Bartaman Logo
১ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

হায়, আইনের শাসন, গণতন্ত্র!

‘পার্লামেন্ট বিলংগস টু দি অপোজিশন’—বলেছিলেন ভারতের সংবিধানের জনক ডঃ বি আর আম্বেদকর। আলোচনা চলছিল গণপরিষদে।

হায়, আইনের শাসন, গণতন্ত্র!
  • ১ জুন, ২০২৬ ০৪:০০

‘পার্লামেন্ট বিলংগস টু দি অপোজিশন’—বলেছিলেন ভারতের সংবিধানের জনক ডঃ বি আর আম্বেদকর। আলোচনা চলছিল গণপরিষদে। জনগণের কাছে সরকারের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার দিকটি সেখানে স্পষ্ট করতে গিয়েই বাবা সাহেব বিরোধীদের গুরুত্বটি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘সংসদ হল বিরোধীদের জায়গা।’ এই ছোট বাক্যটির মর্মার্থ হল—সরকার গঠন, পরিচালনা এবং আইন প্রণয়নে শাসক পক্ষের কর্তৃত্ব অবশ্যই স্বীকার্য। কিন্তু সংসদে বিরোধীদের জায়গাটিও অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের ভুল নীতি এবং প্রতিটি খারাপ পদক্ষেপের সমালোচনা করবেন বিরোধীরা। সরকারকে সঠিক পথে চলার পথ দেখাবেন তাঁরা। পশ্চিমবঙ্গে অতিসম্প্রতি সরকার বদল হয়েছে। বাংলার প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মুখে বিধানসভায় প্রথম দিনেই শোনা গিয়েছিল বাবা সাহেবের উপর্যুক্ত উক্তিরই প্রতিধ্বনি। বিজেপিসহ সমস্ত বিরোধী দলের অভিযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেড় দশকের জমানায় বিরোধী পরিসর বলে কিছু অবশিষ্ট ছিল না। বিরোধীদের যাবতীয় অধিকার কেড়ে নিয়ে স্বঘোষিত ‘মা-মাটি-মানুষের সরকার’ বস্তুত গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে। বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, তাঁর সরকার এই ভুল করবে না। বিরোধীরা তাঁদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যাতে অবাধে করতে করতে পারেন এই সরকার সেটি নিশ্চিত করবে। একই কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন বঙ্গ বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও। বিজেপি পার্টি এবং নতুন সরকার এই অঙ্গীকারও শুনিয়েছে যে, রাজ্যে সরকার বদল হলেও তারা কোনোরকম বদলা বা প্রতিহিংসার রাজনীতি করবে না। রাজ্যে এই নষ্ট সংস্কৃতির অবসান ঘটানোকেই তারা চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছে। 

Advertisement

কিন্তু কার্যক্ষেত্রে গেরুয়া অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন আদৌ নজরে পড়ছে কি? পূর্ববর্তী জমানার অনাচার, অপকর্ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অল আউট খেলার নামে দিকে দিকে যা চলছে তার সঙ্গে ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠার মিল কতটা? বহুনিন্দিত ‘শাসকের আইন’ কায়েমের অপচেষ্টা চলছে না তো নতুন মোড়কে? এই দুটি মৌলিক প্রশ্ন কিন্তু অল্পদিনেই উঠতে শুরু করেছে। সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে সোনারপুরে তৃণমূল সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর বেনজির আক্রমণ নিয়ে। রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশ হয়েছে ৪ মে। তৃণমূল কংগ্রেসের অভাবনীয় বিপর্যয়ের পর থেকে নিজের গণ্ডি কালীঘাটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন অভিষেক। রীতিমতো জল মেপে, ২৬ দিন পর শনিবার রাস্তায় নামেন তিনি। সোনারপুর দক্ষিণ এবং বেলেঘাটার দুই ‘আক্রান্ত’ তৃণমূলকর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যান। অভিষেকের এই রাস্তায় নামার ফলে তৃণমূল আদৌ উজ্জীবিত হবে কি না সেই সংশয় ছিল রাজনৈতিক মহলের। তাঁকে ঘিরে বিক্ষোভের আশঙ্কাও ছিল। কারণ অভিষেকের সঙ্গে আগের মতো ব্যপাক পুলিশ ও নিরাপত্তার বহর নেই, যা এতদিন তিনি পেয়ে এসেছেন। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এবং ‘ডায়মন্ডহারবার মডেল’-এর স্রষ্টার বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে কিছু লোক ইতিমধ্যেই বিক্ষোভ দেখিয়েছে। অশ্রাব্য অকথ্য কুবাক্যও বয়ে গিয়েছে তাঁকে ঘিরে। 
এহেন পরিস্থিতি থিতিয়ে যাওয়ার আগেই শনিবার রাজনৈতিক কর্মসূচি নেন অভিষেক। স্বভাবতই এই উপলক্ষ্যে বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব ছিল রাজ্যের। পরিবর্তে রাজ্যবাসী কী দেখল—অভিষেকের আগাম ঘোষিত কর্মসূচির মওকা নিল বিজেপি! প্রায় অরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী নেতা এবং সাংসদকে শারীরিকভাবে নিগ্রহ করা হল সোনারপুরে। তাঁকে লক্ষ্য করে ‘চোর’ স্লোগানের সঙ্গে হল ঢিল, ডিম আর জুতোর বৃষ্টি! চলেছে এলোপাথাড়ি কিল-ঘুসিও। তাঁকে বাঁচাতে হিমশিম অবস্থা হয় তাঁর দেহরক্ষীদের। এই ঘটনায় অভিষেক শারীরিক এবং মানসিকভাবে আহত হয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, ‘‘৪ মে অভিষেকের ডিজে বাজাবার শখ ছিল। মিটিয়ে দেওয়া হল সেটাই—‘ডি ফর ডিম’ আর ‘জে ফর জুতো’ ছুড়ে!’’ তবে এমন ভয়াবহ দিনেও দলের সেনাপতিকে বাঁচাতে দলের সৈনিকদের অনীহা, অনুপস্থিতি বিস্ময়কর ঠেকেছে সকলেরই চোখে। এমন কাণ্ড কদিন আগে রাজ্যবাসী কল্পনাও করতে পারত না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শেষ এখানেই নয়, উপযুক্ত চিকিৎসার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয় অভিষেকের। কলকাতার দু-দুটি নামী বেসরকারি হাসপাতাল তাঁকে ভরতি নেয়নি। স্রেফ প্রাথমিক চিকিৎসা করেই ফেরানো হয় তাঁকে, এই বলে—‘আপাতত ভরতি রাখার প্রয়োজন নেই।’ আরো মারাত্মক অভিযোগ, সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করা হয়। বস্তুত ভোট-পরবর্তী সন্ত্রাস নতুন মাত্রা পেল সেখানে। নিহত দলীয় কর্মীর পরিবারকে সমবেদনা জানাতে যাওয়ার এই পরিণাম অতীব নিন্দনীয়। নিন্দা ধ্বনিত হয়েছে দেশজুড়েই। এই ইস্যুতে রাজনৈতিক তরজার কোনো মূল্য নেই। এই সংস্কৃতির সম্প্রসারণ নয়, এতে লাগাম পড়া দরকার এখনই। কারণ এর মধ্যে আইনের শাসন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষণ নয়, এই দুটিই যুগপৎ বিনাশের বীজ প্রকট হয়েছে।

সম্পর্কিত সংবাদ