Bartaman Logo
৩০ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সমাপ্ত সন্ত্রাসের ভোট

ভারতের রাজনীতিতে বরাবরই আকর্ষণের কেন্দ্রে বাংলা। বাংলা থেকেই ভারতের শাসনক্ষমতায় প্রবেশ করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বকলমে ইংরেজ রাজশক্তি।

সমাপ্ত সন্ত্রাসের ভোট
  • ১ মে, ২০২৬ ০৪:০০

ভারতের রাজনীতিতে বরাবরই আকর্ষণের কেন্দ্রে বাংলা। বাংলা থেকেই ভারতের শাসনক্ষমতায় প্রবেশ করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বকলমে ইংরেজ রাজশক্তি। আবার বাংলা থেকেই গড়ে ওঠা স্বাধীনতার সংগ্রাম ভারতভূমি থেকে ইংরেজকে উৎখাত করেছে। আজ যে রাজনৈতিক শক্তি ভারত শাসন করছে তাদেরও উত্থান বাংলা থেকে। বঙ্গসন্তান শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের তৈরি জন সংঘেরই (পরে গৃহীত নাম ভারতীয় জন সংঘ) উত্তরসূরি আজকের বিজেপি। শ্যামাপ্রসাদের ভাবশিষ্য অটলবিহারী বাজপেয়ির হাত ধরে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে ভারতের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠান হয় বিজেপির। মাঝে এক দশকের বিরতির পর ২০১৪ সালে ফের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে তারা। সেই থেকে টানা চলছে মোদিযুগ, এমনকি দেশের বেশিরভাগ রাজ্যেও বিজেপি/এনডিএ/ডবল ইঞ্জিন সরকার চলছে। আর এখানেই আক্ষেপ নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহদের। পার্টির স্রষ্টার রাজ্যই অধরা তাঁদের। অঙ্গ, কলিঙ্গ জয় করেছেন তাঁরা আগেই। অথচ এই সঙ্গেই উচ্চারিত হয় যে রাজ্যটির (বঙ্গ) কথা সেটির নাগাল কিছুতেই পাচ্ছে না বেনিয়ার পার্টি। অনেক ছল বল কৌশল করেও ২০২১ সালে মাত্র ৭৭-এ মুখ থুবড়ে পড়েছিল বিজেপির অশ্বমেধের ঘোড়া। এদিকে মোদিজির যা বয়স, তাতে করে তাঁর শাসনকালে বাংলা দখলের স্বপ্নপূরণ হওয়া কঠিন বুঝে গিয়েছে গেরুয়া থিঙ্কট্যাঙ্ক। তাই দলের ভিতরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল ‘হয় এবার নয় নেভার’ স্লোগান, যেটা একই সঙ্গে প্রেরণাদায়ী এবং কটাক্ষমূলক। 

