Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

মহাকাশবাসে শরীরে প্রভাব

সম্প্রতি পৃথিবীতে ফিরলেন সুনীতা উইলিয়ামস ও বুচ উইলমোর। দীর্ঘ সময়ে মহাকাশ স্টেশনে থাকলে নভশ্চরদের শরীরে কী কী প্রভাব পড়তে পারে, জানালেন মৃণালকান্তি দাস

মহাকাশবাসে শরীরে প্রভাব
  • ২৩ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০

সম্প্রতি পৃথিবীতে ফিরলেন সুনীতা উইলিয়ামস ও বুচ উইলমোর। দীর্ঘ সময়ে মহাকাশ স্টেশনে থাকলে নভশ্চরদের শরীরে কী কী প্রভাব পড়তে পারে, জানালেন মৃণালকান্তি দাস

Advertisement

মহাকাশচারীরা দীর্ঘদিন মহাকাশে থাকলে তাঁদের শরীরে ঘটে যেতে পারে অদ্ভুত সব পরিবর্তন। বদলে যেতে পারে তাঁদের পেশি ও মস্তিষ্ক। প্রভাব পড়তে পারে পাকস্থলীতে থাকা ব্যাকটেরিয়াতেও। এখনও পর্যন্ত একজন মহাকাশচারীরই টানা ৪৩৭ দিন মহাকাশে থাকার রেকর্ড রয়েছে। গত শতাব্দীর ন’য়ের দশকের মাঝামাঝি রুশ মহাকাশচারী ভালেরি পলিয়াকভ ওই রেকর্ড গড়েন। মার্কিন মহাকাশচারীদের মধ্যে ফ্রাঙ্ক রুবিও ৩৭১ দিন মহাকাশে ছিলেন। তাঁর আগের রেকর্ডটি ছিল ৩৫৫ দিনের। আর দীর্ঘ ৯ মাস ধরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) আটকে থাকার পর নাসার নভশ্চর সুনীতা উইলিয়ামস ও বুচ উইলমোর অবশেষে পৃথিবীতে ফিরেছেন।
রুবিওর অবশ্য এত দিন মহাকাশে থাকার কথা ছিল না। কিন্তু তিনি এবং তাঁর সতীর্থদের মহাকাশ স্টেশন থেকে যে মহাকাশযানে ফেরার কথা ছিল, সেটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে ২০২৩ সালের মার্চে তাঁদের মহাকাশে থাকার সময় বাড়াতে হয়। ওই বাড়তি সময় মিলিয়ে রুবিও মহাকাশে যে ৩৭১ দিনে থেকেছেন, সেই সময়ে তিনি ৫ হাজার ৯৬৩ বার পৃথিবীর কক্ষপথ পরিভ্রমণ করেছেন। ভ্রমণ করেছেন ১৫ কোটি ৭৪ লক্ষ মাইল (২৫ কোটি ৩৩ লক্ষ কিলোমিটার) দূরত্ব।
মহাকাশযান সোয়ুজ এমএস-২৩ যখন ধুলোর ঝড় উড়িয়ে নিরাপদে কাজাখস্তানের শহর ঝেজকাজগানে ফিরে আসে, তখন রুবিওর মুখে ছিল চওড়া হাসি। কিন্তু নিজের ক্যাপসুল থেকে তিনি একা বেরিয়ে আসতে পারেননি। উদ্ধারকারী দল তাঁকে বের করে নিয়ে আসে। লম্বা সময় ধরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) লো গ্র্যাভিটির মধ্যে থাকার কারণে তাঁর শরীরকে মূল্য চোকাতে হয়েছে।
বিভিন্ন দেশ এখন মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, মঙ্গল গ্রহে যেতে এবং সেখান থেকে ফিরে আসতে প্রায় ১ হাজার ১০০ দিনের (তিন বছরের বেশি) মতো সময় লেগে যেতে পারে। এ ছাড়া যে মহাকাশযানে মহাকাশচারীদের মঙ্গল গ্রহে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে, সেটির আকার আইএসএস থেকে অনেক ছোট হবে। যার অর্থ, সেখানে ব্যায়ামের জন্য ছোট এবং কম ওজনের যন্ত্রপাতির প্রয়োজন পড়বে। দীর্ঘ মহাকাশ ভ্রমণে মহাকাশচারীদের শরীর ফিট রাখার পাশাপাশি মানবদেহের ওপর দীর্ঘ ভ্রমণের প্রভাব নিয়েও তাই উদ্বেগ বাড়ছে। টানা মহাকাশে থাকার ফলে মানবদেহের উপর কী প্রভাব পড়ে?

