তন্ময় মল্লিক: ঘটনা-১: মুর্শিদাবাদের হরিহরপাড়ার তারতিপুরের নাজিমুদ্দিন মণ্ডল দক্ষ রাজমিস্ত্রি। লেবার কন্ট্রাক্টররা তাঁকে একডাকে চেনেন। বড় বড় বিল্ডিং তৈরির বরাত পেলেই নাজিমুদ্দিনের ডাক পড়ে। চার বছর ধরে মুম্বইয়ে কাজ করছেন। সব ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু ‘বাঙালি খেদাও’ অভিযান শুরু হতেই মুম্বই পুলিস তাঁকে বাংলাদেশি বলে গ্রেপ্তার করে। সেখান থেকে সোজা বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’। খবর আসে গ্রামে। স্বামীকে ফিরিয়ে আনার আর্জি জানিয়ে পুলিস, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতাদের কাছে ছুটে বেড়ান তাঁর স্ত্রী পিঙ্কি খাতুন। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ১৫ জুলাই ফেরেন গ্রামের বাড়িতে। পিঙ্কি স্বামীকে বলেছিলেন, এখানে যা জুটবে তাই খাব। আর তোমাকে বাইরে যেতে হবে না। নাজিমুদ্দিনও রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু থিতু হতে পারলেন না। কয়েকদিন যেতে না যেতেই ঠিকাদারের ফোন, ‘মুম্বই চলে এসো। তোমার আর কিছু হবে না।’
ঠিকাদারের জোরাজুরিতে মন গলে যায় নাজিমুদ্দিনের। আপত্তি করেছিলেন তাঁর স্ত্রী। বলেছিলেন, ‘আমি বিড়ি বাঁধি। তুমি এখানেই রাজমিস্ত্রির কাজ করো। আমাদের একটা মেয়ে। দিব্যি চলে যাবে।’ কিন্তু নাজিমুদ্দিন কথা শোনেননি। ফের গিয়েছেন মুম্বই। পিঙ্কি বলেন, ‘এবার বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিলে থাকবে ওখানেই। আমি আর কারও হাতেপায়ে ধরব না। এত করে বললাম। তাও শুনল না।’ পিঙ্কির গলায় অভিমান। আশঙ্কাও।
ঘটনা-২: ১৫ আগস্ট সাতসকালে বর্ধমানের
ফাগুপুরে ঘটে এক ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনা। মারা
গেলেন ১১জন। জখম হলেন ৩২জন। প্রত্যেকেই বিহারের বাসিন্দা। তাঁরা গঙ্গাসাগর থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। দুর্ঘটনা ঘটামাত্র প্রশাসনের কর্তারা ছুটলেন হাসপাতালে। জখমদের চিকিৎসার তদারকি করলেন পুলিস সুপার, জেলাশাসক, এমনকী
মন্ত্রীও। মৃত ও জখমরা ভিনরাজ্যের বাসিন্দা।
তবুও তাঁদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশমতো তুলে দেওয়া হল ক্ষতিপূরণের অর্থ। যাঁকে মুসলিমপ্রেমী প্রমাণের জন্য বেগম বলা হয়, তিনিই বিপদগ্রস্ত হিন্দু তীর্থযাত্রীদের পাশে দাঁড়ালেন। কোনও ধর্মের বাছবিচার না করে আর্তের পাশে দাঁড়ানোই তো রাজধর্ম!
