Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আশার আলো

আশার আলো
  • ২৬ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০৫
Prefer us on Google

দেশের প্রধান বিচারপতি বি আর গাভাই কি নরেন্দ্র মোদির সরকারকে কোনও বার্তা দিলেন? গত ২০ আগস্ট সংসদে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পেশ করা সংবিধান সংশোধনীসহ তিনটি বিলের মূল বিষয় ছিল, কোনও গুরুতর অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্র-রাজ্যের কোনও মন্ত্রী গ্রেপ্তার হয়ে টানা ৩০ দিন জেলে থাকলেই তাঁর মন্ত্রিত্ব চলে যাবে। অর্থাৎ, এই বিল আইনে রূপান্তরিত হলে বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই মন্ত্রিত্ব খোয়াবেন একজন জনপ্রতিনিধি। এই বিল সংসদে পেশ হতেই বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের সব রাজনৈতিক দল একযোগে অভিযোগ তোলে, বিচার বিভাগকে এড়িয়ে কোনও নির্বাচিত সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা হাতে নিতে চাইছে মোদি সরকার। এই কাজ সংবিধান, আইন, বিচার পদ্ধতি, গণতন্ত্র ও যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিপন্থী। ‘বিচারকের’ আসনে প্রশাসনের এই ভূমিকায় থাকার অভিপ্রায়ের মধ্যে আইনজ্ঞদের একটা বড় অংশ সিঁদুরে মেঘ দেখেছিলেন। এই প্রেক্ষিতে রবিবার এক অনুষ্ঠানে নাম না করে মোদি-শাহদের স্পষ্ট বার্তা দিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি গাভাই। তাঁর কথায়, আইন প্রণেতা, প্রশাসক ও বিচার ব্যবস্থা— এই তিনটিকে সংবিধান সুন্দরভাবে ভাগ করে দিয়েছে। বলে দিয়েছে, কার কী দায়িত্ব। তারপরও যদি প্রশাসন বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তাহলে তা দায়িত্ব ও ক্ষমতা বিভাজনের সংবিধান-সূত্রে আঘাত হানা হয়। এককথায়, মোদিদের এই বিল যে অসাংবিধানিক, প্রধান বিচারপতির ভাষ্যে সম্ভবত সেটাই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমন স্পষ্ট বার্তা পেয়ে দেশের শাসকগোষ্ঠী হাত গুটিয়ে নেবে, সেটা মোদি সরকারের কাছে আশা করা হয়তো ঠিক হবে না। কিন্তু এই বিলটি শাসক দল সংসদের উভয়কক্ষে পাস করাতে আদৌ পারবে কি না, সেটাও লাখ টাকার প্রশ্ন। তর্কের খাতিরে তা সম্ভব হলেও শেষ পর্যন্ত আদালতে  গেলে পরিণতি কী হতে পারে— তার অন্তত একটা আভাস পাওয়া গেল প্রধান বিচারপতির মন্তব্যে। আপাতত এটাই আশার কথা। প্রধান বিচারপতির এই অবস্থানে বিজেপি বিরোধীরা নিঃসন্দেহে অক্সিজেন পেল।

Advertisement

সংশ্লিষ্ট বিল ইস্যুতে মন্ত্রীদের ‘চাকরি’ নিয়ে টানাটানি করতে গিয়ে নিজেদের নৈতিকতার প্রমাণ দিতে জেলবন্দি সরকারি কর্মীদের চাকরির প্রসঙ্গ টেনেছেন প্রধানমন্ত্রী। গত সপ্তাহে বঙ্গসফরে এসে তিনি দাবি করেছেন, ‘যদি কোনও সরকারি কর্মচারী ৫০ ঘণ্টা জেলে থাকেন, তিনি ‘সাসপেন্ড’ হয়ে যান। তা তিনি গাড়ির চালক হোন, কেরানি হোন বা পিয়ন।’ তাঁর প্রশ্ন, তাহলে কেন জেলবন্দি  একজন মন্ত্রীর ‘চাকরি’ যাবে না? আইনজ্ঞদের একাংশ বলছেন, ৫০ ঘণ্টা জেলে থাকলে সরকারি কর্মীর চাকরি যাওয়ার কোনও বিধান ভারতীয় আইনে নেই। এদেশে গুরুতর অভিযোগে কোনও সরকারি কর্মী গ্রেপ্তার বা আটক হলে তাঁকে ‘সাসপেন্ড’ করে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে অভিযুক্ত কর্মী দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর চাকরি চলে যেতে পারে। মন্ত্রিত্বের ক্ষেত্রে বিচারের আগে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতেই ‘চাকরি’ খেতে চাইছে তাঁর সরকার, যা একটা দানবীয় পদক্ষেপ।
ইতিহাস বলছে, ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিচার বিভাগকে কব্জা করতে চাইছে মোদি সরকার। শুরু হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতি নিয়োগে ‘কলেজিয়াম’ ব্যবস্থাকে নিজেদের তাঁবে আনার চেষ্টার মধ্য দিয়ে। সেই বিতর্কের মধ্যেই ‘সম্প্রতি রাজ্যপালের অফিসে বিল আটকে রাখার অভিযোগ নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের সঙ্গে সরকার তুমুল বিতর্কে জড়িয়েছে। বর্তমান প্রধান বিচারপতি রবিবার নিজেই এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট আইন না মেনেই বিভিন্ন রাজ্যে অভিযোগের ভিত্তিতেই ‘বুলডোজার’ দিয়ে বাড়ি-ঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। গাভাই বলেন, মনে রাখতে হবে ওই বাড়িতে অভিযুক্ত ছাড়াও তাঁর পরিবারের সদস্যরা থাকেন, যাঁরা নির্দোষ। তাছাড়া একজন দোষী ব্যক্তিরও আইনের শাসন প্রাপ্য। প্রসঙ্গত বলা যায়, মোদি জমানায় এমন বহু ঘটনায় বারবার প্রমাণিত হচ্ছে যে, সংবিধান, আইন, বিচার—কোনও ব্যবস্থাই মানতে ‘নারাজ’ শাসক। তাই কখনও সরাসরি, কখনও ঘুরপথে আঘাত নামিয়ে আনা হচ্ছে। স্রেফ অভিযোগের ভিত্তিতে মন্ত্রিত্ব কেড়ে নেওয়ার বিলও সেই অপচেষ্টার নবতম সংযোজন। আশার কথা হল, প্রধান বিচারপতির স্পষ্ট বার্তাটি— ‘দেশের সংবিধান অপরাধীকেও বলার সুযোগ দেয়। ফলে প্রশাসন বিচারকের ভূমিকা নিতে পারে না।’ মন্ত্রী অপসারণ বিলের আবহে প্রধান বিচারপতির এই বার্তা তাই বিরোধীদের সম্মিলিত প্রতিরোধে বাড়তি শক্তি জোগাল। মোদি সরকার যে বারবার সংবিধানের উপর আঘাত আনার চেষ্টা করছে—বিরোধীদের সেই অভিযোগও যেন মান্যতা পেল।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