Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সিবিআই তাহলে করলটা কী?

সিবিআই তাহলে করলটা কী?
  • ১২ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: চাকরিহারাদের মধ্যে যোগ্য-অযোগ্য বাছাই কি আদৌ সম্ভব? রাজ্য সরকারের আবেদনে সুপ্রিম কোর্ট কি চাকরি ফেরাবে? ‘কারও চাকরি যাবে না’ মুখ্যমন্ত্রীর এই আশ্বাসের পর অপেক্ষা না করে রাজনৈতিক দলের ধাঁচে শিক্ষকদের আন্দোলন কি খুব জরুরি ছিল? এ-সবই এখন রাজ্য রাজনীতির চর্চার অন্যতম বিষয়। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এক ধাক্কায় ২৬ হাজার চাকরি চলে গিয়েছে। তার দায় স্কুল সার্ভিস কমিশনের, রাজ্য সরকারের, নাকি  চাকরি খাওয়ার জন্য যাঁরা জীবনপণ করেছিলেন, তাঁদের? এনিয়ে চাপানউতোর চলছে। চলবেও। কিন্তু প্রশ্নটা হল, সিবিআই তাহলে করলটা কী? ‘কাঁকর’ বাছার জন্য আদালত তো তাদের উপরেই ভরসা রেখেছিল। তারা কি কাঁকর বাছতে পারল না, নাকি তাদেরও টার্গেট ২০২৬! এনিয়ে বিতর্ক আছে। তবে রাজনীতির কারবারিরা পড়েছে কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখে। ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থ নাকি এতগুলি পরিবারের অন্ন, তাদের কাছে প্রাধান্য পাবে কোনটা?

Advertisement

দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে ২৬ হাজার পরিবারের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। শুধু তাঁরাই নন, চাকরির দাবিতে যাঁরা খোলা আকাশের নীচে মাসের পর মাস কাটিয়েছেন, তাঁরাও আশাহত। এমন একটা পরিণতির জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না। বিচারপতির আসনে বসে ‘ঢাকি সহ বিসর্জনে’র হুঙ্কার দিয়েছিলেন অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। তখন অনেকেই তা কথার কথা ভেবেছিলেন। কারণ ভারতীয় আইনের একটি কথা তাঁদের জানা ছিল, ‘একজন নির্দোষও যেন শাস্তি না পায়।’
লড়াই শেষে সাফল্য এলে আত্মশ্লাঘা অনুভব করাটাই রীতি। বিশেষ করে রাজনীতির কারবারিরা অন্যের ঝোল নিজের পাতে টানায় ওস্তাদ। মিশন সফল হলেই ‘আমি করেছি’, ‘আমাদের জন্যই হয়েছে’, এই জাতীয় কথা বলে বাজার গরম 
করেন। কিন্তু ২৬ হাজার চাকরি খারিজের ‘কৃতিত্ব’ কেউই নিতে চাইছেন না। অন্যকে দিতে চাইছেন। হঠাৎ করেই কেমন যেন সবাই ‘উদার’ হয়ে গেলেন! তবে গোটা দেশের মানুষ জানে, প্যানেল বাতিলের জন্য জীবনপণ করে লড়ে গিয়েছেন সিপিএম নেতা তথা বিশিষ্ট আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। গোটা প্যানেল বাতিলের দাবিতে তিনি অনড় ছিলেন। হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট, সর্বত্র এই দাবিতেই সওয়াল করেছিলেন। আইনজীবী হিসেবে তিনি সফল। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, তিনি বা তাঁর দল কেউই এই ‘কৃতিত্ব’ নিতে চাইছে না।
চাকরিহারারা ‘ঢাকি সহ বিসর্জনে’র বিষয়টি কল্পনা করতে পারেননি। সিপিএম কি পেরেছিল? সেই কারণেই কি তারা আগাম এসএফআইকে নামিয়ে মেরামতের কাজ শুরু করে দিয়েছিল? সুপ্রিম কোর্টে পুরো প্যানেল বাতিলের পক্ষে বিকাশবাবুর জোরদার সওয়ালের বিষয়টি সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে হইচই পড়েছিল। তাতেই আলিমুদ্দিনের ম্যানেজাররা প্রমাদ গুনেছিলেন। বুঝেছিলেন, পেটে লাথি পড়লে কেউই ছেড়ে কথা বলবে না। তাই এসএফআইকে দিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করিয়ে চাকরি খাওয়ার দায় ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, খুনি কি কাউকে দিয়ে ‘আমার খুনের জন্য কেউ দায়ী নয়’ লিখিয়ে তাকে খুন করলে ছাড় পায়?
