Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মোদির ভারত সবার কবে হবে?

দ্বিতীয় টার্মে মোদি সরকারের দুর্নাম হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। সুশাসনের নামে চমকের রাজনীতিতে ভরসা রেখেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। পরিণামে দেশবাসীর দুর্ভোগ বেড়েছিল। বারোটা বেজেছিল উন্নয়ন এবং অর্থনীতির। এমনকী বিদেশনীতিও বিবিধ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিল।

মোদির ভারত সবার কবে হবে?
  • ৩০ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দ্বিতীয় টার্মে মোদি সরকারের দুর্নাম হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। সুশাসনের নামে চমকের রাজনীতিতে ভরসা রেখেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। পরিণামে দেশবাসীর দুর্ভোগ বেড়েছিল। বারোটা বেজেছিল উন্নয়ন এবং অর্থনীতির। এমনকী বিদেশনীতিও বিবিধ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিল। অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসে, তত প্রমাদ গুনতে থাকে গেরুয়া শিবির, বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদি, কেননা নেহরুর প্রধানমন্ত্রিত্বের ইতিহাস স্পর্শ করার জন্য মরিয়া ছিলেন তিনি। কিন্তু অত্যন্ত অপ্রিয় এক সরকারকে সামনে রেখে পদ্মপার্টিকে জেতাবেন কোন জাদুতে? ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল ‘মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’, অর্থাৎ ‘মোদি ম্যাজিক’-এই জিতে ফিরবে বিজেপি। ভোটের প্রচার শুরু হতেই খোলসা হল ব্যাপারটা। বহুদলীয় গণতন্ত্রের ফায়দা গেরুয়া শিবির নেবে চূড়ান্ত মেরুকরণ ঘটিয়ে। হিন্দুভোট এককাট্টা করার কৌশলে দিকে দিকে চলল ঘৃণার ভাষণ। পাখির চোখ করা হল মুসলিম জনতা, কারণ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে তারাই সংখ্যাগুরু, দেশের শতাধিক কেন্দ্রে তারা নির্ণায়ক শক্তি। তার মধ্যে কাশ্মীর, বাংলা, অসম, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। শুধু নির্বাচনী প্রচার মঞ্চ নয়, একাধিক ধর্মসভা থেকেও লাগাতার ঘৃণার ভাষণ চলে। চব্বিশের এপ্রিলে রাজস্থানে এক নির্বাচনী ভাষণ থেকে মোদি হঠাৎই বলে বসেন, ‘কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে মা-বোনেদের গয়নাগাঁটি অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে বিলিয়ে দেবে, ছাড় পাবে না মঙ্গলসূত্রটাও!’ স্বভাবতই প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সংকীর্ণ রাজনীতির অভিযোগ ওঠে, ‘ভোটে জিততে প্ল্যানমাফিক মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন মোদি।’ তাতে অবশ্য তাঁকে থামানো যায়নি। পরবর্তী একাধিক সভাতেও তাঁকে অবিকল ভূমিকায় পাওয়া গিয়েছিল। বস্তুত তাঁদের পরিকল্পনা কতটা সফল হয়েছিল তার প্রমাণ মিলেছিল প্রধানমন্ত্রীর কুরসিতে মোদির হ্যাটট্রিক থেকে। জিতেও সংযত নয় তাঁর জমানা, পরবর্তী দিনগুলিতে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বহর বেড়েছে।  গত একবছরের পরিসংখ্যান অন্তত সেই সাক্ষ্যই দেয়। মুসলিম নাগরিকদের উপর সর্বাধিক অত্যাচার চলেছে যোগীরাজ্যে। এই প্রশ্নে ২ ও ৩ নম্বরে রয়েছে যথাক্রমে মহারাষ্ট্র ও মধ্যপ্রদেশ (দুটিই বিজেপি-শাসিত)। মোদির তৃতীয় জমানায় দলিত হিন্দু, আদিবাসী, খ্রিস্টান এবং অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাও ভালো নেই।

