রোজকার খাদ্যতালিকায় বাদাম রাখা আদৌ জরুরি কি না তা ঠিক করুন শরীর বুঝে। পরামর্শ দিলেন ডায়াটিশিয়ান।
রোজকার খাদ্যতালিকায় বাদাম রাখা আদৌ জরুরি কি না তা ঠিক করুন শরীর বুঝে। পরামর্শ দিলেন ডায়াটিশিয়ান।
যাঁরা স্বাস্থ্য সচেতন তাঁরা তো বটেই, এমনকী সাধারণ মানুষও আজকাল অনেকাংশেই খাদ্য তালিকায় ড্রাই ফ্রুটস, বিশেষ করে বাদাম রাখছেন। পুষ্টি, এনার্জি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় এই ধরনের খাবার থেকে। ফলে আমন্ড, আখরোট, কাজু, পেস্তা, খোবানি, আঞ্জির জাতীয় খাবার আমাদের খাদ্যতালিকাকে সমৃদ্ধ করে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সব বয়সের সকলেই কি এই ধরনের খাবার খেতে পারেন? এর ফলে হজমশক্তির কোনও সমস্যা দেখা দেয় কি? হজমের সমস্যা থাকলে এই ধরনের খাবার কি খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত? নাকি তা পুরোপুরি বাদ দেবেন? এমন বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিলেন পিয়ারলেস হাসপাতালের চিফ ডায়াটিশিয়ান সুদেষ্ণা মৈত্র নাগ।
বাদামের গুণ
‘আমন্ড বা আখরোটের কথা যদি বলেন তাহলে তার গুণের অন্ত নেই,’ জানালেন সুদেষ্ণা। এই বাদামগুলোয় ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি বলেই এই বাদামগুলো ব্রেনসেল তৈরি করতে এবং তা সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। ফলে বেশি বয়সে যখন টুকটাক কথা ভুলে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়, তখন খাদ্যতালিকায় রোজ দুটো করে আমন্ড বা আখরোট রাখা যেতে পারে। তবে তার বেশি রাখতে চাইলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। আর বাচ্চাদের জন্যও এই বাদাম দু’টি উপকারী। কিন্তু পাঁচ বছরের নীচে তা বাচ্চাকে দেবেন না। হজম হবে না। আর পাঁচ বছরের ঊর্ধ্বে দিলেও অবশ্যই ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে নেবেন। রোজ না খাইয়ে একদিন অন্তর খাওয়াবেন এবং দিনে একটা বা বড়জোর দুটোর বেশি কখনওই দেবেন না। তারপরেও শরীর বা পেট সামান্য খারাপ হলে বা হজমের সমস্যা দেখা দিলেই বন্ধ
করে দেবেন।
বয়স্কদের কথায় আরও একবার ফিরলেন সুদেষ্ণা। বললেন, ‘যাঁদের অ্যালঝাইমার্স বা ডিমেনশিয়ার মতো রোগ ধরা পড়ে তাঁদের ডাক্তাররা ওষুধের পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় আমন্ড, আখরোট জাতীয় বাদাম রাখতে বলেন। তবে সেক্ষেত্রে অবশ্যই মাত্রাটাও ডাক্তারই মেপে দেন।’
কাজু পেস্তার কথা
কাজুবাদাম ও পেস্তা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে সুদেষ্ণা বলেন, এই ধরনের বাদামে ফ্যাটের পরিমাণ খুবই বেশি। ফলে এইগুলো নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে খাওয়া যেতে পারে। কাজুবাদামে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি। ফলে এগুলো যে শরীরের ক্ষতি করবে তা নয়, কিন্তু খুবই পরিমাণ বুঝে খাওয়া উচিত।
তবে যাঁরা খেলাধুলোর সঙ্গে যুক্ত, রোজই অতিরিক্ত ক্যালোরি বার্ন করছেন, তাঁরা কিন্তু বাদাম খেতেই পারেন। তাঁদের ক্ষেত্রে মাত্রাটাও বাড়ানো যায়। সারা দিনে এক মুঠো বাদাম ভেঙে ভেঙে খেতে পারেন, তাহলে কোনও ক্ষতি নেই। আজকাল অনেকেই সেডেন্টারি লাইফস্টাইলে অভ্যস্ত। বসে বসে কাজ করেন। গায়ে খাটনির চেয়ে মস্তিষ্ক চালনার কাজ করেন বেশি, তাঁরা কিন্তু ড্রাই ফ্রুটস বা বাদাম খেলে ডাক্তার বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ মেনে খাবেন।
মন্দ দিকটাও বিচার করুন
সুদেষ্ণা বললেন, ‘ড্রাই ফ্রুটস কখনওই ক্ষতিকর নয়। কিন্তু রোজকার খাদ্য তালিকায় যদি তা রাখতে চান তাহলে অবশ্যই বুঝে শুনে রাখুন।’
আমাদের বাজারে সহজে যে ধরনের ফল পাওয়া যায়, যেমন আম, জাম, কলা, মুসাম্বি, কমলালেবু, আপেল ইত্যাদিও রোজকার খাদ্যতালিকায় অবশ্যই রাখা উচিত। এই ধরনের ফলের উপকার বহু প্রচলিত এবং পরীক্ষিত। তাছাড়া এগুলো সহজে পাওয়া যায়, তুলনায় সস্তাও। ফলে ডায়েট প্ল্যান করার সময় এগুলোকে অবশ্যই বিচারের মধ্যে রাখবেন।
কীভাবে খাবেন?