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর যিনি অতিসক্রিয় হয়ে উঠেছেন, তিনি আর কেউ নন অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। এই ইস্যুতে তিনি বিজেপির সকলকে পিছনে ফেলে দিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে এগিয়ে চলেছেন। মুখ্যমন্ত্রীকে ‘দিদি’ সম্বোধন করে চাকরিহারাদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার ফর্মুলা দিয়েছেন। প্রয়োজনে নবান্নে যেতেও প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। তাঁর এই ‘উদারতা’য় অনেকেই বেশ গদগদ। টিভি চ্যানেলে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর হয়ে ঢাক পেটানো শুরু হয়েছে।
আক্ষরিক অর্থেই চাকরিহারাদের দিশেহারা অবস্থা। কোথায় গেলে, কাকে বললে তাঁরা সুবিচার পাবেন, সেটা ভেবে পাচ্ছেন না। তাই খড়কুটো যা 
পাচ্ছেন তাকেই আঁকড়ে ধরছেন। অভিজিৎবাবুর সঙ্গেও অনেকে দেখা করছেন। সেই সুযোগে তিনি লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। চাকরি যাওয়ার জন্য রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগছেন। কিন্তু অভিজিৎবাবু নিজে জানেন, ঠাকুরঘরের ‘কলা’টা আসলে কে খেয়েছেন?
এই মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। কী সেই ভিডিও? গত লোকসভা নির্বাচনের আগে এক সভায় বিজেপি প্রার্থী 
হিসেবে অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় বক্তব্য রাখছেন। সেখানে তাঁকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘যাঁরা অযোগ্য তাঁদের চাকরি আমি খেয়েছিলাম। আপাতত তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের সামান্য অর্ডারে বেঁচে আছেন। 
আশা করছি, খুব শীঘ্রই তাঁরা মারা যাবেন।’ বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা বিপুল করতালি দিয়ে তাঁর ‘মহান কৃতিত্ব’কে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। তাঁর কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছে। ঢাকি সহ বিসর্জন হয়েছে। তাতে তো তাঁর উল্লসিত হওয়ারই কথা। কিন্তু তিনি ‘অশ্রু’ বিসর্জন করছেন!