ক্ষতিপূরণ পেয়ে বাস দুর্ঘটনায় জখম মীনাদেবীর চোখে জল। হাসপাতালের বেডে শুয়ে বললেন, এমন একটা ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে গেল। এতজন মারা গেল। আমরা হাসপাতালে পড়ে রয়েছি। কিন্তু বিহার সরকার আমাদের জন্য কিছুই করল না। টাকাপয়সা দেওয়া তো দূরের কথা, সরকার খোঁজ পর্যন্ত নেয়নি। অথচ বাংলার সরকার আমাদের চিকিৎসা করছে, টাকাও দিল। আমরা এসব ভাবতেও পারিনি।
রণভীর যাদব, বিভাদেবী, বিক্রম কুমার, মীনা দেবী, পুনীল সাহানি সহ জখম ৩২জনই বিহারের বাসিন্দা। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি করার সময় কেউ জানতে চাননি, ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম আছে কি না! তাঁরা বাংলা বলতে পারেন কি না! তাঁদের ধর্ম কী? কারণ রবীন্দ্র-নজরুলের বাংলা সে-শিক্ষা পায়নি। বাংলা জানে, আইনের জালে জড়িয়ে মানুষকে বিপন্ন করা নয়, বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হল মানবধর্ম। অথচ সেই বাঙালিকে হেনস্তা ও বিপন্ন করে চলেছে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার। বাংলায় কথা বললেই মারধর করে তাড়িয়ে দিচ্ছে। নানান কৌশলে বাংলাকে দুর্বল করতে চাইছে।
কেন্দ্রীয় সরকার বাংলায় চার বছর বন্ধ করে রেখেছে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প। মেটায়নি শ্রমের মজুরিও। রাজ্য সরকারের আবেদন-নিবেদনে কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করেছিল হাইকোর্ট। নির্দেশ দিয়েছিল, ১ আগস্ট শুরু করতে হবে মনরেগা প্রকল্পের কাজ। হাইকোর্ট খুব স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তদন্ত চলুক। কিন্তু ১০০ দিনের কাজ চালু করা হোক।
অনেকে মনে করেছিলেন, আদালতের নির্দেশের পর কেন্দ্রীয় সরকারের টনক নড়বে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার কোনও উচ্চবাচ্য করেনি। কেন্দ্র হয়তো ভেবেছিল, রায় না মানায় আদালত অবমাননার কেস করবেন আবেদনকারীরা। তাহলে বিষয়টি ‘আদালতের বিচার্য বিষয়’ বলে ফের ঝুলিয়ে রাখা যাবে। কিন্তু, আবেদনকারীরা সেই ফাঁদে পা না দেওয়ায় নরেন্দ্র মোদির সরকার রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছে। তাতেই খসে পড়েছে ‘বাংলাপ্রেমী’ মোদি সরকারের মুখোশ। সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে বুঝিয়ে দিল, বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি বিজেপির কোনও দায় নেই। আর থাকবেই বা কেন?
বিজেপির প্রতিটি পরিকল্পনা, প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি আইন ভোটকেন্দ্রিক। যেখানে ভোটের
ফায়দা নেই, সেখানে বিজেপিও নেই। বাংলার নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করে বিজেপি বুঝেছে, শুধু সংখ্যালঘুরা নয়, গ্রামের গরিব মানুষও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ভোট ব্যাঙ্ক’ হয়ে গিয়েছে।
সৌজন্যে সামাজিক প্রকল্প। যাঁদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের চিন্তা নেই তাঁরা ধর্ম নিয়ে মাতামাতি করলেও গরিব মানুষ তাতে নেই। কারণ অন্নচিন্তা অন্য সব চিন্তা ভুলিয়ে দেয়।
গ্রামবাংলায় দাঁত ফোটাতে পারছে না বিজেপি।
তাই যে কারণে সংখ্যালঘুদের টাইট দিতে চাইছে,
সেই একই কারণে শায়েস্তা করতে চাইছে বাংলার গরিবগুর্বোদের। ১০০ দিনের কাজ, আবাস
যোজনা, জলজীবন মিশন সহ সমস্ত প্রকল্পের টাকা আটকে দিচ্ছে। এই সমস্ত প্রকল্পের মূল বেনিফিসিয়ারি কারা? গ্রামের গরিব, খেটে খাওয়া মানুষ। তাই
আর ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ স্লোগান শোনা যায় না। এখন নতুন স্লোগান, ‘জো হামারা সাথ, হাম উনকা সাথ।’
