নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: কলিং বেলটা বেজে উঠল। দরজা খুলতেই দেখা গেল, হাফপ্যান্ট পরা খুদের দল দাঁড়িয়ে আছে। তাদের হাতে চাঁদার বিল-বই! আপনি চোখ বড়ো বড়ো করে তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বল দেখি, সরস্বতী বানান কী? বলতে পারলে চাঁদা পাবি।’ যদি ভাবেন, ডিজিটাল পেমেন্ট আর কর্পোরেট স্পনসরশিপের এই জমানায় এসব দৃশ্য অতীত, তাহলে ভুল করছেন! ক্যানিং স্ট্রিট সহ বড়বাজারের বিভিন্ন অলিগলিতে দু’-এক চক্কর দিলেই আপনার ‘ভুল’ ভেঙে যাবে! কারণ, বড়বাজারে ঢেলে বিক্রি হচ্ছে সরস্বতী পুজোর চাঁদার বিল-বই। ফিনফিনে কাগজের উপর সযত্নে ছাপা হয়েছে বীণাবাদিনীর ছবি। লেখা রয়েছে ‘শ্রী শ্রী সরস্বতী পূজা’। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘বিক্রি তো ভালোই হয়। ছেলেপিলেরা এসে কিনে নিয়ে যাচ্ছে।’
একটা সময় ছিল, সরস্বতী পুজো এলেই পাড়ার অলিগলিতে শোনা যেত খুদে বাহিনীর হইহল্লা। সেই হল্লা শুনেই গৃহস্থ বুঝে যেত, ওই বুঝি এল চাঁদা চাইতে! কালক্রমে সেসব অভিজ্ঞতা অতীত হয়েছে। এখন অনলাইনে চাঁদা দেওয়ার পর ফোনে এসে যাচ্ছে ডিজিটাল রসিদ। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কড়া নাড়ার দরকারই পড়ছে না। তবে বাড়ি গিয়ে চাঁদা সংগ্রহ, বিল-বইয়ের ব্যবহার কমে এলেও তা যে পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, ক্যানিং স্ট্রিট, বড়বাজারের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের হাসিমুখ সেই বার্তাই দিচ্ছে। এখনও শহরের বহু পাড়ায় স্বমহিমায় রয়ে গিয়েছে এই ‘কালচার’।
ক্যানিং স্ট্রিটের বাজারে দেখা গেল, হলুদ-নীল-গোলাপি রঙের চাঁদার বই বিক্রি হচ্ছে। এক-একটি বিল-বইতে ২৫টি পাতা। দশটা এমন বইয়ের দাম পড়ছে ৮০ টাকা। এখন কি আর এসবের চাহিদা আছে? এক দোকানদার বললেন, ‘আগের থেকে তো কমেছে বটেই। কিন্তু একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছে, বলা যাবে না। অনেকেই আসছে। মূলত ছেলে-ছোকরারাই এখনও টিকিয়ে রেখেছে এসব।’ বলতে বলতেই দোকানে হাজির একদল কিশোর। ক্লাস এইটের পড়ুয়া, দমদমের পল্টুর বক্তব্য, ‘আমরা ময়দানে খেলতে এসেছিলাম। ভাবলাম, একবার ঘুরে যাই। আমরা পাড়ার গলিতে কয়েকজন মিলে পুজো করি। চাঁদা তুলেই করি। এখান থেকে বিল-বই নিয়ে যাই। কয়েকটি নিয়ে গিয়েছি। আরও ১০টি নিতে হবে।’
ইদানিং সরস্বতী পুজোতেও পাড়ায় পাড়ায় কর্পোরেট বিজ্ঞাপনের হাতছানি। সারারাত জেগে নিজেদের হাতে প্যান্ডেল তৈরি করে পুজোর রীতি শহরাঞ্চলে কার্যত উধাও হয়ে গিয়েছে। বড়বাজারেই এক পথচারী কথায় কথায় এসব স্মৃতিতেই ডুব দিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘ছোটোবেলায় আমরা সারারাত জেগে প্যান্ডেল তৈরি করতাম। আগের দিন রাতেই প্রতিমা কিনে নিয়ে চলে আসতাম। তারপর সবাই ভোররাতে যেতাম ফুল চুরি করতে। সেসব এক দিন গিয়েছে!’ তবে হারিয়েও ধরা দেয় অনেক কিছু! বড়বাজারের দোকানে দোকানে সরস্বতী পুজোর চাঁদার বিল-বই যেন সে কথাই জানান দিচ্ছে।