নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: বাঙালির দুর্গাপুজো মানেই মিলনের মহাসমারোহ। মিলনের মহাপ্লাবনে মুছে যায় সমস্ত শ্রেণিবিন্যাস। মুছে যায় গ্রাম-শহরের, বর্ধিষ্ণু-প্রান্তিক জনপদের ভেদ। পুজোর আবহ আর থিমের বিপুল দাপট মিলিয়ে দেয় বলাগড় থেকে শ্রীরামপুরকে। দুই জনপদই দেবী দশভুজাকে স্বাগত জানাচ্ছে থিমের মণ্ডপ আর প্রতিমাসজ্জায়। কোথাও স্থাপত্য দিয়ে চোখ ধাঁধানোর উদ্যোগ তো কোথাও ভাবপ্রবণ থিমে দর্শককে থমকে দেওয়ার প্রস্তুতি। মা’কে নিয়ে প্রতিযোগিতার আবহ হুগলির শহর থেকে গ্রামে।
হুগলির বলাগড়ের জিরাট গত কয়েক বছর ধরেই রীতিমতো ‘চোখ রাঙাচ্ছে’ তথাকথিত শহুরে বড়পুজোর উদ্যোগকে। ২০২৪ সালে একগুচ্ছ বড়পুজোর কারণে শহরের ভিড় উপচে পড়েছিল জিরাটে। এবারও সেখানে কাঁচের প্রসাদ তৈরি হচ্ছে। প্রায় ৯০ ফুট লম্বা ও সমান সমান চওড়া সেই প্রাসাদের আকর্ষণ ইতিমধ্যেই ছড়াতে শুরু করেছে। স্থানীয় সবুজ সঙ্ঘের মাঠে তৈরি হচ্ছে কর্ণাটকের ইস্কন মন্দিরের আদলে মণ্ডপ। বিরাট আয়তনের সেই মন্দিরকে আড়েবহরে ততটাই বড় করে তুলে ধরতে কয়েকশো শিল্পী রোজ খাটছেন। ওই বিরাট মণ্ডপের পুরোটাই তৈরি হবে কাঁচ দিয়ে। ফলে, দ্যুতি ছড়ানোর জন্য তাল ঠুকছেন ‘মিরর প্যালেস’ তৈরির উদ্যোক্তারা। বাঁশ, কাঠ, কাপড় এবং বিশেষ রকম পুঁতির দানা মণ্ডপসজ্জায় ব্যবহার করা হবে। কিন্তু মন্দিরের পুরো বাইরের আস্তরণ তৈরি হবে কাঁচ দিয়ে। মন্দিরকে ঘিরে থাকবে বিশেষ আলোকসজ্জা। ইস্কন মন্দিরে দর্শন দেবেন দেবী দশভুজা, সপরিবারে। সেই দেবীপ্রতিমা নির্মাণেও বিশেষ আদল তৈরি করা হচ্ছে। উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে প্লাস্টার অব প্যারিস ও মাটি। ক্লাবকর্তা তরুণ বিশ্বাস বলেন, সবুজ সঙ্ঘের মণ্ডপসজ্জা ও প্রতিমা দেখতে দর্শকদের আসতেই হবে। দূর থেকে আলো ঠিকরে দেওয়া চূড়া দেখা যাবে। শহরের দর্শক সেই চূড়ার টানেই ভিড় জমাবেন।
প্রান্তিক জনপদ জিরাটের ভরসা যদি স্থাপত্য হয়, তবে ঐতিহ্যের জনপদ শ্রীরামপুরের ভরসা ভাববহুল থিম। শ্রীরামপুরের আদর্শ সমিতির এবারের আয়োজন, ‘কালের স্রোতে বিলীন’। কালস্রোত উপেক্ষা করা কঠিন। আধুনিক সময়ের দাবিতে হারিয়ে গিয়েছে সাবেক কালের ফল ও ফুলের ঝুড়ি, মাদুর, গামছা। সেসবই এবার উদ্যোক্তাদের মণ্ডপসজ্জার হাতিয়ার। বাঙালির সংস্কৃতি, তার কুটিরশিল্প, সাবেক রাজবাড়ি, রাজকীয় ঐতিহ্য বা বনেদিয়ানা– সবকিছুকেই একসঙ্গে ধরতে চেয়েছেন উদ্যোক্তারা। একটি রাজবাড়ির আদলে তৈরি মণ্ডপের অন্দর ও বাহিরসজ্জায় থাকবে হারিয়ে যাওয়া নিত্যদিনের নানা সামগ্রী। দেবী থাকবেন রাজরাজেশ্বরী অবয়বে। মনোরম আলোকসজ্জার বিপুল বিচ্ছুরণ ঘিরে থাকবে গোটা মণ্ডপকে। পুজো উদ্যোক্তা জ্যোর্তিময় সাহা বলেন, অতীতকে ফিরে দেখার এটি একটি বর্ণাঢ্য প্রয়াস।
বাতাসে ভেসে গ্রাম থেকে শহরে পাড়ি দিচ্ছে কাশের রেণু। আগমনীর বেণুবাদনের মৌতাতে মুখরিত হয়ে উঠছে প্রকৃতি। মিলনের মহামেলায় থিমের প্লাবনে ভেসে যাচ্ছে হুগলি। সতত বেগবান গঙ্গার জলধারাও তার প্রতিবিম্ব দেখে চমকে যাচ্ছে হয়তো।