গত বছর নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ইস্তক, চাঁচাছোলা ভাষায় ইসলামীয় কট্টরপন্থা, মৌলবাদী চিন্তাভাবনা এবং সন্ত্রাসবাদের কড়া সমালোচনা করে এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এগুলির সব ক’টি পাকিস্তানের গায়ে গিয়ে বিঁধেছে। তা সত্ত্বেও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে নয়াদিল্লির চাবুকের ঘা পড়তেই সরব হন সেই মার্কিন প্রেসিডেন্টই। একসময় মনে হয়েছে, ট্রাম্প যেন ভারতের স্বঘোষিত সুপার প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন! নেপথ্যে পরমাণু যুদ্ধের আতঙ্ক, না কি ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি?
এর অন্যতম কারণ হিসেবে বাণিজ্যকেই তুলে ধরেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। চলতি বছরের ১৩ মে সৌদি আরবের মাটিতে পা রাখেন ট্রাম্প। দ্বিতীয় বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এটাই তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। ট্রাম্পের এবারের পশ্চিম এশিয়া সফরের লক্ষ্য ১ লক্ষ কোটি ডলারের বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। তাই আরবের মাটিতে পা রাখার আগে অধিকাংশ ইসলামীয় দেশের সমর্থন ছিল তাঁর প্রথম লক্ষ্য। বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, ভারত-পাক ‘যুদ্ধ’ চলতে থাকলে ট্রাম্পের পক্ষে আরব দুনিয়ার বিশ্বাস অর্জন করা কঠিন হতো। কারণ, এত দিনে তাঁর ইসলাম-বিরোধী ছবি উপসাগরীয় দেশগুলিতে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। আরব মুলুকে যাওয়ার আগে সেটা মুছে ফেলার প্রয়োজন ছিল। সেই কারণে লড়াই থামিয়ে ‘সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর’ পাকিস্তানের রক্ষাকর্তা হিসাবে নিজেকে তুলে ধরেছেন তিনি। বিনিময়ে, রিয়াধ থেকে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ আদায় করতে ভোলেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্পের সৌদি সফরে ওয়াশিংটন ও রিয়াধের মধ্যে ১৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারের প্রতিরক্ষাচুক্তি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আকাশ-যুদ্ধের একাধিক সরঞ্জাম, বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, মহাকাশে শক্তি অর্জন এবং নৌশক্তি বৃদ্ধি। বিশ্লেষকদের দাবি, এর ফলে এক ডজন মার্কিন প্রতিরক্ষা সংস্থা ব্যাপকভাবে লাভবান হবে। এআই-এর হাত ধরে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক দৃঢ় হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল তৈরির জন্য ‘ডেটা সেন্টার’ নির্মাণে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আমেরিকা। কাতার থেকে পেয়েছেন, ৪০ কোটি ডলারের (প্রায় ৩৪২০ কোটি টাকা) বোয়িং ৭৪৭-৮ উপহার। হোয়াইট হাউসের তথ্য উদ্ধৃত করে আল জাজিরা জানিয়েছে, ৯৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ২১০টি বিমান কিনবে কাতার। শুনলে অবাক হবেন, তুরস্কের কাছেও ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আমেরিকা। অস্ত্রের মূল্য সব মিলিয়ে প্রায় ৩০৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ২৬০০ কোটি টাকার সমান। অথচ, ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে সাহায্য করেছে তুরস্ক। চার দিনের সংঘাতে ভারতের নানা সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে যে সব ড্রোন উড়ে এসেছে, তার অধিকাংশই তুরস্কের!
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ১০ মে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই নিজের সমাজমাধ্যম সংস্থা ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এই বিষয়ে পোস্ট করেছিলেন ট্রাম্প। ঠিক তার পরের দিন হোয়াইট হাউসের বক্তৃতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, ‘আমরা সংঘাত বন্ধ করতে বলেছিলাম। সেটা না হলে আমরা কোনও বাণিজ্য করব না। ভারত-পাক যুদ্ধ বন্ধ করার নেপথ্যে অন্যতম বড় কারণ হল ব্যবসা।’ তাহলে কি বন্ধুর চেয়ে ব্যবসা বড়? আর এই কারণেই ভারত-পাক সংঘাতে আগ বাড়িয়ে আমেরিকার হস্তক্ষেপ। এই প্রশ্নে দুনিয়া দেখছে বিশ্বগুরুর মেরুদণ্ডহীন নীরবতা। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, মোদি কি ভারতের দায় দায়িত্ব ট্রাম্পের হাতে সঁপে দিয়েছেন? দেশটা কি শেষে ট্রাম্পের মরজিমাফিক চলবে? জবাব চায় দেশবাসী। ট্রাম্পের অযাচিত হস্তক্ষেপের ফলে পরবর্তী কালে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের কূটনৈতিক গুরুত্ব হ্রাসের সঙ্কেতও দৃশ্যমান। ফলে আমেরিকার সঙ্গে সন্ধিবন্ধনে আবদ্ধ হয়েও সেই আমেরিকারই কারণে ভারত এখন এক কঠিন সঙ্কটের মুখোমুখি। দিল্লির মনে রাখা উচিত, নীতি তৈরির সময় স্বার্থের দিকে মনোযোগ দেওয়ার অর্থ নীতি থেকে আত্মপ্রত্যয়টাকে ছেঁটে বাদ দেওয়া নয়! সে ক্ষেত্রে যেটা পড়ে থাকে, তাকে তখন আর বাস্তববাদ বলা যায় না, বলতে হয় নিছক সুবিধাবাদ। আর, যে বন্ধুতায় সমালোচনার একটি বাক্যেরও জায়গা থাকে না, সেটাকেও আর বন্ধুতা বলা যায় না। বলতে হয়, মোসাহেবি!