সোমেন পাল, গঙ্গারামপুর: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে শহর। বদলেছে পুজোর আয়োজন। কিন্তু গঙ্গারামপুরের দুর্গাবাড়ির দুর্গাপুজোয় আজও অটুট রয়েছে কয়েক শতাব্দী পুরনো রীতি ও পরম্পরা। বোধনের দিন কয়েক কেজি স্বর্ণালংকারে দেবীকে সাজিয়ে শুরু হয় পুজো। আর প্রাচীন পঞ্চমুণ্ডির আসনে বৈষ্ণব মতে দেবীর আরাধনা চলে। স্থানীয়দের দাবি, এবারে এই পুজো প্রায় ৪০২ বছরে পা দেবে।
গঙ্গারামপুর মহকুমার অন্যতম প্রাচীন এই পুজোকে ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা ও জনশ্রুতি। কথিত রয়েছে, দেশভাগের আগে গঙ্গারামপুর পূর্ববঙ্গের অধীন থাকাকালীন এখানকার জঙ্গলে এক সাধু বসবাস করতেন। স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি নিজের হাতে দুর্গামূর্তি তৈরি করে পঞ্চমুণ্ডির আসনে বৈষ্ণব মতে পুজোর সূচনা করেন। সেই সময় রাজা গণেশ বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয় এক জমিদারকে পুজোর বিষয়ে অবগত করেন। পুজো চালিয়ে যেতে তাঁকে সহযোগিতার নির্দেশ দেন। এরপর থেকে সেই সাধুর হাত ধরে পুজোর এগিয়ে চলে বলে জনশ্রুতি।
বর্তমানে গঙ্গারামপুর পুরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের এই পুজো সর্বজনীন রূপ নিয়েছে। নতুন মন্দির তৈরি হলেও পুজোর মূল আকর্ষণ সেই প্রাচীন পঞ্চমুণ্ডির আসন। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত এলাকার বহু পরিবারে রান্নাবান্না বন্ধ রাখেন। পুজোমণ্ডপে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পাঁচদিন ধরে ভক্তদের জন্য থাকে প্রসাদের আয়োজন।
পুজোর অন্যতম বিশেষ রীতি দশমীর বিসর্জন। শহরের অন্যান্য প্রতিমার আগে দুর্গাবাড়ির প্রতিমা পুনর্ভবা নদীর ঘাটে বিসর্জন দেওয়া হয়। এরপর গঙ্গারামপুর শহর ও ব্লকের অন্যান্য প্রতিমা বিসর্জনের জন্য বের হয়। নবমীতে বলির প্রথা এখনও থাকলেও ছাগবলির পরিবর্তে বর্তমানে কুমড়ো বলি হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে লোকবিশ্বাস, আচার অনুষ্ঠান ও ভক্তির মেলবন্ধনে গঙ্গারামপুরের দুর্গাবাড়ির পুজো আজও শহরের অন্যতম ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
পুজো কমিটির সভাপতি প্রশান্ত মিত্র বলেন, প্রাচীন রীতিনীতি মেনে পাড়ার সকলকে সঙ্গে নিয়ে পুজো হয়ে আসছে। এটি কত বছরের পুরানো পুজো তার সঠিক হিসাব বলা কঠিন। জনশ্রুতি অনুযায়ী আনুমানিক ৪০২ বছরের পুরানো। যে পঞ্চমুণ্ডির আসনে একসময় পুজো হতো এখনও সেখানেই পুজো হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা প্রতিমা সাহা বলেন, দুর্গাবাড়ির পুজো গঙ্গারামপুরের অন্যতম প্রাচীন পুজো। এই মণ্ডপে না এলে শহরের পুজো যেন সম্পূর্ণ হয় না। এখনও নিষ্ঠা ও ভক্তিভরে পুজো হয়।