Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

যুদ্ধের জালে জ্বালানি অর্থনীতি, প্রাণ যায় উলুখাগড়ার

কথায় বলে, বেল পাকলে কাকের কী? পশ্চিম এশিয়ার দুটো দেশের মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছে। ইজরায়েল ইরানকে ড্রোন ছুড়ছে, তো ইরান ব্যালিস্টিক মিসাইলের আঘাত হানছে ইজরায়েলের উপর।

যুদ্ধের জালে জ্বালানি অর্থনীতি, প্রাণ যায় উলুখাগড়ার
  • ১৭ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: কথায় বলে, বেল পাকলে কাকের কী? পশ্চিম এশিয়ার দুটো দেশের মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছে। ইজরায়েল ইরানকে ড্রোন ছুড়ছে, তো ইরান ব্যালিস্টিক মিসাইলের আঘাত হানছে ইজরায়েলের উপর । ‘প্রকৃত বিশ্বগুরু’ ডোনাল্ড ট্রাম্প ইজরায়েলকে গ্যাস খাওয়াচ্ছেন... লড়ে যাও। আমরা আছি তোমাদের পিছনে। নেতানিয়াহু মহাশয়ও তেড়েফুঁড়ে হামলা চালিয়ে যাচ্ছেন। পাল্টা মার দিচ্ছে ইরানও। সঙ্গে হুমকি অঢেল। ইজরায়েলের যত ‘মিত্র’ দেশ আছে, সবাইকে লক্ষ্য করে। আর তার পাল্টা হুঙ্কার দিচ্ছেন ট্রাম্পও—আমেরিকার গায়ে এতটুকু আঁচ এলেও ইরানকে গুঁড়িয়ে দেব। আরব দুনিয়ার বাকি দেশগুলো দুশ্চিন্তার মেঘ মাথায় করে বসে আছে। এই হল অধুনা আন্তর্জাতিক রাজনীতির মোটামুটি একটা খসড়া ছবি। এখানে প্রশ্ন হল, এটাই তো বেল পাকার মতো অবস্থা। ভারতের মতো কাকের এতে কী আসে যায়? ভাবনা এবং হিসেব কষার শুরুটা এখানেই। অন্তত ভারতের আম জনতার জন্য তো বটেই। কারণ? একটাই—জ্বালানি অর্থনীতি।