বাচ্চাদের মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য যদি তাকে বাদাম খাওয়াতে চান, তাহলে অবশ্যই দিনে দুটো করে খাওয়ান। বাচ্চা যদি খুবই রোগা হয় তাহলেও তাদের দুটো বাদাম রোজ খাওয়ানো যায়। হাই ক্যালোরি দরকার হলে তবেই দেবেন।
রাতে ভিজিয়ে রেখে খাওয়া সবচেয়ে উপকারী। তাতে হজম হতেও সুবিধে হয়। অনেকে দুধের সঙ্গে বাচ্চাকে আমন্ড খাওয়ান সেটাও উপকারী। তবে পরিমাণটা ঠিক করা ভীষণ জরুরি। বাচ্চা খুব রোগা বলে বাদাম খাওয়াতে শুরু করলেন। তারপর সেটাই অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেল এটা করবেন না। বাদাম যখনই রোজকার খাদ্য তালিকায় রাখবেন তখনই তার পরিমাণের দিকে বিশেষ খেয়াল রাখবেন।
খোবানি, আঞ্জির ইত্যাদি
শুধু বাদাম নয়, ড্রাই ফ্রুটসের তালিকায় খোবানি, আঞ্জির ইত্যাদিও পড়ে। সেগুলোও শরীরে পুষ্টির জোগান দেয়। কিন্তু ঠিক কতটা পুষ্টির জোগান দেয় সে বিষয়ে তেমন কোনও গবেষণা আজ পর্যন্ত হয়নি। তবে অবশ্যই অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা থাকলে আঞ্জির খাওয়া ভালো। পাশাপাশি খেজুরকেও তালিকাভুক্ত করুন। ডায়াবেটিস না থাকলে অ্যানিমিয়ায় এই ফল অনায়াসে খাওয়া যায়। দীর্ঘ রোগে ভুগলে অনেক সময় ডাক্তাররা খোবানি খেতে বলেন। সেক্ষেত্রে দুধে ভিজিয়ে খেলে তা খুবই উপকারী।
কয়েকটি সতর্কতা
মাসে দু’মাসে একবার বাদাম খেলে শরীরে তার কোনও প্রভাব সেভাবে পড়ে না। তাই শরীর মজবুত করতে চাইলে বাদাম নিয়ম করে খেতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে আবার বাধ সাধে পেটের সমস্যা। তবে তা যে সবসময়ই পেটখারাপ বা ডায়ারিয়াতে পরিণত হবে এমনও নয়। হজমের সমস্যা হতে পারে, পেট ভার লাগতে পারে, তার থেকে খাবারে অরুচিও হতে পারে। এমন সবক্ষেত্রেই বাদাম এড়িয়ে চলুন।
দ্বিতীয়ত, কিছু বাদামে অ্যালার্জি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এবং এই অ্যালার্জি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। ফলে বাদাম খাওয়ার আগে তা আপনার শরীর নিতে পারছে কি না জেনে নিন। প্রয়োজনে অ্যালার্জি টেস্ট করিয়ে নিন। আর বাড়াবাড়ি বুঝলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, জানালেন ডায়াটিশিয়ান।
আর ভালো থাকতে ড্রাই ফ্রুটসের পাশাপাশি রোজকার বাজারচলতি সহজলভ্য খাবারগুলোর কথাও ভুলবেন না। তাতেও পুষ্টির পরিমাণ যথেষ্ট বেশিই থাকে।
কমলিনী চক্রবর্তী