নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: আর্যরা আক্রমণকারী হিসাবে ভারতে এসেছিল। তাদের আক্রমণেই ধ্বংস হয় সিন্ধু সভ্যতা। ঊনবিংশ শতাব্দীর এরিয়ান ইনভেশন থিওরি বা আর্য আক্রমণতত্ত্ব আর সর্বজনগ্রাহ্য নয়। প্রায় খারিজই হয়ে গিয়েছে এই তত্ত্ব। তবে ঐতিহাসিকদের মতে, অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য আর্য পরিযায়ী তত্ত্ব বা এরিয়ান মাইগ্রেশন থিওরি। এক শ্রেণির ভারতীয় এবং বিদেশি ঐতিহাসিক আবার আর্যদের এদেশের অধিবাসী বলে একটি তত্ত্ব দেন। সেটিকে বলা হয় এরিয়ান ইনডিজিনাস থিওরি। সরকারের পরিকল্পনা মতো সব এগলে স্কুল সিলেবাসে এই তত্ত্বকেই অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে বলে সূত্রের খবর। বিগত সব সরকারের সময়কালের সিলেবাসকে তা কার্যত উড়িয়ে দেবে।
আর্য পরিযায়ী তত্ত্ব অনুযায়ী, আর্যরা মধ্য এশিয়ার স্তেপ অঞ্চল থেকে পরিযায়ী হয়ে ভারতে আসে। আনুমানিক সময়সীমা ধরা হয় খ্রীষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫০০ বছর। তবে ততদিনে প্রাকৃতিক কারণে সিন্ধু সভ্যতার পতন হয়ে গিয়েছে। আর্যরা প্রোটো ইন্দো-এরিয়ান ভাষায় কথা বলত। সেই ভাষা থেকেই সংস্কৃতের সৃষ্টি বলে অনেকে মনে করেন। কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন, আর্যরা ভারতেরই বাসিন্দা। ঋগ্বেদ বা হিন্দুধর্মের প্রাচীনতম গ্রন্থ আর্যদেরই, তাদের বহিরাগত ভাবার কারণ নেই।
হরিয়ানার হিসার ডিভিশনের হাঁসি জেলার রাখিগড়ি প্রত্নখনন অঞ্চলে পাওয়া বেশ কিছু নরকঙ্কালের মধ্যে একটির ডিএনএ বিশ্লেষণ হয়েছে। সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম জনপদ এই অঞ্চলে ছিল বলে মনে করা হয়। ২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রের দাবি অনুযায়ী, ৪ হাজার ৫০০ বছরের প্রাচীন ওই কঙ্কালের ডিএনএ’র সঙ্গে স্তেপস অঞ্চলের মানুষের ডিএনএ’র মিল নেই। বরং প্রাচীন দক্ষিণ এশীয় অধিবাসীদের সঙ্গে মিল বেশি। এর দু’রকম ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অনেকে মনে করেন, এটি আসলে আর্য পরিযায়ী তত্ত্বের প্রমাণ। আবার অনেকে বলেন, সময়কাল অনুযায়ী এই কঙ্কাল আর্যদের। তাই তারা ভারতীয়।
বিজেপি, আরএসএস এবং বিশ্বহিন্দু পরিষদের মতো দল এবং সংগঠন আর্যদের ভারতীয় হিসাবেই দাবি করে এসেছে বরাবর। এ বছর শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য তাঁর ভাষণে আর্যরা যে বহিরাগত এই তত্ত্বের সমালোচনা করেন। এ বছর বিদ্যাসাগর পুরস্কার দেওয়া হয়েছে অমলেশ মিশ্রকে। তিনিও আর্য আক্রমণতত্ত্বের কঠোর বিরোধী। তাঁর একটি বইয়ের নাম হল ‘আর্য আক্রমণতত্ত্ব খ্রিস্টান মিশনারি এবং ইংরেজি ঔপনিবেশিকদের উদ্দেশ্য প্রণোদিত একটি কাল্পনিক মতবাদ’।
সিলেবাস কমিটি সূত্রে খবর, শাসকদলের শীর্ষস্তর থেকে নির্দেশ এসেছে ইতিহাসের সিলেবাসে এই সংক্রান্ত পরিবর্তনের। স্কুল সিলেবাস এক্সপার্ট কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘সিলেবাসে খুব বেশি পরিবর্তনের সুযোগ এ বছর নেই। তাহলে বই ছাপতে দেরি হবে। তবে এই সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব রয়েছে। তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ইতিহাসবিদ এবং অধ্যাপকদের মতামত নেওয়া হবে।’ প্রসঙ্গত এনসিইআরটি’র সিলেবাসেও অনেকটা এই তত্ত্ব দেওয়া হয়েছে। তা নিয়ে সমালোচনা কম হয়নি। ‘এ নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন,’ এই একটি লাইন লিখে দায় সারা হয়েছে। রাজ্যের সিলেবাস কমিটির এক সদস্যের দাবি, ‘আর্যরা ভারতীয়, এই তত্ত্বেই জোর থাকছে সিলেবাসে। তবে কিছুটা ভারসাম্য রক্ষা করা হবে।’