• ‘মা’। প্রসঙ্গটাই এমন যা কখনও শেষ হওয়ার নয়। মায়ের কোনও শুরুও নেই, শেষও নেই। এই গাড়ি থামতে জানে না। মাকে নিয়ে কথা শুরু করলে আস্ত একটা জীবন হয়ে যাবে অনায়াসে।
• ‘মা’। প্রসঙ্গটাই এমন যা কখনও শেষ হওয়ার নয়। মায়ের কোনও শুরুও নেই, শেষও নেই। এই গাড়ি থামতে জানে না। মাকে নিয়ে কথা শুরু করলে আস্ত একটা জীবন হয়ে যাবে অনায়াসে।
মুনমুন, মুনা, টনটন— আদর করে মা এসব বলেই ডাকতেন। ২০১৪-এ আমার মা সুব্রতা দাশগুপ্ত শারীরিকভাবে চলে গিয়েছেন। কিন্তু চলে যাওয়ার পরও আশ্চর্যভাবে মা ফিরে আসেন। অন্তত আমার তেমন অনুভূতিই তৈরি হয়েছিল। সেই ঘটনাটি দিয়ে শুরু করি।
শেষের দিকে মা অ্যালঝাইমার্সে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সেসব স্মৃতি আর মনে করতে চাই না। মা চলে যাওয়ার কয়েক বছর পর হঠাৎ করে একটি বই মায়ের বাড়ি থেকে আমার বাড়িতে নিয়ে এসেছিলাম। ওই বইয়ের মধ্যে একটা চিঠি পেলাম। কোনও কোম্পানির নেমন্তন্নর চিঠি। তার উল্টোপিঠে মা আমার ফোন নম্বর লিখেছেন। আর লিখেছেন, ‘মুনমুন আজ এসেছিল। ওকে বলা হয়নি। পরেরদিন এলে ওকে এই চিঠিটা দিতে হবে।’ অর্থাৎ মা ধীরে ধীরে নিজে বুঝতে পারছিলেন, ভুলে যাচ্ছেন। এই হাতের লেখাটা যেন মা হয়ে এল আমার কাছে। মায়ের শেষ পাওয়া হাতের লেখা। হয়তো তারপরেও লিখেছেন। কিন্তু আমার পাওয়া মায়ের শেষ হাতের লেখা। মা জেনে আমায় দেননি। আমিও হিসেব করে পাইনি। রবীন্দ্রনাথের গানের মতো, ‘হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা ধন...।’
দেবব্রত বিশ্বাসের কাছে গান শিখেছিলেন মা। সেসব আমার জন্মের আগের ঘটনা। আমি সেসব অপূর্ব দিনের গল্প শুনতাম। মায়ের দেরাজে সোনালি পাড় দেওয়া একটা কালো খাতা ছিল। সেখানে দেবব্রত বিশ্বাসের হাতের লেখায় ছিল, ‘আমি হেথায় থাকি শুধু গাইতে তোমার গান/ আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ’। এ যে কী পরম প্রাপ্তি!
জ্ঞান হওয়ার পর থেকে মাকে আর পাঁচজন মায়ের মতোই দেখেছি। এখন আমি যতটুকু যা, সবই মায়ের জন্য। বুদ্ধি তো শারীরিক ভাবে তৈরি হয়। বোধ তৈরি করে দিয়েছেন মা। কারও ভালোয় বাস করো। তাহলেই জীবনের মানে খুঁজে পাবে। মায়ের প্রাথমিক শিক্ষা ছিল এটাই। ভালো হতে পারা যে কী, সেটা বুঝতে বুঝতেই সারা জীবন কেটে গেল...।
দশম শ্রেণি পর্যন্ত অঙ্ক এবং ইংরেজি ছাড়া সব বিষয় বাড়িতে মা পড়িয়েছেন। মা এবং আমার বড়মাসি কোনওদিন স্কুলে যাননি। আমার দাদু খুব রক্ষণশীল মানুষ ছিলেন। তাঁর এই দুই মেয়ে অত্যন্ত সুন্দরী ছিলেন বলে স্কুলে পাঠাননি। মায়ের পরের বোনরা স্কুলে গিয়েছিল। কিন্তু মায়ের কখনও সে সুযোগ হয়নি। অথচ যখন হাতা খুন্তি হাতে নেই বা অন্য কাজ নেই তখন মায়ের হাতে বই থাকত। মায়ের হাতের সেলাইও অসাধারণ ছিল। বেশ বড় বয়স পর্যন্ত মায়ের হাতে তৈরি জামা পরতাম। মা ফ্রকে এঁকে দিতেন। কখনও কাঁথা সেলাই করতেন। উলের ফ্রক পরেছি মায়ের তৈরি। পুজোর সময় একটা জামা কিনে দেওয়া হতো। বাকি সারা বছরের পোশাক মা নিজে তৈরি করে দিতেন। তা নিয়ে আমার গর্বের শেষ ছিল না।
সারা জীবন মানুষের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখেছি মাকে। আমার জীবনে দেখা প্রথম সমাজকর্মী। মা সই পাতিয়েছিলেন অনেকের সঙ্গে। তাদের বিপদে, প্রতিবেশীদের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। মা আমার কাছে আস্ত একটি ‘স্কুল’ হয়ে উঠেছিলেন। লেখাপড়া, গান, গল্প বলা— সব মা। মানুষের সঙ্গে আচার ব্যবহারও শিখেছি মায়ের থেকে। হয়তো বাড়িতে হঠাৎ অতিথি এসেছেন। শুধু আলু আর লঙ্কা রয়েছে রান্নাঘরে। মা তাই দিয়েই বানিয়ে ফেললেন ‘হুটোপুটি ফ্রাই’। একটা দারুণ নাম দিয়ে পরিবেশন করলেন অত্যন্ত সাধারণ খাবার। এই অভ্যেসও রপ্ত হয়েছে মায়ের থেকেই।
২০১৪-এ মা চলে যাওয়ার পর গান গাইতে পারছিলাম না। সে সময় রবি ঠাকুরের ‘দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ও পারে’ গানটা বারবার পড়তাম। পড়তে গিয়ে মনে হল অন্য ফর্মে যদি পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথকে! তখন ইংরেজিতে ‘ট্রান্সক্রিয়েট’ করলাম। ইংরেজি আমার বিষয় ছিল না। গানের অন্তর্নিহিত মানে বুঝে ৫৩টা গান ‘ট্রান্সক্রিয়েট’ করে ফেললাম। সেই গান অনুযায়ী কিছু স্কেচ, ফোটোগ্রাফ দিয়ে ‘গ্যালাক্সি’ নামে একটা বই তৈরি হল। সেসময় মুদিখানাতে গেলেও সঙ্গে নিতাম, গানের অনুষ্ঠানেও নিয়ে যেতাম বইটা। মনে হতো মাকে নিয়ে যাচ্ছি। সব জায়গায় মায়ের উপস্থিতি অনুভব করতাম। এখনও গানের অনুষ্ঠানে গ্যালাক্সি আমার সঙ্গে যায়।