Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ধোঁয়াশা কবে কাটবে?

ধোঁয়াশা কবে কাটবে?
  • ৬ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হাহাকার। এই একটা শব্দই এখন চৈত্রের আকাশ ভারী করে তুলেছে। প্রায় ৭২ ঘণ্টা আগে, বৃহস্পতিবারের বারবেলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ে রাজ্যের প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর চাকরি চলে গিয়েছে। রাতারাতি বেকার এই বঞ্চিতদের সঙ্গে গোটা সমাজের বুকেও যেন আচমকা অন্ধকার নেমে এসেছে। কী হবে এই চাকরিহারাদের ভবিষ্যৎ? শিক্ষকের অভাবে কীভাবে চলবে স্কুলগুলি বা এর ফলে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার খাতা দেখায় কোনও প্রভাব পড়বে কি না— তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ঘোর অনিশ্চয়তা। এই অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার পথ কী, চাকরিহারারা কবে, কীভাবে আবার স্বাভাবিক কর্মক্ষেত্রে ফিরতে পারবেন অথবা আদৌ পারবেন কি না, স্কুলগুলিতে কত দিনে শূন্যপদ পূরণ হবে, তা রায় ঘোষণার তিন দিন পরেও নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না কেউই। সর্বোচ্চ আদালত নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করতে বললেও কতদিনের মধ্যে সম্পূর্ণ করতে হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। এই শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের নিয়োগকর্তা স্কুল সার্ভিস কমিশন বা এসএসসি দাবি করেছে, ২০১৬ সালে (যে প্যানেল বাতিল হয়েছে) পরীক্ষায় বসেছিলেন ২২ লক্ষ। এই বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থী ফের আবেদন করলে তাদের পরীক্ষার ব্যবস্থা করে যোগ্যদের নিয়োগপত্র দিতে সময়ের প্রয়োজন। তবে জানা গিয়েছে সরকারি তরফে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার কাজ করার চেষ্টা চলছে। প্রশ্ন উঠেছে, সুপ্রিম কোর্ট ২০১৬ সালের গোটা প্যানেল বাতিল ঘোষণা করলেও এসএসসি নিয়োগপত্র না ফেরানো পর্যন্ত ‘যোগ্য’ বঞ্চিতরা কি স্কুলে যেতে পারবেন? তাঁরা কি বেতন পাবেন? এমন নানা প্রশ্নে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে— তার উত্তর জানা নেই চাকরিহারাদের। ফলে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সঙ্গে অনেক প্রশ্নের উত্তরও অজানা থেকে যাচ্ছে। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে ক্ষোভ-ক্রোধের পাশাপাশি হতাশায় আত্মহত্যার চেষ্টা করার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনার খবরও আসতে শুরু করেছে। 

Advertisement

প্যানেল বাতিলের রায় ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়াই কলুষিত। তাই প্যানেলের ২৫ হাজার ৭৫২ জনের চাকরিই বাতিল করা হচ্ছে। সর্বোচ্চ আদালত এও বলেছে, যাঁদের বিরুদ্ধে এসএসসি ও সিবিআই বেআইনিভাবে চাকরি পাওয়ার অভিযোগ তুলেছে সেই ‘টেন্টেড’-দের চাকরি বাতিল ছাড়াও বেতন ফেরত দিতে হবে। এসএসসি আদালতে জানিয়েছে, এই ‘টেন্টেড’ শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর সংখ্যা ৬ হাজার ২৭৬। অর্থাৎ এরা ‘অযোগ্য’। এই ‘অযোগ্য’দের নিয়ে কারও তেমন মাথাব্যথা নেই। কিন্তু যোগ্যরা? কী তাঁদের অপরাধ? সুপ্রিম কোর্ট গোটা প্যানেল খারিজ করে দেওয়ায় চাকরিপ্রার্থীদের একাংশ ছাড়াও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, এসএসসি যখন অযোগ্যদের তালিকা আদালতে জমা দিয়েছে এবং সেই তালিকায় থাকা শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের বেতন ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাহলে ধরে নিতে হবে বাকি প্রায় ১৯ হাজার চাকরিহারা যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পেয়েছেন। তাহলে তাঁদের কেন অযোগ্যদের সঙ্গে এক বন্ধনীতে রেখে চাকরি হারাতে হল? আদালত অবশ্য বলেছে, নিয়োগে অনিয়ম থাকা সত্ত্বেও এসএসসি তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে যোগ্য-অযোগ্য চিহ্নিত করার কাজ কঠিন করে তুলেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির অভিঘাত সত্যিই চাকরিহারাদের পক্ষে সামলানো কঠিন। এতদিন তো আমরা প্রায় সকলেই শুনে এসেছি, একজন নিরপরাধ যেন শাস্তি না পায়। আসলে পরিস্থিতির ‘বলি’ হতে হল যোগ্যদের! এতদিন যাঁরা দায়িত্ব সহকারে ছাত্র পড়িয়েছেন, পরীক্ষা নিয়েছেন এখন এক লহমায় সেই চাকরিহারা ‘যোগ্যদের’ ফের পরীক্ষায় বসতে হবে। হঠাৎ করে পরীক্ষায় বসাটাও সত্যিই কঠিন। ভাগ্যের পরিহাসে তাঁরা এখন ‘বেকার’। সঙ্গতকারণেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন অনেকে। প্রশ্ন উঠছে, যোগ্য হওয়াটাই কি অপরাধের? শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ তাঁদের সমব্যথী হলেও দুর্ভাগ্যের যে, রাজনীতির কারবারিরা ঘৃণ্য রাজনৈতিক খেলায় মেতে উঠেছেন! চাকরি বাতিলের ঘটনায় শিক্ষাক্ষেত্রে যে সঙ্কট নেমে এসেছে তা কাটবে কবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। ধৈর্য ধরা ছাড়া উপায়ও নেই। যোগ্যরা ন্যায় বিচারের প্রত্যাশী।
প্রশ্ন হল, স্বশাসিত সংস্থা এসএসসির সীমাহীন ব্যর্থতা ও অপদার্থতায় রাজ্যে এক জটিল অধ্যায় তৈরি হলেও এখন পরিস্থিতি সামাল দিতে উদ্যোগ নিতে হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তিনি রায় মেনে নিয়ে বলেছেন, মানবিকতার কারণে এই সিদ্ধান্ত নিতে কষ্ট হচ্ছে। অতীতে অনেক মুশকিল আসানের জাদুকর মুখ্যমন্ত্রী চাকরিহারা ও তাঁদের পরিবারকে ধৈর্য বজায় রেখে তাঁর উপর আস্থা রাখতে বলেছেন। আশার কথা, যোগ্য বঞ্চিতদের পাশে থাকার বার্তা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, এখন স্কুল কলেজে আরও এক লক্ষ শূন্যপদ পূরণের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এখানেই হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না তিনি। বরং পুরো বিষয়টি এসএসসির উপর ছেড়ে না দিয়ে তিনি নিজে পাশে থাকার বার্তা দিতে কাল সোমবার চাকরিহারাদের সঙ্গে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে এক সভায় মিলিত হবেন। ফলে এই হাহাকার, অন্ধকারে এখন আলোর দিশা একটাই, মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই কিছু একটা ব্যবস্থা করবেন। আশা করা যায়, আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন চাকরিহারারা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