বিজেপির সঙ্গে বাংলার সিংহভাগ গরিব নেই। তাই দিকে দিকে শুরু হয়েছে বাংলাভাষীদের উপর হামলা। অত্যাচার বন্ধ হওয়া তো দূরের কথা, বাড়ছে। আরও বাড়বে। কারণ কেন্দ্রীয় সরকার নীরব। মৌনং সম্মতি লক্ষণম্। এই পরিস্থিতিতে পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্তা থেকে মুক্তি দিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চালু করেছেন নতুন প্রকল্প, ‘শ্রমশ্রী’। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে সমালোচনা। কেউ বলছেন, এটা একটা নির্বাচনী টোপ, কেউ টেনে আনছেন সরকারি কর্মীদের ডিএ না দেওয়ার প্রসঙ্গ।
এর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যত প্রকল্প চালু করেছেন, প্রতিটির সমালোচনা করেছে বিরোধীরা। সবুজসাথী, স্বাস্থ্যসাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিয়েও বিস্তর সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিটি প্রকল্পই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের ভিতকে আরও শক্ত করেছে। যে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারকে বিরোধীরা ‘ভিক্ষে’ বলে কটাক্ষ করেছিল, এখন তারাই টাকা বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছে। তাই ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্প নিয়ে পাঁচ কথা হবে, সেটাই স্বাভাবিক।
সরকারি হিসেব বলছে, রাজ্যে নথিভুক্ত পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা ২২ লক্ষ ৪০ হাজার। এছাড়াও পরিযায়ী শ্রমিক আছেন। তাই কেউ যাতে ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্প থেকে বঞ্চিত না হন তার জন্য রয়েছে ‘আমাদের পাড়া আমাদের সমাধান’ শিবিরে নাম নথিভুক্ত করার সুযোগ। কেন্দ্রীয় সরকার যখন মানুষকে বঞ্চিত করার জন্য নানান ফন্দিফিকির করছে তখন মমতার সরকার আরও বেশি মানুষকে জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে যুক্ত করতে চাইছে।
তমলুক শহরের সুকান্ত প্রাইমারি স্কুলের ‘আমাদের পাড়া আমাদের সমাধান’ শিবিরে হাজির হয়েছিলেন শেখ ওমর ফারুক, শেখ সাইফুলরা। বাংলাদেশি সন্দেহে যে ৪০জনকে ওড়িশা সরকার আটকে রেখেছিল তার মধ্যে এঁরাও ছিলেন। চরম অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন। তাই তাঁরা আর ওড়িশায় যেতে চান না। শ্রমশ্রী প্রকল্পের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এ রাজ্যেই থাকতে চান। রাজ্যের বিভিন্ন শিবিরে জমা পড়ছে পরিযায়ী শ্রমিকদের আবেদনপত্র।
কতজন এই প্রকল্পের সুবিধা নেবেন? কতজন পরিযায়ী শ্রমিক তাঁদের দীর্ঘদিনের পরিচিত কাজের এলাকা ছেড়ে বাংলায় ফিরবেন, সঠিকভাবে প্রকল্প রূপায়িত হবে কি না, সেটা জানা যাবে পরে। তবে এর উদ্দেশ্য যে মহৎ তাতে কোনও সংশয় নেই। এই প্রকল্প বাংলার উপর, বাঙালির উপর ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক সরব প্রতিবাদ। অত্যাচারীর কবল থেকে অত্যাচারিতকে সুরক্ষিত করার প্রকল্প। তাই ‘শ্রমশ্রী’ আর পাঁচটা সরকারি প্রকল্প থেকে আলাদা।
ফের একবার বাংলায় ঘুরে গেলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বাংলা বলে বাঙালিপ্রেমী সাজার চেষ্টা করলেন। হাততালি পেলেন। কিন্তু ১০০দিনের কাজ, আবাস যোজনার টাকা নিয়ে টুঁ শব্দটি করলেন না। তাই এই বয়সে তাঁর এত পরিশ্রম শেষে জলে না যায়! কারণ বাঙালি পিটিয়ে, গরিবের পেটে লাথি মেরে বাংলাপ্রেমী হওয়া যায় না। তবুও মোদিজি বারবার বাংলায় আসবেন। আসবেন কতদিন? হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। ছাব্বিশের নির্বাচনী প্রচারের শেষদিন পর্যন্ত। তারপর দু’বছর তাঁর টিকিও দেখতে পাবে না বাংলা। ইতিহাস অন্তত সেকথাই বলে।