Bartaman Logo
৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দেশভাগেও বাঙালি উদ্বাস্তুর সংখ্যা ছিল ২৭ লক্ষ!

‘‘ঐক্যবদ্ধ বেঙ্গল মানে হল শক্তিশালী জাতি। বিভাজন করে দিতে পারলেই নানারকম দুর্বলতা গ্রাস করবে। আমাদের সুবিধা হবে শাসন করতে। ইউনিটি ভেঙে দেওয়া দরকার। তাই বাংলা ভাগ করতে হবে।’’

দেশভাগেও বাঙালি উদ্বাস্তুর সংখ্যা ছিল ২৭ লক্ষ!
  • ১০ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: ‘‘ঐক্যবদ্ধ বেঙ্গল মানে হল শক্তিশালী জাতি। বিভাজন করে দিতে পারলেই নানারকম দুর্বলতা গ্রাস করবে। আমাদের সুবিধা হবে শাসন করতে। ইউনিটি ভেঙে দেওয়া দরকার। তাই বাংলা ভাগ করতে হবে।’’ কে বলেছিলেন? ১৯০৩ সালে ব্রিটিশ সরকারের ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব  হার্বার্ট হোপ রিসলে। এই নোট দিয়েছিলেন তিনি ভাইসরয় লর্ড কার্জনকে। সেই পরামর্শ মেনেই লর্ড কার্জন আয়োজন করেছিলেন বঙ্গভঙ্গের। ওই ঘটনার ১১৮ বছর পর স্বাধীন ভারতে কোন রাজনৈতিক দল ঠিক এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েই বাংলাকে আবার ভাগ করে উত্তরবঙ্গ বনাম দক্ষিণবঙ্গ করার প্রস্তাব নিয়ে জোরদার বিবৃতি শুরু করেছিল? উত্তর সকলের অবগত। 

Advertisement

দেশভাগের পর ১৯৫২ সালে প্রথম নির্বাচন যখন হবে, তখন বাঙালি উদ্বাস্তুর সংখ্যা কত? ২৭ লক্ষ! ১৯৫১ সালের সেন্সাস রিপোর্ট অনুযায়ী ২৬ লক্ষ। পরের বছর আরও ৬০ হাজার থেকে ১ লক্ষ উদ্বাস্তু যুক্ত হয়। সুতরাং ২৭ লক্ষ। এরপরও একটানা চলেছে উদ্বাস্তু আগমন। এই বাঙালি উদ্বাস্তুরা কাদের কারণে ছিন্নমূল হয়েছিলেন? ব্রিটিশ সরকার। যারা দেশভাগ ও বঙ্গবঙ্গ করেছিল। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অসাধারণ ইতিহাস জ্ঞান ও চেতনা। কেন? কারণ তারা এবার নির্বাচনের আগে ঠিক বেছে বেছে ওই ২৭ লক্ষকেই উদ্বাস্তু হওয়ার ভয় দেখাতে সক্ষম হয়েছে। কমও নয়। বেশিও নয়। এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিচারাধীন বাঙালিদের মধ্যে ঠিক ২৭ লক্ষকেই বাদ দেওয়া হয়েছে ভোটাধিকার থেকে। যাদের ভোটাধিকার নেই তারা পূর্ণাঙ্গ নাগরিক নয়। অতএব এই ২৭ লক্ষ আপাতত অনাগরিক। নির্বাচন কমিশন খুবই মনোযোগ ও যত্নের সঙ্গে নিজেদের ব্রিটিশ সরকারের অত্যন্ত যোগ্য ও উপযুক্ত উত্তরাধিকারে পর্যবসিত করতে পেরেছে। 
কাকে বলে উদ্বাস্তু? ১৯৫১ সালের রাষ্ট্রসংঘের কনভেনশন অনুযায়ী উদ্বাস্তুর আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা দেওয়া রয়েছে। কী সেটা? ধর্ম, জাতি, সামাজিক গোষ্ঠী অথবা রাজনীতিগত কারণে যারা বিতাড়িত হয় স্বদেশ থেকে এবং অন্য কোনো দেশে বহিষ্কৃত হতে বাধ্য হয়। ভারতীয় জনতা পার্টির নেতৃত্ব  এবং ভারত সরকারের মন্ত্রীরা নির্বাচনি প্রচারে এসে কী বলছেন? বলছেন, ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট। অর্থাৎ চিহ্নিত করব, নাম মুছে দেব এবং অন্য দেশে পাঠিয়ে দেব! তাহলে এই ২৭ লক্ষ বাদ পড়া ব্যক্তিরা যদি কোনোভাবেই আর নিজেদের বৈধ নাগরিক প্রমাণ করতে না পারে, তাহলে তাদের স্ট্যাটাস কী হবে? উদ্বাস্তু। 
