নির্বাচন অথচ তালিকাটাই চূড়ান্ত নয়। এত বড়ো অন্যায় কার প্ররোচনায়? মতুয়া, রাজবংশী, আদিবাসী, বনবাসী, সংখ্যালঘুদের নাম বাদের প্রতিযোগিতা চলছে। বিশেষ করে কোপ পড়েছে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ, মালদহ, দুই দিনাজপুর ও দুই ২৪ পরগনায়। এটা সুপরিকল্পিত চক্রান্ত নয়? ওই বিচারাধীন ভোটারদের মধ্যে কজন এবার ভোট দিতে পারবেন, তা নিয়ে বিভ্রান্তি চরমে। আর সিইও সাহেব বলে দিলেন ওটা তাঁর দায়িত্ব নয়! তাঁর মাথায় কার আশীর্বাদের হাত যে এত বড়ো কথাটা বলে দিলেন অবলীলায়? একটুও গলা কাঁপল না।
বিগত চার মাস ধরে ক্রমাগত হেনস্তা আর অসম্মান সহ্য করছে বাংলার মানুষ। তাদের জমা দেওয়া তথ্যপ্রমাণের নিষ্পত্তি আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শেষ করা উচিত। তারপর মোদিজি ব্রিগেডে আসুন। না হলে বিজেপির চক্রান্ত ভেস্তে দিয়ে বাংলার মানুষ কিন্তু মুখের উপর জবাব দেবে। যার রেশ ছড়িয়ে পড়বে ১৪ মার্চের ব্রিগেডের সভাতেও। লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির নাম করে বাংলার মানুষকে জব্দ করার নাটকে পদ্ম ফুটবে না, বরং ভরে যাবে জোড়া ফুলে। ধর্মতলায় বিগত দু’দিনের ধরনা কর্মসূচিতে প্রত্যয়ী মমতার সামনে মানুষের ঢলই প্রমাণ করে দিচ্ছে এই অবিচারের বারোমাস্যার প্রতিক্রিয়া বিজেপির পক্ষে মোটেই সুখকর হবে না। ষড়যন্ত্রের রথ মুখ থুবড়ে পড়বে বাংলার মাটিতেই। বহিরাগত অবাঙালি প্রধান দলটাকে মাথায় চড়তে দেওয়ার ভুল এরাজ্যের মানুষ করবে না। বাংলা থাকবে বাঙালির অস্মিতাকে পাথেয় করেই। নির্বোধ বনসল, যাদবরা আর সময় নষ্ট না করে এখনই রিটার্ন টিকিট কেটে ফেলুন।
ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান কিংবা চীনের লড়াইয়ের পরিস্থিতি তৈরি হলে ডাক পড়ে অজিত দোভালের। একাশি পেরনো মারকাটারি আইপিএস বলে কথা। বাংলায় বিজেপির লড়াইটা যত কঠিন হচ্ছে, ক্ষমতা দখল যত দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে, ততই দিল্লির নেতৃত্ব আঙুল বেঁকাচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ঘি উঠছে না। ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার প্রাক্কালে তামিলনাড়ুর বিতর্কিত রাজ্যপাল, অজিত দোভালের একান্ত বিশ্বস্ত আর এন রবিকে উড়িয়ে আনা হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, গন্ধটা মোটেই সুবিধার নয়! ট্রাম্পের লক্ষ্য ইরান, ভেনেজুয়েলা, কিউবা তো মোদির টার্গেট বারবার হাত ফসকে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গ। তাহলেই গোটা পূর্ব ও উত্তরপূর্ব ভারতে বিজেপির নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ হয়। টার্গেট তাই নিঃসন্দেহে কলকাতা। শুধু পেট ভর্তি খিদে নয় শরীর মন জুড়ে দখলের লিপ্সা। ডিএনএ পরীক্ষা না করেই বলে দেওয়া যায়, দখলদারিতে তিনি ট্রাম্পের ছোটো ভাইটি!
