মাস দুয়েক আগে মোদি সরকারের একটি রিপোর্টকে সামনে রেখে বঙ্গের বিজেপি নেতারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে গেল গেল রব তুলেছিলেন। দলের রাজ্যসভার এক সাংসদের লিখিত প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় কর্পোরেট বিষয়ক রাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রীহর্ষ মালহোত্রা জানিয়েছিলেন, ২০১৯ থেকে ২৪ সাল— এই পাঁচ বছরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ২ হাজার ২২৭টি কোম্পানি তাদের রেজিস্টার্ড অফিস অন্য রাজ্যে সরিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত কোম্পানি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এই তথ্য কোন গবেষণাগারে পেয়েছেন তা অবশ্য খোলসা করেননি। রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য এই তথ্যকে ‘গাঁজাখুরি’ আখ্যা দিয়েছিল। কিন্তু ওই যে কথায় আছে, ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে’। অতি সম্প্রতি সেই কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রকের ঝোলা থেকেই একটা বড় বিড়াল বেরিয়ে পড়েছে। তাদের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, দেশে এই মুহূর্তে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে রেজিস্টার্ড কোম্পানির সংখ্যা ২৮ লক্ষ ৫ হাজার। এর মধ্যে চালু অবস্থায় আছে ১৮ লক্ষ ১৭ হাজার কোম্পানি। বাকি প্রায় ১০ লক্ষ কোম্পানির ঝাঁপ বন্ধ হয়েছে। আরও ১০ হাজার ৪২৫টি সংস্থায় তালা ঝোলার অপেক্ষা! তারা কোমায় রয়েছে। তার মানে, মোদির ‘বিকশিত ভারতে’ প্রায় ৩৫ শতাংশ কোম্পানিরই কোনও অস্তিত্ব নেই এখন। কেন্দ্রের তথ্যই বলছে, এই সংস্থাগুলির ৯৬ শতাংশ বেসরকারি মালিকানাধীন। এর মধ্যে বিদেশি কোম্পানি রয়েছে ৫ হাজার ২১৬টি। যার মধ্যে আবার ১ হাজার ৯৩৫টি বন্ধ। কেন্দ্রীয়মন্ত্রী রাজ্যসভায় পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে যে দাবি করেছিলেন সেখানে কোম্পানি অন্য রাজ্যে স্থানান্তরের কথা বলা হয়েছিল। যাকে ‘হতেই পারে’ বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি। কিন্তু গোটা দেশে বন্ধ সংস্থার তথ্য দিয়ে তাঁর মন্ত্রক নিজেরাই দু’য়ের পার্থক্য বুঝিয়ে দিয়েছে, স্থানান্তর আর বন্ধ হওয়া এক নয়।
Advertisement
বঙ্গের বিজেপি নেতাদের উল্লাসে জল ঢেলে দিতে পারে কেন্দ্রের দেওয়া আরও একটি তথ্য। বলা হয়েছে, দেশের ৩৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিলিয়ে যত চালু কোম্পানি রয়েছে তার ১৯ শতাংশের ঠিকানা মহারাষ্ট্র। সচল থাকার নিরিখে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে দিল্লি। তাদের অংশীদারিত্ব ১৪ শতাংশ। আর তৃতীয় স্থানেই রয়েছে যুগ্মভাবে পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তরপ্রদেশ। এই দুই রাজ্যে সচল থাকা সংস্থার হার ৮ শতাংশ। বাংলায় চালু থাকা কোম্পানির সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ৪৬ হাজার। অর্থাৎ গোটা দেশে চালু ১৮ লক্ষের মধ্যে