১৯৫২ সালে ওই ২৭ লক্ষ উদ্বাস্তুর সংখ্যা মাথায় রেখে ঠিক কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল? ক্যাম্প ও কলোনি স্থাপন করা হবে। এখন কী বলা হচ্ছে? ঠিক এটাই বলা হচ্ছে। এবার নতুন নাম। ডিটেনশন ক্যাম্প। ২৭ লক্ষের মধ্যে সিংহভাগ মুসলিম সম্প্রদায়ের। ‘সিংহভাগ’ শব্দের অর্থ কী? অর্থ হল, বহুলাংশে হিন্দুও আছে। এই হিন্দুদের জাতিগত অবস্থান কী? সিংহভাগই নিম্নবর্গের সমাজ ও নিম্নবর্ণের জাতিভুক্ত। আবার পুরানো কথা মনে করা যাক।  দেশভাগের পর বাংলা ছাড়াও দণ্ডকারণ্য, আন্দামান, ওড়িশায় যাদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছিল, তাদের জাতিগত পরিচয় সিংহভাগ কী ছিল? নিম্নবর্গ ও তফসিলি জাতিভুক্ত। সুতরাং শুধু মুসলিম নয়, হিন্দুও সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। আর সকলেই চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে যে, এক ও একমাত্র দরিদ্র, নিম্নবিত্ত, খেটে খাওয়া হিন্দু মুসলিমই টার্গেট। ব্রিটিশ সরকারের দেশভাগ যা করেছিল, স্বাধীন ভারতের সরকারি প্রতিষ্ঠান ঠিক তাই করছে। 
সবথেকে বেশি মানুষ বাদ পড়েছে কোন জেলা থেকে? মুর্শিদাবাদ থেকে। ৪ লক্ষ ৫৫ হাজার। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের সময় মুর্শিদাবাদের আর্থিক অবস্থা ছিল ইংল্যান্ডের আর্থিকভাবে সম্পদশালী সব প্রদেশের থেকে অনেক বেশি। তা‌ই সেই মুর্শিদাবাদকে ব্রিটিশ এসে প্রথম টার্গেট করেছিল। লুট করার জন্য। কতটা নির্মমভাবে টার্গেট করেছিল? মাত্র ১৩ বছর পর অর্থাৎ ১৭৭০ সালে মুর্শিদাবাদে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। ঠিক যখন দুর্ভিক্ষের তিন বছর চলেছিল, সেই তিন বছরই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সর্বোচ্চ মুনাফা পাঠিয়েছিল লন্ডনের হেডকোয়ার্টারে। কত? ১ লক্ষ ৮৬ হাজার ২৫৫ পাউন্ড। আজকের মূল্য কত? ১০ কোটি পাউন্ড! এখন ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে এক পাউন্ড মানে কত? ১২৫ টাকা। 
২০২৬ সালেও বাঙালিকে টার্গেট করা হবে, অথচ মুর্শিদাবাদ, মালদহ (২ লক্ষ ৩৯ হাজার ভোটার বাদ), উত্তর ২৪ পরগনা (৩ লক্ষ ২৫ হাজার ভোটার বাদ), পূর্ব বর্ধমান (২ লক্ষ ৯ হাজার বাদ) এই জেলাগুলিকে টার্গেট করা হবে না, সেটা কীভাবে হয়? কারণ এরাই তো টেক্সটাইল, সিল্ক, আম, ধান, সবজি, জুয়েলারি কর্মীর ভরকেন্দ্র। এদের অস্থির করে দিতে পারলে অর্থনীতি ধাক্কা খাবে। এই রাজ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি যদি ধাক্কা খায়, তাহলে অন্য রাজ্যগুলির সুবিধা। তাদের রাজ্যের থেকে বাংলায় পণ্য সাপ্লাই করা হবে। তাদের লাভ হবে। বাংলার রাজকোষ শূন্য হবে। শুধু‌ই রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করার জন্য বাংলাকে টার্গেট করা হয়েছে এটা কে বলল? ব্যবসা, বাণিজ্য এবং কৃষিও সমান টার্গেট। 
যে রাজ্যে সারাক্ষণ অস্থিরতা থাকবে, সেই রাজ্যে কখনো শিল্প ও বাণিজ্য মহল শিল্পস্থাপন অথবা লগ্নি করতে আসবে? ঠিক এই কারণেই এসআইআর অথবা সাম্প্রদায়িক বিভাজন, যে কোনো উপায়ে সর্বদাই সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে রাখা হচ্ছে। যাতে মানুষ জীবন ও জীবিকায় মনোযোগ দিতে পারে। যাতে ক্ষুব্ধ বিরক্ত হয়ে বিক্ষোভ দেখায়, ভাঙচুর হয়। এবং তখন গোটা দেশে প্রচারমাধ্যমকে দিয়ে বোঝানো হয় বাংলা খুব অশান্ত, অস্থির, আইনশৃঙ্খলা নেই। 
