Bartaman Logo
১৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

ঐতিহ্যের পথে রোজগার

গ্রামীণ পদ্ধতিতে নকশা বড়ি তৈরি করে ক্ষমতায়নের পথে এসেছেন মুর্শিদাবাদের মেয়েরা। রপ্তানি করেন বিদেশেও।

ঐতিহ্যের পথে রোজগার
  • ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

গয়না বড়ি, মশলা বড়ি, নাড়ু, মোয়া এসবই বাংলার ঐতিহ্য। আর তাকেই অবলম্বন করে মহিলাদের স্বাবলম্বী করে তোলার কথা ভেবেছেন মুর্শিদাবাদের করঞ্জলি অঞ্চলের একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা রাখি ভট্টাচার্য। এই বিষয় নিয়েই কথা হল তাঁর সঙ্গে। বললেন, ‘আমি মেদিনীপুরের মেয়ে। ছোটবেলায় বাড়িতেই মা, ঠাকুরমা, জেঠিমাদের দেখেছি বড়ি দিতে। সেই বড়িকেই এক শিল্পের পর্যায় নিয়ে যেতেন আমাদের গ্রামের কিছু মহিলা, তৈরি হত গয়না বড়ি। এই শিল্প কিন্তু মেদিনীপুরের গৃহিণীদের হাতে তৈরি। এর জন্য বিশেষ কোনও প্রশিক্ষণও তাঁদের লাগত না। সেই কারণেই বোধহয় এর কদরও সে অর্থে করতে শিখিনি আমরা। ক্রমশ শিল্পটি অবলুপ্তির অন্ধকারে হারিয়ে যেতে থাকে।’ কিন্তু এই অবলুপ্ত শিল্পকে আবারও জনপ্রিয় করা এবং তার মাধ্যমে মহিলাদের স্বনির্ভর করার ভাবনা এল কীভাবে? রাখি বললেন, যখন তিনি মুর্শিদাবাদে স্কুলে পড়ানোর চাকরি শুরু করেন তখন দেখেছিলেন মহিলারা স্কুলের মিড ডে মিল বিক্রি করে স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের কাছেই প্রথম গয়না বড়ি বানানো ও বিক্রির প্রস্তাব রেখেছিলেন রাখি। সেই কাজ খানিক দূর এগলে রাখি ভাবলেন শুধু মিড ডে মিলের মহিলারাই বা কেন, তাঁর স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রীদের দিয়েও তো এমন কাজ করানো যায়। একটি মেয়েকে ডেকে কাজের প্রশিক্ষণ ও তার মাধ্যমে রোজগারের প্রস্তাব দেন। মেয়েটির নাম পৃথা কামার। বাড়ির অনুমতি সাপেক্ষে পৃথা রাজি হয় ও কাজ শিখে তার মাধ্যমে রোজগার শুরু করে।

Advertisement

স্বনির্ভরতা ও গ্রামীণ শিল্পের মাধ্যমে রোজগার প্রসঙ্গে পৃথা জানালেন, ‘পড়াশোনা শিখেছি সে তো আর বাড়িতে বসে থাকার জন্য নয়। ফলে চাকরি নিশ্চয়ই করতাম। সেই মারফত রোজগারও হতো। কিন্তু এই যে নিজের রাজ্যের ঐতিহ্যকে সবার সামনে তুলে ধরতে পারছি এবং তার থেকে উপার্জন করছি। এটা আমার কাছে বিরাট প্রাপ্তি। এই রোজগারের মূল্যই আলাদা।’