জিনগত পরিবর্তন

কেলিকে নিয়ে গবেষণায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফলাফল হচ্ছে, মহাকাশে দীর্ঘদিন কাটানোর কারণে তাঁর ডিএনএর পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে পারা। আমাদের ডিএনএর উভয় প্রান্ত টেলোমেয়ার দ্বারা সুরক্ষিত থাকে। এই টেলোমেয়ার টেলোমেরাস নামক এনজাইম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। টেলোমেয়ার জিনের ক্ষয় রোধে সহায়তা করে। যখন আমাদের বয়স বেড়ে যায়, টেলোমেয়ার ছোট হতে থাকে। কেলি ও অন্য নভোচারীদের উপর গবেষণা করে দেখা গিয়েছে, মহাকাশ ভ্রমণে টেলোমেয়ারের আকারে পরিবর্তন হয়েছে।

ওজন কমে যায়

যদিও মহাকাশে ওজনের তেমন কোনও প্রভাব নেই। মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে কিছু ফেলে দিলে তা মাটিতে পড়বে না। সব বাতাসে ভেসে বেড়াবে, মানুষও। তাই মহাকাশে ওজন ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। ওজন ঠিক রাখতে নাসা চেষ্টা করছে তাদের নভশ্চরদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করতে। এ জন্য তারা সম্প্রতি মহাকাশ স্টেশনে স্যালাড হিসেবে খাওয়া যায় এমন পাতার চাষ শুরু করেছে।

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা

মহাকাশ ভ্রমণে যাওয়ার আগে, মাঝখানে ও ফিরে আসার পর কেলিকে বেশ কিছু টিকা দেওয়া হয়েছে। মহাকাশ থেকে ফিরে আসার পর পরীক্ষায় তাঁর দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় তেমন কোনও অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি। বরং স্বাভাবিকই ছিল। তবে কয়েকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, মহাকাশে নানা তেজস্ক্রিয় রশ্মির সংস্পর্শে আসায় নভোচারীদের রক্তে শ্বেতকণিকা অনেক সময় কমে যায়। মহাকাশে দীর্ঘসময় থাকার ফলে মানবদেহে কী কী পরিবর্তন ঘটতে পারে, তা নিয়ে আরও বেশ কিছু গবেষণা চলছে। এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর পেতে হবে।

সংবেদনশীল ত্বক

মহাকাশে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর পৃথিবীতে ফিরে আসা নভোচারীদের ত্বক অনেক বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। র‍্যাশও দেখা দেয়। মহাকাশে থাকার সময় ত্বকে উদ্দীপনা কম থাকার কারণে এমনটা হতে পারে।

পেশি ও হাড়ের ক্ষয়

মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ক্রমাগত টান খুব কম থাকার কারণে পেশি ও হাড়ের ঘনত্ব দ্রুত হ্রাস পেতে শুরু করে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে মানুষের পিঠ, ঘাড়, ঊরু ও পায়ের হাঁটুর নীচের পেশিতে। মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে যেহেতু সেই সব অঙ্গগুলির খুব বেশি কাজ করতে হয় না, সেহেতু সেগুলি ক্রমে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে থাকে। মহাকাশে মাত্র দুই সপ্তাহে পেশির ঘনত্ব ২০ শতাংশ পর্যন্ত এবং তিন থেকে ছয় মাসে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। একইভাবে হাড়ের ঘনত্ব ও শক্তিও কমতে থাকে। মহাকাশচারীদের মহাকাশে প্রতি মাসে হাড়ের ঘনত্ব ১ থেকে ২ শতাংশ কমে।
হাড়ের ঘনত্ব কমলে হাড়ে চিড় ধরার ঝুঁকি বাড়ে। মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে ফেরার পর একজন মহাকাশচারীর হাড়ের ঘনত্ব আগের অবস্থায় ফিরে আসতে চার বছরের বেশি সময় লাগে। পেশি ও হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া আটকাতে মহাকাশচারীরা প্রতিদিন গড়ে আড়াই ঘণ্টা ব্যায়াম করেন। আর যখন মহাকাশ স্টেশনে থাকেন তখন আরও বেশি শারীরিক কসরত করেন। স্বাস্থ্য ধরে রাখতে তাঁরা বিভিন্ন সাপ্লিমেন্টও সেবন করেন। 

