ভোট মানেই বাংলায় একটা আলাদা ব্যাপার। ভোটের ঢাকে কাঠি পড়ার আগে থেকেই টগবগ করে ফুটতে থাকে গোটা রাজ্য। তার উপর ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আলাদা মাত্রা। সৌজন্যে নবান্ন দখলে বিজেপির মরিয়া ভাব এবং এসআইআর নামক যন্ত্রণা। আর সেই আবহেই শনিবার ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্রিগেড সভা। রবিবার জাতীয় নির্বাচন কমিশন ভোট ঘোষণা করেছে। পশ্চিমবঙ্গে ভোট নেওয়া হবে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল। কিন্তু তার আগের দিন, শনিবার দুপুরে শহরের বুকে ঘটে গেল ধুন্ধুমার কাণ্ড। ব্রিগেড যাওয়ার পথে এক দল গেরুয়া ক্যাডার তাণ্ডব চালাল গিরিশ পার্ক এলাকায়। হামলাকারীদের লক্ষ্য ছিল রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজার বাসভবন। অর্থাৎ ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার আগেই, খোদ শহরে শুরু হয়ে গেল নির্বাচনি সংঘর্ষ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভার আগেই শনিবার দুপুরে কলকাতার রাজপথে হল বিজেপির ব্রিগেড বাহিনীর তাণ্ডব! আক্রান্ত হলেন রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী শশী পাঁজা স্বয়ং। ভাঙচুর করা হল গিরিশ পার্ক এলাকায় সি আর অ্যাভেনিউয়ের উপর তাঁর বাড়ি। স্থানীয় দুই থানার ওসিরা পর্যন্ত রেহাই পাননি উচ্ছৃঙ্খল গেরুয়া ক্যাডারদের আক্রমণ থেকে। ইটের আঘাতে গুরুতর জখম হয়েছেন বউবাজার থানার ওসি। ছজন অন্য পুলিশ কর্মীও জখম হয়েছেন। গর্জে উঠেছে রাজ্যের শাসক দল। মন্ত্রী শশী পাঁজা সরাসরি অভিযোগ করেছেন, হামলকারীরা শুধু গুন্ডা নয়, খুনিও। তাঁকে পরিকল্পিতভাবে খুন করারই চেষ্টা হয়েছিল! তৃণমূল সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এক্স-এ দাবি করেছেন, বিজেপির গুন্ডাগিরি বাংলা মেনে নেবে না। মন্ত্রীর বাড়িতে হামলার অভিযোগে ধরপাকড়ে ক্ষুব্ধ বিজেপি বেশি রাতে বরানগর থানা ঘেরাও করে।
শশী পাঁজার বাসভবনের ঠিক সামনেই রাস্তার উপর তৃণমূলের তরফে টাঙানো ছিল কিছু পোস্টার-ফ্লেক্স। তাতে লেখা ছিল ‘বয়কট বিজেপি’। শনিবার ব্রিগেডগামী গেরুয়া বাহিনী সেসব ছিঁড়ে দেয়। সেখানেই না থেমে রীতিমতো তাণ্ডবে মেতে ওঠে দুষ্কৃতী দল। তারা হটপাটকেল হাতে মন্ত্রীর বাড়ির দিকে চড়াও হয়। স্বভাবতই প্রতিবাদে সরব হয় স্থানীয় তৃণমূল কর্মীরা। কিন্তু প্রতিবাদের কণ্ঠও স্তব্ধ দিতে বদ্ধপরিকর ছিল গেরুয়া বাহিনী। তারা এলোপাথাড়ি ডান্ডা চালাতে থাকে। ভেঙে যায় মন্ত্রীর বাড়ির জানালার কাচ। ফেটে যায় কাঠের দরজা। গেরুয়া ফতুয়া-পাঞ্জাবি পরা হামলাকারীরা মন্ত্রীর বাড়ির ভিতরেও ঢুকে পড়ে। সেখানেও চলে ভাঙচুর। মন্ত্রী-ঘনিষ্ঠদের পক্ষে এই আকস্মিক হামলা ঠেকানো সম্ভব ছিল না। আতঙ্কে বাইরেই বেরোনোর চেষ্টা করেন মন্ত্রী। জোড়াসাঁকোর বিধায়ক শশী পাঁজার অভিযোগ, তখন তাঁকেই লক্ষ্য করে মুহুর্মুহু ইটবৃষ্টি শুরু হয়। ইটের আঘাতে শরীরে নানা স্থানে গুরুতর চোট পেয়েছেন মন্ত্রী। একাধিক জায়গা থেকে রক্তক্ষরণও হয় তাঁর। দলের ঘনিষ্ঠ কর্মী-সমর্থকরা তাঁকে ঘিরে ধরে এই ‘প্রাণঘাতী হামলা’ থেকে কোনোক্রমে বাঁচায়। শশী পাঁজার দাবি, হামলাকারীরা তাঁকে ‘মার্ডার’ করতেই গিয়েছিল। তৃণমূলের অন্তত ৫০ জন জখম হয়েছে। প্রচণ্ড উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে লাঠি হাতে এক বিজেপি নেত্রীর ‘আবির্ভাব’ ঘটে। ওই মহিলা ত্রিপুরা থেকে আগত। মন্ত্রীর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তিনিই উসকানি দিতে থাকেন তাণ্ডবকারীদের। অমনি ব্রিগেডগামী বাস থেকে নেমে হামলা চালায় গেরুয়া ক্যাডাররা। মন্ত্রীর বাড়ির সামনে রাখা তৃণমূল কর্মীদের বাইক-স্কুটারেও হামলা নেমে আসে। খবর চাউর হতেই স্থানীয় তৃণমূল কর্মীরা চলে আসে। বেধে যায় খণ্ডযুদ্ধ।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত পৌঁছে যায় একাধিক থানার ফোর্স এবং ছিলেন ওসিরাও। কিন্তু হামলাকারীরা সংখ্যায় বেশি থাকায় পুলিশের হিমশিম অবস্থা হয়। এই অশান্তি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক সভা অবশ্যই হবে। বিধানসভার মতো ওজনদার নির্বাচনের আগে তো বটেই। বাংলায় ব্রিগেড সভা হল যেকোনো দলের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্মসূচি। শনিবারের ব্রিগেড সভার গুরুত্ব ছিল অনেকখানি। কারণ আয়োজক বিজেপি, বাংলায় প্রধান বিরোধী দল। তারা আগামী দিনে এরাজ্যে শাসক হওয়ার খোয়াব দেখে। এটা প্রধানমন্ত্রীর দল। সভার প্রধান বক্তা নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং। তাই বিজেপির কাছে বিশেষ দায়িত্ব প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু শনিবার কী অভিযোগ উঠল? লাঠি, বোমা, ইট, বোতল প্রভৃতি নিয়ে জনসভায় যাচ্ছে ক্যাডাররা? যাওয়ার পথে গুন্ডামিও করল এক দফা! ছাড় পেলেন না মহিলা মন্ত্রী থেকে মহিলা পুলিশ কর্মীরাও। ব্রিগেডের নামে কলকাতাকে রক্তাক্ত করা হল! দলটি কোন ‘পরিবর্তন’-এ বিশ্বাসী সেটাই কি খোলসা হয়ে গেল না এদিন? গিরিশ পার্কে অশান্তি নিয়ে পুলিশ কমিশনারের রিপোর্ট তলব করেছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। কেন্দ্রীয় বাহিনীর অনুপস্থিতির বাস্তবটাও ছিল বিস্ময়কর। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচনের স্বার্থে কমিশনকে উপযুক্ত ভূমিকায় চায় বাংলা।