দীপন ঘোষাল, রানাঘাট: দুর্গোৎসব এখন আর শুধুই ‘পুজো’ নয়, আজ তা বাংলার শিল্প ও সৃজনশীলতার মহোৎসবের রূপ নিয়েছে। রাজ্য সরকারের আর্থিক সহায়তা যেন সেই উৎসবকে দিয়েছে এক নতুন রং, নতুন মাত্রা। এখন পুজো মানেই থিমের ঝলক, শিল্পের মেলবন্ধন। আর সেই প্রবণতার জেরেই লক্ষ্মীলাভ হয়েছে তাহেরপুরে। সেখানকার থার্মোকল শিল্পীরা আজ যেন অনবরত সৃজন-যজ্ঞে মগ্ন। তাঁদের হাতের কাজে সকাল-সন্ধ্যা, দিনরাত মিলেমিশে গিয়েছে। কারও হাতের ছোঁয়ায় ফুটে উঠছে দেবীর সিংহাসন। কারও হাতে জন্ম নিচ্ছে দেবদূতের ডানা। ছোট ছোট থার্মোকলের টুকরো যেন তাঁদের ছোঁয়ায় রূপকথার রঙিন ক্যানভাসে পরিণত হচ্ছে।
পুজোয় আর বাকি ঠিক তিন সপ্তাহ। তারপরেই দেবী দুর্গার আগমনে আপামর বাংলা মাতবে তার সবচেয়ে বড় উৎসবে। তাই পুজোকে কেন্দ্র করে শহর থেকে শহরতলী, গ্রাম থেকে মফস্সলে এখন সাজসাজ রব। তবে তাহেরপুরের চিত্রটা কিছুটা অন্যরকম। কারণ পুজোর মুখে এখানকার থার্মোকল শিল্পীদের ব্যস্ততা তুঙ্গে। স্বভাবতই তাঁরা ব্যাপক লক্ষ্মীলাভের আশায় রয়েছেন। রাজ্যের নানা প্রান্ত তো বটেই, সীমান্ত পেরিয়ে ভিনরাজ্য থেকেও একের পর এক অর্ডার আসছে। ব্যস্ততার জেরে শিল্পীরা যেন বিশ্রাম, নাওয়া-খাওয়া ভুলে গিয়েছেন। তাঁদের হাতে তৈরি শিল্পকর্মই এবার অজস্র পুজো মণ্ডপের শোভা বাড়াবে। হাওড়া থেকে কোচবিহার, বর্ধমান থেকে মেদিনীপুর, এমনকী ঝাড়খণ্ড-বিহার থেকেও তাহেরপুরে দেবীর সাজসজ্জার অর্ডার এসেছে। কাজের চাপে দু’মাস আগে থেকেই অর্ডার নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শিল্পী নীলকণ্ঠ বিশ্বাস বলেন, আমরা মূলত দেবীমূর্তির সাজ, মণ্ডপসজ্জা বা থিমের অঙ্গ হিসেবে থার্মোকলের বিভিন্ন কাজ করে থাকি। এই বছর বাজার সত্যিই খুব ভালো রয়েছে। সরকারি অনুদানের পরিমাণ বাড়ায় পুজোকমিটিগুলি খরচ বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। বহু জায়গা থেকে অর্ডার এসেছে। আমরা প্রায় ৩০ জন শিল্পী দিন-রাত কাজ করছি। বাইরের রাজ্যগুলি থেকে আসা অর্ডারের কাজ আগে তৈরি করা হচ্ছে। কাজের চাপের জেরে আর নতুন অর্ডার নিতে পারছি না। পরের বছর থেকে আরও বেশি সংখ্যক কর্মী নিয়ে কাজে নামব। তাহলে সামাল দিতে পারব। আরএক শিল্পী সুবোধ বিশ্বাস বলেন, পুজোকে কেন্দ্র করেই আমাদের সারা বছরের অর্থনীতি। এই বছর যে পরিমাণ বরাত এসেছে, তা প্রতিবার পাওয়া গেলে আমাদের মতো শিল্পীরা সারা বছর স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারবেন।
দেবী দুর্গার আগমনি বার্তায় যখন গোটা বাংলা মুখর, তখন তাহেরপুরের শিল্পীদের গলি-ঘুপচি অথবা ঘরগুলি ভরে উঠছে করাতের শব্দে, রং-তুলির খেলায়। সৃষ্টির এই অক্লান্ত পরিশ্রমই যেন এক অন্যরকম পুজো—শিল্পের পুজো, পরিশ্রমের পুজো। আর সেই পুজো থেকেই জন্ম নিচ্ছে বাংলার মহোৎসবের রূপকথা।