দৃষ্টিশক্তিতে পরিবর্তন

পৃথিবীতে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি মানবদেহে রক্তপ্রবাহকে নীচের দিকে ধাবিত হতে সাহায্য করে। হৃদযন্ত্র পাম্প করে আবার রক্তকে উপরে তোলে। মহাকাশে এই প্রক্রিয়ায় পুরো জগাখিচুড়ি পাকিয়ে যায় এবং রক্ত স্বাভাবিকের থেকে বেশি সময় মাথায় জমা থাকতে পারে। মাথায় জমে থাকা ওই রক্তের কিছু অংশ চোখের পিছনে জমে যেতে পারে। ফলে চোখ ফুলে যেতে পারে। এতে দৃষ্টিশক্তিতে পরিবর্তন হতে পারে এবং দেখার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এমনকী, চোখের গড়নেও পরিবর্তন আসতে পারে। মহাকাশচারীরা পৃথিবীতে ফেরার পর দৃষ্টিশক্তি ও চোখের আকার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে বছর খানিক সময় লেগে যায়। গ্ল্যাকটিক কসমিক রশ্মির সংস্পর্শে আসার কারণে এবং এনার্জেটিক সোলার পার্টিকেলের কারণে চোখে আরও বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। পৃথিবীতে বায়ুমণ্ডল আমাদের এসব থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করে। কিন্তু মহাকাশ স্টেশনে নভশ্চরদের এসব থেকে রক্ষা করার কেউ নেই। যদিও মহাকাশের এই তীব্র আলোকরশ্মি থেকে নভোচারীদের রক্ষা করতে মহাকাশযানে নানা সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু মহাকাশ স্টেশনে অবস্থানের সময় মহাকাশচারীরা তীব্র আলোর ঝলক দেখতে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

ভালো ব্যাকটেরিয়া

গত কয়েক বছরের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মানবদেহের সুস্বাস্থ্যের বিষয়টি অনেকাংশে দেহের ভিতর ও উপরে বসবাসকারী অণুজীবের গঠন ও বৈচিত্র্যের উপর নির্ভর করে। আমরা যে খাবার খাই, সেটা কীভাবে হজম হবে, তা এই অণুজীবের উপর নির্ভর করে। গবেষকরা দেখেছেন, কেলি মহাকাশে যাওয়ার আগে ও মহাকাশ থেকে ফেরার পর তাঁর পাকস্থলীতে ব্যাকটেরিয়াসহ অন্য অণুজীবের উপস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। তবে এটা খুব বেশি অবাক করার মতো নয়। কারণ, আমরা প্রতিদিন যেসব খাবার খাই এবং আমাদের আশপাশে যেসব মানুষ বসবাস করে, তার উপর আমাদের শরীরে অণুজীবের উপস্থিতি নির্ভর করে। মহাকাশে নানা রশ্মির সংস্পর্শে আসা, রিসাইকেল করা জল পান করা এবং শারীরিক সক্রিয়তায় বড় পরিবর্তন এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।

স্নায়ুসংক্রান্ত সমস্যা

নাসার মহাকাশচারী স্কট কেলি আইএসএসে ৩৪০ দিন ছিলেন। পৃথিবীতে ফিরে একটি বিস্তৃত গবেষণায় অংশ নেন তিনি। মহাকাশে দীর্ঘদিন অবস্থানের ফলে মানবদেহে তার কী প্রভাব পড়ে, তা নিয়ে ওই গবেষণা চালানো হয়। কেলির যমজ ভাই পৃথিবীতে ছিলেন। কেলি ফেরার পর দুই ভাইয়ের স্বাস্থ্যগত অবস্থা নিয়ে পরীক্ষা চালানো হয়। সেখানে দেখা যায়, মহাকাশ থেকে ফেরার প্রায় ছয় মাস পর কেলির একাগ্রতা, ক্ষিপ্রতা ও নির্ভুলতার মাত্রা কিছুটা কমেছে। 

সম্পর্কিত সংবাদ