বাংলা দখলে ব্যর্থতা ঢাকতেই পদে পদে রাজ্যের উন্নয়নকে স্তব্ধ করে সাধারণ মানুষের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনছে গেরুয়া ব্রিগেড। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেমন প্রত্যাঘাতের আগুনে জ্বলছে মধ্যপ্রাচ্য। তেমনি মোদি-অমিত শাহের বিরুদ্ধে ফুঁসছে বাংলার মানুষ। কিন্তু বুঝেছ ‘উপেন’ ওটা দিতেই হবে বলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির চক্রান্ত হলে, যেটুকু গেরুয়া ভোট অবশিষ্ট আছে তাও ব্যুমেরাং হবে। তখন পাঁচটা আসনও গেরুয়া শিবির পাবে না, সেই খবর শমীকবাবুদের জানা আছে নিশ্চয়ই। তাই ওই ভুল করতে যাবেন না। হায় প্রযুক্তি, হায় আধুনিক অস্ত্র, হায় তোমার বৈভব। ইতিহাস সাক্ষী, বিশ্ব সংসারে দোর্দণ্ডপ্রতাপদের বধ করবে যে, সে সবার অলক্ষ্যে নিরাপদ গোকুলেই বাড়ে! আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে জাতীয় রাজনীতিতে একই কথা। ট্রাম্পের যদি চাই ভেনেজুয়েলার ‘মাদুরো’কে, অমিত শাহের চাই বাক্সবন্দি নীতীশ কুমারকে! একসঙ্গে ভোটে জিতে তিন মাসের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী পদ কেড়ে নেওয়ার নিঃশব্দ অপারেশন! রাজনৈতিক বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কাঁথায় আগুন। ওই ভয়ংকর দলটায় আস্থা রাখবেন? সলিল চৌধুরীর দু’কলি শুনলেই যেমন বলে দেওয়া যায় সুরটা কার, পাটলিপুত্রে নীতীশ জমানার নিঃশব্দ অবসানের আবহসঙ্গীতেও অমিত শাহের দরবারি গুনগুনটা বড্ড চেনা। মহারাষ্ট্রের একনাথ সিন্ধের কথা মনে নেই আপনাদের? বিহারে অপারেশন ভেনেজুয়েলারই কুনাট্যের ছাপ দেখছেন অনেকে। বিগত দু’দশক ডাইনে বাঁয়ে উলটেপালটে অনেক খেলেছেন বিহারের পালটুরাম। বিশেষ করে মোদিজি ক্ষমতায় আসার পর। অন্তত তিনবার শিবির বদলেছেন। এবার বৃদ্ধ বয়সে অসুস্থ শরীরে পুত্রর ভবিষ্যৎ চিন্তা করে সে খেলায় যবনিকা। এজন্যই বলে স্নেহ অতি বিষম বস্তু। আবার দিল্লি দখলের জন্য কেজরিওয়ালকে চোর সাজিয়েছিল বিজেপির বশংবদ সিবিআই! ভোট মিটেছে, বিজেপির ক্ষমতা দখলও সারা। এমন ব্রাহ্ম মুহূর্তে আদালতে কেন্দ্রের এজেন্সি যে প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হবে, কে না জানে? বোফর্স থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সিবিআই, ইনকাম ট্যাক্স, ইডির ট্র্যাক রেকর্ড দেখুন! নির্বাচনের আগে কতশত আস্ফালন, তল্লাশি, গ্রেপ্তারি, ছোটাছুটি। ভোট মিটলেই পাঁচ বছরের শীতঘুম! কনভিকশন রেট আধ শতাংশ। পাছে দুর্বল কেজরিওয়ালের মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যাওয়া দিল্লি, পাঞ্জাব, গোয়ায় কংগ্রেসকে জাগিয়ে দেয়, তাই কেঁচেগণ্ডুষ। আবার আপকে মদত দাও। ভোটকাটা পাখিকে মেরে ফেললে তো রাজ্যে রাজ্যে গেরুয়া সংকট ঘনিয়ে আসবে আবার! সারসত্যটা হচ্ছে, বাংলায় এতকিছু করেও বিজেপির টিকে ধরানোর জামিনদার নেই। বার্ধক্যের ভারে নুইয়ে পড়া মহাগুরু থেকে একগুচ্ছ দলবদলু, সবাই ছুটে বেড়াচ্ছেন। তোপ দাগছেন, রথ ছোটাচ্ছেন বটে, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ধারে ভারে পাল্লা দেওয়ার কেউ নেই। তার উপর এসআইআর বিজেপির পক্ষে না গিয়ে ব্যুমেরাং হয়ে গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা ডেলি প্যাসেঞ্জারি শুরু করছেন, কিন্তু তাতে লাভ অল্প। তাই বাংলায় আরও বড়ো যুদ্ধের প্রস্তুতি। রাজ্যপাল ও তাঁর রাজভবনও অনেক দিন ধরেই গেরুয়া দলের কার্যালয়। বাড়তি আর কী খেলা দেখাবেন অজিত দোভালের শিষ্য?
একমেরু পৃথিবীর মতো আমাদের জাতীয় রাজনীতিও ক্রমেই আজ এক মেরুর। একটাই জাতীয় দল। কংগ্রেস ক্ষীণবল। দু’চারটি আঞ্চলিক দলই নামমাত্র বিরোধী ভূমিকায়। বিজেপি বিরোধী এই লড়াইয়ের সামনের সারিতে অগ্নিকন্যা মমতা। তিনিই একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী, যিনি সুপ্রিম কোর্টে উপস্থিত থেকে এসআইআরের অবিচারের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ফুঁসে উঠেছেন। মোদিজি যতই ফন্দি আঁটুন, পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে মমতার সঙ্গে কিছুতেই এঁটে উঠতে পারছেন না। আগামী ১৪ মার্চ মোদিজির ব্রিগেড। কিন্তু ১৪ মার্চ, ২০০৭-এর কথা বঙ্গ বিজেপির মনে না থাকলেও গোটা বাংলার মনে আছে। ১৯ বছর আগে ওই দিনেই নন্দীগ্রামে আন্দোলনে গুলি চালিয়েছিল বুদ্ধদেবের পুলিশ। প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৪ জন নিরীহ মানুষ। ওই ঘটনার অভিঘাতেই আজ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে সিপিএম। শত চেষ্টা করেও জাগছে না, অব্যাহত রক্তক্ষরণ। নরেন্দ্র মোদিও যদি বাংলায় ওই একই ভুল করেন, তাহলে বিজেপিও কিন্তু পথ হারাবে চোরাগলিতে।