২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে বিচারপতি হিসেবে অভিজিৎবাবু ‘ঢাকি সহ বিসর্জন’ অর্থাৎ পুরো প্যানেল বাতিলের হুমকি দিয়েছিলেন। তাহলে এখন উল্টো কথা বলছেন কেন? কেন তিনি চাকরি ফেরানোর ব্যাপারে আগ বাড়িয়ে নানান প্রস্তাব দিচ্ছেন? সেটা কি বিচারপতি থেকে সাংসদ হওয়ার জন্য, নাকি চাকরি ছাঁটাইয়ের ক্ষোভের আগুন তাঁকেও একদিন গ্রাস করবে, সেটা উপলব্ধি করছেন! ভোল বদল কি সেই কারণেই, নাকি শিক্ষামন্ত্রীর মূল্যায়নই ঠিক! সবটাই নাটক।
রায় ঘোষণার পরই সংবাদমাধ্যমের সামনে ‘দিদি’র কাছে কমিটি গড়ে যোগ্য-অযোগ্য বাছাইয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন অভিজিৎবাবু। তাতে জনপ্রতিনিধির একটা ইমেজ তৈরি হয়েছিল। ব্রাত্য বসুর মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি পাঠানোর প্রস্তাবের সম্মতিতে তা একটু একটু করে মজবুত হচ্ছিল। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে লেখা চিঠি ছিঁড়ে প্রমাণ করে দিলেন, চাকরিহারাদের জন্য তাঁর অশ্রু বিসর্জন আসলে ‘কুমিরের কান্না’। 
২৬ হাজার চাকরি বাতিলের জেরে একটা ঝড় উঠেছে। আন্দোলন, অবরোধ, বিক্ষোভ হচ্ছে। কিন্তু তা সাময়িক। বেশি দিন স্থায়ী হবে না। কারণ চাকরিহারাও ধীরে ধীরে বুঝবেন, আন্দোলন করে ‘সুপ্রিম সিদ্ধান্ত’ বদলানো যাবে না। আন্দোলনের জেরে হয়তো রাজনীতির জল ঘোলা হবে, কিন্তু সমস্যার সমাধান হবে না। রাজ্য সরকারের এবং মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা অসম্ভব। চাকরিহারারাও বুঝবেন, কাদের জন্য পুরো প্যানেল বাতিল হয়েছে? হাজার হাজার যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকাকে পথে বসানোর নাটের গুরু কারা। 
স্কুল সার্ভিস কমিশন যোগ্য-অযোগ্য বাছাইয়ে অবশ্যই ব্যর্থ। তারা অনেক গড়িমসি করেছে। বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে। সেই কারণেই তো আদালত সিবিআইয়ের হাতে তদন্তভার দিয়েছিল। বিভিন্ন সময় বিজেপি নেতারা দাবি করেছিলেন, ‘সিবিআই সমস্ত তথ্য জোগাড় করে ফেলেছে। কেউ রেহাই পাবে না।’ 
সিবিআই অবশ্যই দক্ষ। তাদের নেটওয়ার্কও যথেষ্ট ভালো। তারা তদন্ত করে অযোগ্যদের চিহ্নিত করেছে। গত বছর মে মাসে এও দাবি করা হয়েছিল, কাকে কত নম্বর বাড়াতে হবে সেই তথ্য সিবিআই জোগাড় করে ফেলেছে। এসএসসি থেকে নায়সায় পাঠানো অযোগ্যদের নামের তালিকাও তারা পেয়েছে। সেই দাবি সত্যি হলে যোগ্যদের চিহ্নিত করতে সিবিআইয়ের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সেটা হল না কেন? বলা ভালো, করল না কেন?
আইনজীবীরা মনে করছেন, সিবিআইয়ের সদিচ্ছা থাকলে এই বিপর্যয় এড়ানো যেত। পরিসংখ্যান দিয়ে আদালতে বলতে পারত, তদন্ত করে ‘অযোগ্য’ চিহ্নিত করা গিয়েছে। এঁরা অর্থের ও প্রভাবের জোরে চাকরি পেয়েছেন। তাই এঁদের চাকরি খারিজ করা হোক। কেউ নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারলে চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া হবে। বাকিরা যোগ্য। তাঁদের চাকরিতে বহাল রাখা হোক। তার মধ্যেও অযোগ্য আছে কি না, তা দেখার জন্য আরও তদন্ত করা যেতে পারে। সিবিআইয়ের আইনজীবী আদালতে তথ্য প্রমাণ দাখিল করে এই আর্জি জানালে এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়ানো যেত। কিন্তু সিবিআই সে রাস্তায় হাঁটেনি। 
তাই প্রশ্ন উঠছে, নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে সিবিআই মাসের পর মাস কী তদন্ত করল? তারা কি সত্যিই যোগ্য-অযোগ্য বাছাই করতে পারল না, নাকি ছাব্বিশের আগে পরিকল্পিতভাবে ফের বাংলাকে ঘেঁটে দিল?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