Advertisement

তাই শাপমোচনের কায়দায় বাংলা দখলের জন্য এবার জান কবুল করে দিয়েছে বিজেপি। যেন তেন প্রকারে বাংলার ক্ষমতা চাইতে গিয়ে বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় সরকার যাবতীয় নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিতেও কুণ্ঠিত হয়নি। গেরুয়া শিবিরের বেপরোয়াভাব প্রকট হয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধন পর্বেই। এসআইআরের নামে লক্ষ লক্ষ প্রকৃত নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অতঃপর ভোটের ময়দানে আমদানি করা হয়েছে বিপুল সংখ্যায় আধা সামরিক বাহিনীর জওয়ানদের। এত এত সিআরপি, আইটিবিপি, বিএসএফ জওয়ান উপদ্রুত কাশ্মীর কিংবা মণিপুরও দেখেনি। চলতি দফায় ভোট নেওয়া হয়েছে দেশের আরো চার জায়গায়, সেসব স্থানে আধাসেনা মোতায়েন করা হয়েছে বাংলার সামান্য এক ভগ্নাংশমাত্র। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) কেরামতিতে এখানেই দাঁড়ি পড়েনি, পুরো রাজ্য পুলিশ এবং সাধারণ প্রশাসনেরও হুকুম দখল নিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার স্বয়ং। কমিশনের হুকুম বদলে গিয়েছে সকালে বিকালে! কমিশনের কড়াকড়িতে নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতার লেশমাত্র দেখা যায়নি। বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে চোখ বুজে টার্গেট করা হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে। তাদের কোনো অভিযোগই কমিশনের কাছে আমল পায়নি। অন্যদিকে, বিজেপির তরফে আনা যেকোনো অভিযোগকেই ধ্রুব সত্য ধরে নিয়ে কমিশন রক্তচক্ষু দেখিয়ে চলেছে তৃণমূল নেতাকর্মীদের। বস্তুত রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার সম্পর্কে সবসময় অসূয়া মনোভাব পোষণ করা হয়েছে। ভাবখানা এই কমিশন চোর-পুলিশ খেলায় নেমেছে, যেখানে পুলিশ ইসিআই এবং তৃণমূলের সকলেই চোর! 
এই অনৈতিক লড়াইয়ে কমিশনের দোসর ইডি, সিবিআই, এনআইএ প্রভৃতি কেন্দ্রীয় এজেন্সিও। যেখানে যেমন মনে হয়েছে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে অমিত শাহের এজেন্সিকে। অবশেষে ময়দানে নামানো হয়েছে আধাসেনা পরিবৃত পুলিশ পর্যবেক্ষক এবং সাধারণ পর্যবেক্ষকদের। দু-দফার ভোটে এই টোটাল ফোর্সের কো-অর্ডিনেশন ছিল দেখার মতো! বিজেপি এরাজ্যে ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখলেও তাদের যেমন সংগঠন থাকা আবশ্যক, তার ধারেকাছেও নেই। ভোটের দুদিন মোদির পার্টির এই ঘাটতি খামতি নানাভাবে পূরণ করে দেওয়ার দায়িত্ব নিপুণ হাতেই পালন করেছে তারা। তারা বস্তুত বিজেপির প্রাইভেট আর্মির ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিল। এই শক্তি যে বিরোধী, এমনকি নিরপেক্ষ মানুষের সঙ্গেও যথোচিত ব্যবহার করবে না, সেটাই স্বাভাবিক। ভোটের দুদিন শহর কলকাতায় এবং বিভিন্ন জেলায় অবাক করা ‘সন্ত্রাস’ নামিয়ে এনে তারা নাগরিকের আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত করেছে। মধ্যরাতে তৃণমূলের ভোট ম্যানেজারদের বাড়িতে হানা দিয়েছে। অভব্য আচরণ করেছে মহিলা এবং শিশুদেরও সঙ্গে। ভোটগ্রহণকালে বিরোধীদের ক্যাম্প অফিস ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্মমভাবে মারধরও করা হয়েছে অনেক রাজনৈতিক কর্মীকে, এমনকি সাধারণ ভোটারদের। অন্যদিকে পদ্মপার্টির ক্যাম্প অফিসগুলি আধাসেনার নজরেই আসেনি। সোজা কথায়, জ্ঞানেশ কুমার-অমিত শাহ জুটির আধাসেনা বাংলায় এক চোখ বুজেই বীরত্বপ্রদর্শন করেছে। এমনকি বিজেপি বিরোধী ভোটারদের আটকাতে টার্গেট হয়েছে অনেকের পোশাক পর্যন্ত! কমিশনের বকলমে বিজেপির অগণতান্ত্রিক খেলার বাকি আছে আর সামান্যই। আগামী ৪ তারিখই তা খতম হবে বলে বিশ্বাস করে বাংলা, বারবার জেতাকেই যারা নিয়ম করে ফেলেছে।

সম্পর্কিত সংবাদ