Advertisement

২০২৪ সালের ৭ জুন থেকে এবছরের ৭ জুন পর্যন্ত সারা দেশে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক অপরাধের ঘটনা নিয়ে সমীক্ষা করেছে অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস (এপিসিআর) নামে একটি বেসরকারি সংস্থা। ‘হেট ক্রাইম রিপোর্ট: ম্যাপিং ফার্স্ট ইয়ার অব মোদি’জ থার্ড গভর্নমেন্ট’ নামে ওই রিপোর্ট বলছে, মোদি তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর গত একবছরে এমন ঘটনা ঘটেছে ৯৪৭টি। তার মধ্যে ৩৪৫টি রয়েছে বিদ্বেষমূলক ভাষণ সংক্রান্ত। বাকি ক্ষেত্রগুলিতে সরাসরি অত্যাচারের শিকার সংখ্যালঘু মানুষজন। প্রাণ গিয়েছে ২৫ জনের—প্রত্যেকেই মুসলিম। ঘৃণার ভাষণগুলির ১৭৮টি ক্ষেত্রে নানা স্তরের বিজেপি নেতাদের নাম জড়িয়ে রয়েছে। পাঁচটি ক্ষেত্রে অভিযোগের তির স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। এই প্রশ্নে বেশ এগিয়ে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীরাও। তাঁরা সংখ্যালঘু শ্রেণির নাগরিকদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন অন্তত ৬৩ বার। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা তো সরাসরি ঘোষণা করেছেন, ‘আমি মুসলিমদের বিপক্ষেই থাকব।’ ৭১টি ঘটনায় অভিযুক্ত নেতারা জিতেছেন বিজেপির প্রতীকে। আরও দুর্ভাগ্যের বিষয় হল—তালিকায় আছেন একজন রাজ্যপাল, এমনকী দু’জন বিচারপতিও! এপিসিআর-এর ওই রিপোর্ট আরও বলছে, গত অক্টোবর থেকে পঁ঩চিশের এপ্রিল পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের মাত্রা ছিল সর্বাধিক। শুধু অক্টোবরে সংঘটিত ঘটনার সংখ্যা ৮০। কিন্তু ওই সময়েই কেন? কারণ, সারা দেশে উত্সবের মরশুম। গত সেপ্টেম্বরে গণেশ চতুর্থীর সময় মধ্যপ্রদেশের পান্নায় মুসলিমদের বাড়ি ভাঙচুর করেছিল একাধিক উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। একই ঘটনা ঘটেছিল মহারাষ্ট্রের থানেতেও। ইউপির বাঘপতে হোলির অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার ফতোয়া অগ্রাহ্য করায় এক মুসলিম ব্যক্তি হামলার শিকার হন। 
গত একবছরে ৬০২টি অপরাধের ক্ষেত্রে এফআইআর দায়ের হয়েছে মাত্র ১৩ শতাংশ। অভিযোগ উঠেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থাগ্রহণের বদলে অভিযুক্তদেরই পাশে দাঁড়িয়েছিল পুলিস! এইসব দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা কোন রাজ্যে এবং কোন বছর বেশি বা কম হয়েছে সেই পরিসংখ্যান তুলে ধরে অ্যাকাডেমিক কিংবা রাজনৈতিক বিতর্ক চলতে পারে। কোনও কোনও রাজনৈতিক দল তুলনামূলক স্বস্তিও খুঁজতে পারে তাতে। কিন্তু ওসবে দেশবাসী নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ বোধ করবে না, কিংবা দেশের মুখ উজ্জ্বল হবে না কোনোভাবেই। বিশেষ করে বহির্ভারতে মুখ পুড়বে নরেন্দ্র মোদিরই। কেননা, আজকের ভারতকে সবাই ‘মোদির ভারত’ হিসেবেই জানে। তাই এই রিপোর্ট অগ্রাহ্য করা নয়, প্রধানমন্ত্রীর উচিত অবিলম্বে প্রশাসনিক পদক্ষেপ করা। ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ স্লোগানটি আন্তরিক হলে ভারত রাষ্ট্র সবার জন্য বাসযোগ্য করে তোলার দায়িত্ব তাঁকেই নিতে হবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