প্রায় দেড় লক্ষের ঠিকানাই এই পশ্চিমবঙ্গ। শুধু জানুয়ারি মাসেই এই রাজ্যে ৮০৮টি সংস্থা নতুন করে চালু হয়েছে। প্রসঙ্গত, এর মধ্যে অবশ্য ক্ষুদ্র-ছোট-মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) সংস্থা নেই (বলা বাহুল্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বাংলা বেশ এগিয়ে)। শিল্পমহলের মতে, এই পরিস্থিতি হওয়ারই ছিল। কেন্দ্রের নীতিতে দেশের আর্থিক কর্মকাণ্ড ঝিমিয়ে পড়েছে। আর্থিক বৃদ্ধির হার ৫.৪ শতাংশে নেমেছে। মানুষের হাতে টাকা নেই বলে বাজারে পণ্যের চাহিদা তৈরি হচ্ছে না। চাহিদা না থাকায় বিপণন শিল্প মার খাচ্ছে। এসবের অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে একের পর এক সংস্থা পাততাড়ি গোটাচ্ছে। সরকারি লাল ফিতার ফাঁস এড়িয়ে ব্যবসার পথ সুগম করা, জিএসটির সরলীকরণ, আয়করে বিপুল ছাড় দেওয়ার মতো প্রচার চালিয়ে পরিস্থিতি ‘স্বাভাবিক’ বোঝানোর চেষ্টা করছে মোদি সরকার। কিন্তু তাতে যে কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না, ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার তথ্যেই তা পরিষ্কার।
মোদি জমানায় লক্ষ লক্ষ কোম্পানি বন্ধের মতোই কর্মসংস্থানের ছবিটাও সমান উদ্বেগজনক। গত সপ্তাহেই কেন্দ্র জানিয়েছে, গত বছরের শেষ ছ’মাসে শহরাঞ্চলে ১৫ বা তার বেশি বয়সিদের বেকারত্বের হার ৬.৪ শতাংশ। বছরের শেষ তিন মাসে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি পুরুষ বেকারত্বের হার বেড়ে হয়েছে ১৬.১ শতাংশ। কর্মপ্রার্থীর হারও বেড়ে হয়েছে ৫০.৪ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হল, শিক্ষিত বেকারের হার। আইএলও-র রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০০ সালে এদেশে শিক্ষিত বেকার ছিল ৩৫.২ শতাংশ। ২০২২ সালে সেটা বেড়ে হয়েছে ৬৫.৭ শতাংশ। প্রায় দ্বিগুণ। ভারতে কর্মহীনদের ৮৩ শতাংশই যুব, মানে যাঁদের বয়স ৪০ এর নীচে। এটাই মোদির নতুন ভারত, ‘বিকশিত’ ভারতের আসল ছবি। যেখানে একের পর এক সংস্থার ঝাঁপ বন্ধ হওয়ায় কাজের সুযোগ কমছে, বাড়ছে কর্মহীনদের সংখ্যা।
মোদি জমানায় লক্ষ লক্ষ কোম্পানি বন্ধের মতোই কর্মসংস্থানের ছবিটাও সমান উদ্বেগজনক। গত সপ্তাহেই কেন্দ্র জানিয়েছে, গত বছরের শেষ ছ’মাসে শহরাঞ্চলে ১৫ বা তার বেশি বয়সিদের বেকারত্বের হার ৬.৪ শতাংশ। বছরের শেষ তিন মাসে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি পুরুষ বেকারত্বের হার বেড়ে হয়েছে ১৬.১ শতাংশ। কর্মপ্রার্থীর হারও বেড়ে হয়েছে ৫০.৪ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হল, শিক্ষিত বেকারের হার। আইএলও-র রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০০ সালে এদেশে শিক্ষিত বেকার ছিল ৩৫.২ শতাংশ। ২০২২ সালে সেটা বেড়ে হয়েছে ৬৫.৭ শতাংশ। প্রায় দ্বিগুণ। ভারতে কর্মহীনদের ৮৩ শতাংশই যুব, মানে যাঁদের বয়স ৪০ এর নীচে। এটাই মোদির নতুন ভারত, ‘বিকশিত’ ভারতের আসল ছবি। যেখানে একের পর এক সংস্থার ঝাঁপ বন্ধ হওয়ায় কাজের সুযোগ কমছে, বাড়ছে কর্মহীনদের সংখ্যা।


