Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

একদা প্রাসাদোপম বাড়িতে হতো বৈভবের দুর্গাপুজো, চোখের জলে আজ বৃদ্ধাশ্রমে স্মৃতি খোঁড়েন নবতিপর বৃদ্ধা

ঝাড়খণ্ডের জামতাড়ায় সরখেলদের পরিবারে কি আজও উমা আসেন? হয়তো আসেন কিংবা আসেন না। তবে, একদা প্রতিবছর নিয়ম করে বাংলার পাশাপাশি ওই পরিবারে পুজো পেতেন দশভুজা।

একদা প্রাসাদোপম বাড়িতে হতো বৈভবের দুর্গাপুজো, চোখের জলে আজ বৃদ্ধাশ্রমে স্মৃতি খোঁড়েন নবতিপর বৃদ্ধা
  • ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: ঝাড়খণ্ডের জামতাড়ায় সরখেলদের পরিবারে কি আজও উমা আসেন? হয়তো আসেন কিংবা আসেন না। তবে, একদা প্রতিবছর নিয়ম করে বাংলার পাশাপাশি ওই পরিবারে পুজো পেতেন দশভুজা। ধুমধাম করে হতো আনন্দ-আয়োজন। এখন সবই স্মৃতি। মনের মণিকোঠায় সেই স্মৃতির পাতা ওল্টাতে গিয়ে বর্ধমানের বৃদ্ধাশ্রমে বসে অঝোরে কাঁদেন নবতিপর বৃদ্ধা বীথিকা সরখেল। শহরে এখন পুজো প্রস্তুতি শেষের পর্যায়ে। আর ক’দিন বাদেই বেজে উঠবে ঢাকের বাদ্যি। বৃদ্ধাশ্রমের এক স্বল্প পরিসর ঘরে একাকি বসে কানখাড়া করে শুনবেন সেই বাজনা। হয়তো মনে মনে বলবেন, এটা বোধনের বাজনা। ওটা বোধহয় সন্ধিপুজোর। 

Advertisement

সরখেলদের দেবীর বোধনেও ঠিক এভাবেই বেজে উঠত ঢাকের বাদ্যি। সময় বদলে গেলেও বাজনা বদলায়নি আজও। ষষ্ঠীর ভোর। ঘড়ির কাঁটা মেনে ঠিক তিনটেতে বিছানা ছাড়তেন বীথিকাদেবী। সদ্য বিয়ে করে এসেছেন তখন। কিন্তু পুজোর পুরো দায়িত্ব তাঁরই কাঁধে। চটপট স্নান সেরে মন্দিরে ঢুকতেন তিনি। প্রতিমা এসে গিয়েছে। চলছে বোধনের প্রস্তুতি। বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনের ভিড়। মন্দির প্রাঙ্গণে পড়শিরা। না কোনও ‘মস্ত ফ্ল্যাট’ নয়, প্রাসাদোপম বাড়ি। ‘এপার ওপার’ দেখা যায় না সেই বাড়ির অন্দরমহল। আঙুল উঁচিয়ে গাঁয়ের সবাই বলেন, ওটাই বর্ধিষ্ণু বাঙালি পরিবার সরখেলদের বাড়ি। ভিতরে বিশালাকার ১৬টি ঘর। তাতেও থাকার জায়গা নেই পরিজনদের। সে সব আজ বিথীকাদেবীর ফেলে আসা মন খারাপ করা স্মৃতি।   
পুজোর চারটে দিন দম ফেলার ফুরসত থাকত না বীথিকাদেবীর। নিজের হাতে সব আয়োজন করতে হতো। সপ্তমীর সকালে নবপত্রিকার স্নান থেকে অষ্টমীর দুপুরে পুষ্পাঞ্জলি—সবকিছু নিখুঁত হাতে সামলাতেন তিনি। তৃতীয়া থেকেই চলত পুজোর কাজ। আজ, বুধবার তৃতীয়া। বর্ধমানের রথাতলার বৃদ্ধাশ্রমে অখণ্ড অবসর কাটছে বিথীকাদেবীর। চোখের সামনে শুধু ভেসে ভেসে ওঠে জামতাড়ার সেই রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ির ছবি। বিষাদে ভরে যায় মনটা। স্মৃতির আঘাত বড় নিষ্ঠুর!  
তবুও সেই নিষ্ঠুরতার মধ্যেই অতীত গরিমা হাতড়ে চলেন বীথিকাদেবী। বলছিলেন, ‘পুজোর একমাস আগেই বাড়িতে সাজসাজ রব। শ্বশুর বাড়ির ওই পুজো ছিল কয়েক’শ বছরের প্রাচীন। নিয়ম নিষ্ঠার সঙ্গে কোনও আপোস করা হতো না। একটু এদিক ওদিক হওয়ার জো ছিল না। আমাদের অনেক বড় পরিবার ছিল। সব সময় গমগম করত। তারপর স্বামী মারা গেল। আমাদের সন্তান-সন্ততি ছিল না। ওর মৃত্যুর পর লোকভর্তি বাড়িটাও যেন আমার কাছে খাঁ খাঁ করত। সেখানে আর মন বসল না। সব বৈভব ছেড়ে চলে এলুম এই বৃদ্ধাশ্রমে। এখানে আমরা সবাই সবার আপনজন। দিব্যিই সময় কেটে যায়। শুধু পুজোর সময় মনটা ফিরে যায় জামতাড়ায়। কত কথা মনে পড়ে— বাড়ির সেই স্থাপত্য, পরিবারের আভিজাত্য। সেই মন্দির, সেই সন্ধিপুজো, সেই মায়ের মায়াবী মুখ...কতকিছু।’ এখন সবই স্মৃতি।  
বীথিকাদেবীর স্মৃতি রোমন্থনের মধ্যেই বৃদ্ধাশ্রমে ঢুকলেন বর্ধমান দক্ষিণের বিধায়ক খোকন দাস। তিনি এটি পরিচালনা করেন। বীথিকাদেবীকে সামনে পেয়ে বললেন, ‘ মা তোমরা সবাই ভালো রয়েছো তো?’ সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন সরখেল পরিবারের বধূ। কিছু পরেই এলেন চিকিৎসক দম্পতি। নতুন বস্ত্র দেবেন আবাসিকদের। বীথিকাদেবীও পেলেন একখানি নতুন বস্ত্র। চেয়ারে বসে সেটি হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে বৃদ্ধার। কানে বাজে জামতাড়ার শ্বশুরবাড়ির মন্দিরের ঢাকের আওয়াজ। 
বীথিকাদেবীর চিবুক বেয়ে কয়েক ফোঁটা চোখের জল গড়িয়ে পড়ে নববস্ত্রের উপর। স্মৃতি বড় বেদনার।  নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