Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কর্তব্য

কর্তব্য বলতে আমরা কি বুঝি? বাধ্যবাধকতা ও কর্তব্য, দুটি কথার মধ্যে প্রথমটি আসন্ন বন্ধন ও নির্দিষ্ট কর্মের ইঙ্গিত করে; যেমন, যে কোন ব্যক্তির পক্ষে বিধবা মাতাকে ভরণ পোষণের বাধ্যবাধকতা থাকে।

কর্তব্য
  • ৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কর্তব্য বলতে আমরা কি বুঝি? বাধ্যবাধকতা ও কর্তব্য, দুটি কথার মধ্যে প্রথমটি আসন্ন বন্ধন ও নির্দিষ্ট কর্মের ইঙ্গিত করে; যেমন, যে কোন ব্যক্তির পক্ষে বিধবা মাতাকে ভরণ পোষণের বাধ্যবাধকতা থাকে। আর কর্তব্যবোধে আসন্ন পরিস্থিতির জন্য বাধ্যবাধকতার ভাব কম, কিন্তু নীতিগত ও চরিত্রগত প্রেরণার ভাব বেশি। ইংরেজ কবি ওয়ার্ডস্‌ওয়ার্থের কথায় কর্তব্য হলো ‘ঈশ্বরের বাণীর একগুয়ে মেয়ে’। আমরা সকলেই জানি যে, ‘কর্তব্যবোধ আর স্বার্থবোধে’র দ্বন্দ্বে সময়ে সময়ে আমাদের কী ভীষণ মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে হয়। আমরা যাই বলি না কেন, আমাদের মতো জ্ঞানহীন ব্যক্তিদের কাছে, কর্তব্য বলতে যেন কিছুটা বন্ধন বা বাধ্যতা বোঝায়।

Advertisement

জ্ঞানী ব্যক্তিদের পক্ষে অন্য রকম। ঈশ্বরাবতার শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্‌গীতায় বলেছেন “আমার কোন কর্তব্য নাই, সব লোকে এমন কিছু নাই যা আমি পাই নাই, আমার প্রাপ্তব্যও কিছু নাই, তথাপি আমি কাজ করে চলেছি।” ঈশ্বরাবতার বা জ্ঞানী ব্যক্তিগণ বন্ধনহীন হয়েই কাজ করেন, তাও মানবের প্রতি প্রীতিবশতঃ। অবতারের কোন বাসনা-দ্বন্দ্ব থাকে না, কাজেই তাঁর কর্তব্যের দ্বন্দ্বও নাই। তিনি একমুখী হয়ে কাজ করেন, এবং তাহা ঈশ্বরমুখীন। অজ্ঞানের প্রভাবে আমরা কর্তব্যের প্রকৃতি ও সমাধানের উপায় সম্বন্ধে প্রায় দ্বিধাগ্রস্ত হই।
স্বামী বিবেকানন্দ কেমন নির্দিষ্টভাবে বলেছেন যে, আমাদের তথাকথিত কর্তব্যবোধ প্রায়ই ব্যাধিতে পরিণত হয়:
“আমাদের কাছে কর্তব্য একটি ব্যাধি-বিশেষ হয়ে পড়ে: ইহা সর্বদা আমাদের সামনে টেনে নিয়ে যায়। ইহা আমাদের আঁকড়ে ধরে এবং সারাটি জীবন আমাদের কষ্ট দেয়। ইহা মানবজীবনের ধ্বংসস্বরূপ। কর্তব্য—এই কর্তব্যবোধ মধ্যাহ্ন সূর্যের মতো মানবের অন্তরতম আত্মাকে যেন পুড়িয়ে মারে। কর্তব্যের ক্রীতদাস বেচারাদের দিকে তাকিয়ে দেখ। কর্তব্য তাদের প্রার্থনা করবার সময় দেয় না। স্নানের সময় দেয় না। সব সময়ে কর্তব্য তাদের উপর চেপে আছে। তারা বাহিরে যায়, কাজ করে। কর্তব্য তাদের উপর চেপে রয়েছে! তারা বাড়ি ফিরেও পরের দিনের কাজের কথা ভাবে। কর্তব্য তাদের উপর রয়েছে। এ যেন ক্রীতদাসের জীবন যাপন। অবশেষে রাস্তায় পড়ে যায় এবং ঘোড়ার মতো কাজ করতে করতে পিঠে জিনসমেত মরে। কর্তব্য বলতে যা বোঝায় তা হলো এই। একমাত্র সত্য কর্তব্য হলো নির্লিপ্ত হওয়া ও স্বাধীনভাবে কাজ করা, ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে সব কাজ সমর্পণ করা।”
আমরা কর্তব্যের ক্রীতদাস হয়ে পড়ি এবং সমস্ত জীবনকে দুঃখময় করে তুলি। আমাদের কর্তব্য কোথায় ও কি ভাবে তা পালন করতে হবে সে বিষয়ে আমাদের সম্যক বোধ অর্জন করতে হবে। আমাদের নিজ সমস্যার সমাধান করতে শেখার আগেই অপরকে সাহায্য করতে এগিয়ে যাই—ভালবাসার জন্য নয়, আত্মতুষ্টির জন্য। নিশ্চয়ই অনেক নিঃস্বার্থ লোক আছে যারা অপরকে সেবা করতে আগ্রহী।  
স্বামী যতীশ্বরানন্দের ‘ধ্যান ও আনন্দময় জীবন’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