নিজস্ব প্রতিনিধি, জলপাইগুড়ি: সারা বছর বন্ধ থাকে মায়ের ঘর। নবমীতে ব্যাঙ্কের লকার থেকে নিয়ে আসা হয় সোনার দুর্গাকে। গ্রামবাসীর মনস্কামনা পূরণ করতে একদিনের জন্য দেবী আসেন মন্দিরে। সন্ধ্যা নামার আগেই তিনি আবার ‘লকার-বন্দি’! ময়নাগুড়ির ভোটপাট্টি খয়েরখাল এলাকায় একদিনের সোনার দুর্গার পুজো ঘিরে আজও অটুট মিথ।
এলাকার মানুষের বিশ্বাস, দেবীর কাছে ভক্তিভরে যা চাওয়া হয়, তিনি তা পূরণ করেন। এই বিশ্বাস থেকে বছরভর তালাবন্ধ মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে দেবীর উদ্দেশে প্রণাম করেন ভক্তরা। পুজো দেন। মানত করেন। আর নবমীতে সোনার দুর্গাকে পুজো দেওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। বহু দূর থেকে আসেন ভক্ত-দর্শনার্থীরা। সোনার দুর্গাকে ঘিরে থাকে কড়া নিরাপত্তা। মোতায়েন থাকে পুলিস। বিগ্রহের ছবি তোলা নিষেধ। তবে দু’চোখ ভরে দেবীকে দেখতে থাকে না কোনও বাধা।
এই সোনার দুর্গা এল কোথা থেকে? সেই কাহিনি রোমাঞ্চকর। কয়েকশো বছর আগের কথা। তখন চারদিকে ঘন জঙ্গল। ওই জঙ্গলের মধ্যে বিশাল এক জলাশয়। নাম খয়েরখাল। সেখান থেকেই নাকি উদ্ধার হয় সাত ইঞ্চির ওই সোনার দুর্গা! ওজন প্রায় চারশো গ্রাম।
সোনার বিগ্রহে দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী। দেবীর বাহন হিসেবে এখানে দু’টি সিংহ। রয়েছে অসুর ও মহিষের মাথা। তবে নেই কার্তিক, গণেশ কিংবা লক্ষ্মী ও সরস্বতী। দেবীর হাতে কোনও অস্ত্র নেই। যদিও মনোষ্কামনা পূরণ হওয়ায় ভক্তরা দেবীকে রুপোর অস্ত্র দিয়েছেন। বানিয়ে দিয়েছেন রুপোর সিংহাসন। ভোটপাট্টি রেলস্টেশন পেরিয়ে কিছুটা গিয়ে খয়েরখাল গ্রাম। রাস্তার পাশে টিনের চাল দেওয়া মন্দির। ওই মন্দিরের পিছনে খয়েরখাল। বলা হয়, ওই খালের চারপাশে একসময় প্রচুর খয়ের গাছ ছিল। সেকারণে এমন নামকরণ। প্রায় তিনশো বছর ধরে পুজো পাচ্ছেন ওই সোনার দুর্গা। মা গোসানি নামে পরিচিত দেবী। পাঁচদিন নয়, এখানে পুজো একদিনের। বলা হয়, স্বপ্নাদেশে দেবী তাঁর পুজোর নিয়ম-রীতি বলে দিয়েছেন। সেভাবেই বছরের পর বছর ধরে এই সোনার দুর্গার আরাধনা হয়ে আসছে। এখানে বংশপরম্পরায় পুজো করে থাকেন রাজবংশী পুরোহিত, যাঁরা দেউসি নামে পরিচিত। আগে পুজোয় পাঁঠা ও পায়রা বলি হতো। বেশ কয়েক বছর ধরে তা বন্ধ। নবমীর সকালে স্নান সেরে মন্দিরে আসেন সোনার দুর্গা। শুরু হয় পুজো। পশ্চিম আকাশে সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে পুজো শেষ করে সন্ধ্যা নামার আগেই বিসর্জন দেওয়া হয় ঘট। কড়া নিরাপত্তায় বাক্স-বন্দি হয়ে সোনার দুর্গা ফিরে যান লকারে। দেবী মন্দির ছাড়লেও থেকে যায় পুজোর রেশ। মন্দির চত্বরে বিশাল মেলা বসে।
জনশ্রুতি, পার্বতীচরণ রায় নামে স্থানীয় জোতদার স্বপ্নাদেশ পেয়ে খয়েরখাল থেকে ওই সোনার দুর্গা মূর্তি উদ্ধার করেন। পাবর্তীচরণের বর্তমান বংশধর হীরণ্ময় রায় বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষকে স্বয়ং দেবী স্বপ্নাদেশ দেন। সেইমতো জঙ্গল ঘেরা খয়েরখাল থেকে ওই সোনার দুর্গামূর্তি তিনি উদ্ধার করেন। বরাবর এখানে শুধুমাত্র নবমীতে পুজো হয়। বছরভর লকারে থাকেন দেবী। একদিনের জন্য তিনি ভক্তদের মনস্কামনা পূরণ করতে আসেন মন্দিরে। যদিও অনেকের মতে, খয়েরখাল জঙ্গলে এক সাধু আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনিই সোনার দুর্গা উদ্ধার করে পুজো শুরু করেন। জঙ্গল ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় বিগ্রহটি দিয়ে যান গ্রামবাসীদের।