তাহলে যে শিল্প সংস্থা ভাবছিল যে, নিউটাউনে একটা প্রজেক্ট করব, দুর্গাপুর আসানসোল, উত্তরবঙ্গে নতুন কোনো ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেল্ট করব, তারা সকলেই পিছিয়ে যাবে। তাদের আড়ালে বোঝানো হয় যে, বাংলা অশান্ত, বাংলা অস্থির, বাংলায় কিছু হবে না। দাঙ্গার মতো ভয় শিল্পবাণিজ্য মহল আর কিছুতেই পায় না। কারণ প্রথমেই যেটা হবে ইন্টারনেট সংযোগ কয়েকদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। ওভাবে ব্যবসা হয়? সুতরাং সবটাই একটি বৃহৎ পরিকল্পনা। কারণ বাংলাকে গোটা দেশের মধ্যে সবথেকে পিছিয়ে পড়া রাজ্য হিসেবে পরিগণিত করতে হবে। তারপর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতাসীন হওয়ার চেষ্টা। 
এই ২৭ লক্ষ অবৈধ ভোটারদের নিয়ে কী করা হবে? ভারত সরকার অথবা নির্বাচন কমিশন উত্তর দিচ্ছে না। কারণ প্ল্যানই নেই। ওই যে ‘তাড়িয়ে দেওয়া হবে’ বলে হুমকি দেওয়া হয় ওসব হল নির্বাচনি স্লোগান। ভোটব্যাংককে বোকা বানানো। যারা এই লক্ষ লক্ষ হিন্দু ও মুসলিম মানুষ বাদ চলে যাওয়ায় দারুণ খুশি হয়েছে, এই সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে কথা বলছে, তাদের সবথেকে বেশি বোকা বানানো হচ্ছে। কেন? কারণ ২৭ লক্ষকে ধরা যাক ভারত থেকে বিতাড়িত করার সিদ্ধান্ত হল? কে নেবে? বাংলাদেশ? কেন? কী কারণে তারা হঠাৎ রাজি হয়ে যাবে এই ২৭ লক্ষ মানুষকে নিজেদের দেশে নিতে? তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে? তাদের মতামত কী? 
যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, তাদের আত্মীয়, স্বজন, পরিবার, বন্ধুদের মধ্যে কি ক্ষোভের সঞ্চার হয়নি? যাদের ভোটাধিকার আছে। সেই তাদের কাছে প্রতিবাদের একটি মাত্র উপায়। ভোট। তারা কি এসব ভোট দেওয়ার সময় মনে রাখবে না? সেই তালিকায় কিন্তু সব দলের ভোটারই আছে। কিন্তু এই প্রবল ক্ষোভের প্রকাশ যদি একটি দলের বিরুদ্ধেই ঘটে, সেটি প্রতিহত করা যাবে কীভাবে?  
যাদের নাম বাদ গেল, তারা কতদিন ধরে ভোট দিয়েছে? কতদিন ধরে ট্যাক্স দিয়েছে? কতদিন ধরে জিএসটি দিয়ে পণ্য ক্রয় করেছে? কতদিন ধরে সরকারি বেসরকারি চাকরি করছে? কতদিন ধরে ধান রুইছে, লেদ মেশিন চালিয়েছে, জরির কাজ করেছে, সোনার কাজ করেছে, হকারি করেছে? তাদের বৈধ নাগরিক হিসেবে ট্যাক্স ও ভোটপ্রদান সব এক নিমেষেই শূন্য হয়ে গেল! তারা আজও জানে না যে, তাদের ভবিষ্যৎ কী। তাদের ছেলেময়েরা জানে না যে, এই স্কুল, কলেজ, পাড়া, মাঠ এসবের উপর তাদের অধিকার আছে কি না।  তারা শুধু ভয়ে ভয়ে শোনে—প্রমাণ করতে না পারলে তাড়িয়ে দেব।
অবিকল একই ঘটনা ঘটেছিল ঠিক ৮০ বছর আগে। দেশভাগের প্রাক্কালে। লক্ষ লক্ষ বাঙালি জানত না তাদের ভবিষ্যৎ কী! ২০২৬ সালে দিল্লিতে বসে থাকা নির্বাচন কমিশন এসআইআর করে ২৭ লক্ষ বাঙালির নাম বাদ দিয়েছে ভোটার তালিকা থেকে। ১৯৪৭ সালে দিল্লিতে বসে থাকা আর একটি কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এভাবেই। পার্টিশানের বাউন্ডারি কমিশন। তখনও টার্গেট ছিল বাঙালি। এখনও টার্গেট বাঙালি! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