কাজ শিখতে কতটা সময় লেগেছিল? পৃথা জানালেন, গয়না বড়ি বিভিন্ন নকশার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। এটা অনেকটা লাইন ড্রইং-এর মতো। ফলে হাত সেট করতে খানিকটা সময় লাগে। পৃথার প্রায় সপ্তাহ খানেক লেগেছিল। প্রথম দিকে লাইনগুলো সঠিক ভাবে আঁকতে পারতেন না। বেঁকে যেত। অভ্যাস করতে করতে জিনিসটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন। তাছাড়াও ডালের যে ব্যাটার বা গোলাটা তৈরি করতে হয় এই বড়ি দেওয়ার জন্য, তারও পরিমাণ সঠিক হচ্ছিল না। ফলে কখনও ভীষণ মোটা ব্যাটার তৈরি হতো, কখনও বা তা অতিরিক্ত পাতলা হয়ে যেত। দু’ক্ষেত্রেই বড়ি দেওয়া যেত না।

রাখি এই বিষয়ে বললেন, গয়না বড়ির পাশাপাশি মশলা বড়িও গ্রামের মেয়েদের দিয়ে তৈরি করানো হয় এবং তা বিক্রি করে উপার্জন করেন মহিলারা। মশলা বড়ি দেওয়া তুলনায় অনেক সহজ বলে বেশি সংখ্যক মহিলা এই কাজে পারদর্শী হয়ে উঠছেন। এছাড়াও চিঁড়ে ও মুড়ির মোয়া, তিল, নারকেলের নাড়ু, এইসবও তাঁরা বানাচ্ছেন এবং বিক্রি করে রোজগার করছেন।

এখানেই শেষ নয়, নিজেদের এই ঐতিহ্য নিয়ে ওঁরা বিভিন্ন মেলায় অংশগ্রহণ করতে অন্যান্য রাজ্যেও যাচ্ছেন। সেখানে গিয়ে ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের কাছে নিজেদের ঐতিহ্য তুলে ধরা, সে বিষয়ে তাঁদের বোঝানো, এর মধ্যেও একটা দারুণ আনন্দ রয়েছে। নিজের সংস্কৃতি অন্যত্র ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে একটা তৃপ্তি অনুভূত হয়। সেটাও একটা বড় পাওনা, জানালেন রাখি ও পৃথা দু’জনেই।

গয়না বড়ি দেওয়ার ঐতিহ্য, যা এককালে গ্রামের মেয়েদের জীবনের অঙ্গ ছিল, তা হারিয়ে যেতে বসেছিল ক্রমশ। অবলুপ্তির পথ থেকে উদ্ধার করে তাকে একটা শিল্পের মর্যাদা দিতে পেরে এবং তার মাধ্যমে মেয়েদের রোজগেরে করতে পেরে খুবই আনন্দিত রাখি। এভাবেই গ্রাম বাংলার অন্য ঐতিহ্যগুলোও মানুষের কাজের মাধ্যমে জগতে স্বীকৃতি পাক, সেই আশাই করেন তিনি।

রোজগার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে রাখি বলেন, মোটামুটি মজুরির উপরেই দাম নির্ধারিত হয়। যেমন মশলা বড়ির ক্ষেত্রে ওজনের উপর দাম ঠিক করা হয়। ১০০ গ্রামের প্যাকেটের দাম মোটামুটি ১০০ টাকা। আর গয়না বড়ি পিস প্রতি দামে বিক্রি হয়। নকশার উপর নির্ভর করে দাম মোটামুটি ২৫ টাকা পিস থেকে শুরু।

দেশের অন্যান্য রাজ্যেই শুধু নয়, বিদেশেও আমাদের এই শিল্প জনপ্রিয় হয়ে উঠুক। ‘স্পর্শ’ নামের একটা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিজেদের এই শিল্পটিকে বিক্রি করেন রাখি, পৃথারা। ইতিমধ্যেই কানাডার বাঙালিদের মধ্যে নিজেদের শিল্পটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন তাঁরা। আলাদা প্যাকিং করে, বিদেশে পাঠানোর খরচ সহ তা পাড়ি জমাচ্ছে কানাডায়। গ্রামের মেয়েদের নিপুণ হাতের কাজের কদর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে এতেই খুশি রাখি, পৃথারা।

কমলিনী চক্রবর্তী

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