Advertisement

এই অর্থনীতির হিসেব কষতে গেলে সবার আগে পশ্চিম এশিয়ার ম্যাপটা একটু বুঝে নিতে হবে। সেইসঙ্গে ইরানের অবস্থান। ইরান দেশটা বিশ্ব মানচিত্রের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় বসে আছে। তারা এশিয়ার সঙ্গে একদিকে ইউরোপ এবং অন্যদিকে আফ্রিকার সংযোগ রক্ষাকারী। ইরানের পূর্বে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান। পশ্চিমে ইরাক, তুরস্ক। খানিকটা উত্তর পশ্চিমে আর্মেনিয়া, আজারবাইজান। এছাড়া এর একদিকে কাস্পিয়ান সাগর, আর উল্টোদিকে পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগর। এবার আসা যাক চাঁদমারিতে। এই দুই উপসাগরের মধ্যবর্তী গভীর প্রণালী। নাম, হরমুজ। ছোট্ট ৩৩ কিমি বিস্তৃত একটা প্রণালী। কিন্তু তাকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে জ্বালানি রাজনীতির যাবতীয় ছক্কাপাঞ্জা। কীভাবে? 
গোটা বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল এবং গ্যাসের সরবরাহ হয় এই হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমেই। ইরাক হোক, কুয়েত বা আমিরশাহি... জলপথে এশিয়ার অন্য দেশগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হলে এদের হরমুজ প্রণালী ছাড়া গতি নেই। একই অবস্থা কাতারেরও। একে তো হরমুজে যে সাতটি ছোট ছোট দ্বীপ রয়েছে, তাদের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে। তার উপর প্রণালীর ঠিক মুখে রয়েছে ইরানের বন্দর আব্বাস। ইরান চাইলে এখান থেকে তাদের নৌসেনাকে কাজে লাগিয়ে পুরো হরমুজ প্রণালীটাই বন্ধ করে দিতে পারে। সেক্ষেত্রে জলপথে পশ্চিম এশিয়া একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তার ফল? প্রতিদিন এখান থেকে ২ কোটি ব্যারেল তেল এবং গ্যাসের সাপ্লাই হয়। অর্থাৎ, প্রায় ৩০০ কোটি লিটার! আটকে যাবে এই পুরোটাই। এর মধ্যে ভারতের অংশ কতটা? যত পরিমাণ জ্বালানি তেল ভারত আমদানি করে, তার ৭৫ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ৫০ শতাংশ। অপরিশোধিত তেল শুধু পেট্রল-ডিজেল তৈরি করে গাড়ি চালানোয় ব্যবহার হয় না! এর থেকে সার তৈরি হয়, উৎপাদন শিল্পে কাজে লাগে, বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, রান্নার গ্যাস এবং আরও অনেক কিছু। ইরান এখনও হরমুজ প্রণালী বন্ধ করেনি। কিন্তু এই পদক্ষেপ সত্যিই যদি তারা নেয়, তাহলে তার প্রভাব গোটা বিশ্বে পড়তে বাধ্য। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে। রাশিয়ার পর পশ্চিম এশিয়ার যে দু’টি দেশ থেকে ভারত সবথেকে বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানি করে থাকে, তারা হল ইরাক এবং সৌদি আরব। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে ওই কনসাইনমেন্ট আসার পথ থাকবে না। সৌদি আরব তাও সম্পূর্ণ উল্টোদিকের লোহিত সাগর এবং বাব-আল-মান্দেব প্রণালী পেরিয়ে আরব সাগরে ঢুকতে পারবে। ইরাক বা কাতারের মতো দেশের সেই উপায় নেই। তাতে খরচও যা হবে, খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। একান্তই বিকল্প রুট কিংবা বিকল্প দেশ থেকে আমদানির কথা ভাবতে হলে বাজনা বেশি বাজিয়েই আনতে হবে। আর তার মাসুল দেব আমরা, সাধারণ মানুষ। এরপর দ্বিতীয় সম্ভাবনা হিসেবে বাব-আল-মান্দেব প্রণালীও যদি বন্ধ হয়ে যায়? জলপথে ইউরোপ থেকে লোহিত সাগর হয়ে এই প্রণালীর মাধ্যমেই যাবতীয় পণ্যবাহী জাহাজ আরব সাগরে এসে পড়ে। রাশিয়া থেকে ভারতে যে অপরিশোধিত তেল আসে, তারও রুট এটাই। এই অ্যাকশন অবশ্য ইরানকে সরাসরি করতে হবে না। বাব-আল-মান্দেব লাগোয়া ইয়েমেনই করে দেবে। বলা ভালো করে দিচ্ছে। এই প্রণালী দিয়ে ইজরায়েল, ব্রিটিশ বা মার্কিন জাহাজ গেলেই তা টার্গেট হচ্ছে হুথিদের। কারা এই হুথি? শিয়া কট্টরপন্থী। অস্ত্রধারী। ইরানের সমর্থনে ইয়েমেনের এক-তৃতীয়াংশ এদেরই দখলে। হুথিরা একা নয়। বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিদের মদত দেওয়াটা তেহরানের নীতির মধ্যেই পড়ে। প্যালেস্তাইনে হামাস, লেবাননে হিজবুল্লা, সিরিয়ায় ফতেমিয় ব্রিগেড, ইরাকে আল-বদর। এদের মিলিতভাবে বলা হয় অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স। প্রতিরোধের অক্ষ। কীসের থেকে প্রতিরোধ? ইরানের শিয়া সর্বস্ব রক্ষণশীল সরকারের বিরোধিতা যারাই করবে, তাদের ‘শিক্ষা’ দিতে। কাতার, আমিরশাহি এবং কুয়েতের যাবতীয় তেলের ভাণ্ডার রয়েছে উপকূলেই, ইরানের ঠিক উল্টোদিকে। তেহরানের সঙ্গে ঝামেলায় তারা কিছুতেই যেতে চাইবে না। কারণ খোমেনেই প্রশাসন আগে থেকেই হুমকি দিয়ে রেখেছে, এই দেশগুলির মধ্যে যারা তার বিরোধিতা করবে, তাদের তেলের ভাণ্ডার উড়িয়ে দেবে ইরান। তাই বাধ্য হয়ে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তারা ইরানেরই পক্ষে। এর মধ্যে যদি হরমুজ ও বাব-আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে উভয় সঙ্কট। বাকি থাকবে শুধু পানামা! সেই মিশর প্রান্তরে। তাতেও জলের সমস্যা। ফলে ধস নামবে বিশ্ব অর্থনীতিতে। ভারতও তার বাইরে থাকবে না! এমনিতেই রাশিয়ার থেকে আমদানি করা তেলের দাম রীতিমতো ওঠানামা করে। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ৫৯ ডলার প্রতি ব্যারেল দরে ভারতকে তেল সাপ্লাই করেছিল রাশিয়া। সেটাই বাড়তে বাড়তে ৮০ ডলারে পৌঁছে গিয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসম্বের মাসে ৮৪ ডলারেও রাশিয়ার থেকে তেল কিনেছে ভারত। যদিও সাধারণ মানুষের তা নিয়ে আহাউহু করার মতো কিছু হয়নি। কারণ, ৫৯ ডলারে ভারত যখন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল কিনেছিল, আম জনতা তার কোনও সুফল পায়নি। বরং ওই বছর পেট্রলের দাম একলাফে ৮০ টাকা থেকে ৯৫ টাকা, আর তারপর ১০০ ছুঁয়েছিল। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৬৫ ডলারে নামলেও আম জনতা তার জন্য তেলের দামে এতটুক ছাড় পায়নি। যাবতীয় মুনাফা লুটেছে তেল কোম্পানি এবং কেন্দ্রীয় রাজকোষ। কিন্তু অপরিশোধিত তেলের দাম যদি সত্যিই এইসব সীমার বাইরে চলে যায়, তার বোঝা কিন্তু আমাদেরই বইতে হবে। অর্থাৎ, আম জনতাকে। তখন পেট্রলের দাম ১১৫ টাকা, কিংবা ডিজেল ১০৫ টাকা হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। অশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়লে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব পড়বে এলপিজিতে। কারণ, রান্নার গ্যাস উৎপাদনের জন্য যে প্রোপেন ও বিউটেন তৈরি হয়, সেই হাইড্রোকার্বন পাওয়া যায় অশোধিত পেট্রলিয়াম থেকেই। ফলে গ্যাসের দামও আর ৮৭৯ টাকায় থেমে থাকবে না। ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহণ খরচ তার সঙ্গে পাল্লা দেবে। বাসভাড়া বাড়বে, না হয় বাসের সংখ্যা কমবে। নিত্যপণ্য এখনই আকাশছোঁয়া। তখন ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে। কারণ, সরকার তখন আর 
জনতার কথা ভাববে না। কারা এই জনতা? যাদের মাসের গড় আয় ১২০০ টাকা পেরয় না। যারা এখনও বিনামূল্যে রেশনের আশায় বসে থাকে। যারা বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়ে কাজে যায়, আর ধরা পড়লে মুখ বুজে টিটিই’র সব হেনস্তা সহ্য করে। মোদির ভারত, ডিজিটাল ভারত, কর্পোরেট ভারত নয়, এই সব শর্তই প্রযোজ্য আসল ভারতের জন্য। এরাই সেই উলুখাগড়া... রাজায় রাজায় যুদ্ধ হলে যাদের প্রাণ যায়। দিকে দিকে আলোচনা চলছে, প্যানেল বসছে... প্রত্যেকেরই বয়ান এক অভিমুখ—আমেরিকা অংশ নিলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবেই। রাশিয়া ইরানকে খুব বেশি এগতে দেবে না। ইজরায়েলের উপর বিরতির চাপ এল বলে। কিন্তু এই উলুখাগড়াদের কথা কেউ বলছে না। বলবেও না। 
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে না। কারণ, তাহলে সেটা হবে পারমাণবিক। সব দেশ মিলে নিউক্লিয়ার ওয়েপন ছুড়লে পৃথিবী আর বাসযোগ্য থাকবে না। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে না। কারণ, হরমুজ ও বাব-আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার চড়া দাম বিশ্বের কোনও ক্ষমতাশালী দেশই দিতে চাইবে না। রসিকতা বা অ্যাডভেঞ্চার ততক্ষণই ভালো, যতক্ষণ তা সহ্যের সীমার মধ্যে থাকে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে না। কারণ, যুদ্ধ করলে নোবেল পাওয়া যায় না। যুদ্ধ থামালে যায়। আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের লক্ষ্য এখন একটাই—নোবেল শান্তি। কিন্তু হ্যাঁ, তারপরও অশান্তি বজায় থাকবে। তাহলেই যে বিক্রি হবে অস্ত্র, বরাদ্দ বাড়বে প্রতিরক্ষায়, অস্ত্র-গবেষণায়। টালমাটাল হবে অর্থনীতি। কারও পারমাণবিক ইনস্টলেশন গুঁড়িয়ে যাবে, কারও প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার, কারও তেলের খনিতে আগুন লাগবে, কারও গোয়েন্দা হেডকোয়ার্টারে বিস্ফোরণ হবে। তাহলেই তো বজায় থাকবে ক্ষমতার ভারসাম্য। আর একটি-দু’টি দেশ বসে থাকবে মাথার উপর। রাজার মতো। তারা হাসবে অন্তর্যামীর মতো। এই গোটাটাই যে ক্ষমতায় টিকে থাকার ফর্মুলা। 
ক্ষমতার অলিন্দ নিয়ে না ভেবে আমরা বরং বুক বাঁধি। সঙ্গে কোমরও। মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে নামার জন্য। সামনে কঠিন লড়াই। কারণ, প্রতিশ্রুতিতে যে পেট ভরে না, তা আমাদের থেকে বেশি ভালো কেউ জানে না। আপাতত লড়াই চলুক। সঙ্গে অপেক্ষা। ভোটের। তখন নিশ্চিত সুরাহা মিলবে। মোদি জমানার ইতিহাস যে সেটাই বলছে!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