বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, উত্তরপাড়া: উত্তরপাড়া বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়ি নবগ্রামের আদর্শনগরের যে মহল্লায় ঢুকল, সেটা আচ্ছেলাল যাদবের বাড়ি তথা খাসতালুক। একদা তৃণমূলের এই পঞ্চায়েত প্রধান সদ্য দল বদলে বিজেপিতে ভিড়েছেন। রাজনৈতিক হিংসার অভিযোগ যে আচ্ছেলালের বিরুদ্ধে প্রায়শই এলাকাবাসী তোলেন, তাঁর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েই একবার মোবাইলে চোখ বুলিয়ে নিলেন শীর্ষণ্য। বললেন, আজ সূর্যাস্তের সময়টা কিন্তু জব্বর। সন্ধ্যা ৬টা বেজে ১ মিনিট। যেসব দল বদলু বৃদ্ধের দল এখনও সূর্যোদয়ের দিবাস্বপ্ন দেখছে, তাদের অস্ত যাওয়ার সময় হল! চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে বললেন, কোথায় এলাকার বড়ো বিজেপি নেতারা? কাউকে দেখছি না তো? এবার এই এলাকায় তরুণ তুর্কিদের উদয় হবে। অস্ত যাবে পুরানো পচা, দাগীরা।
সকালে একপশলা বৃষ্টির পর যখন খোশমেজাজে এসব বলছেন শীর্ষণ্য, তার কিছুক্ষণ আগেই তাঁর আর সিপিএম প্রার্থী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের মুখোমুখি হওয়া ও সৌজন্য সাক্ষাতের ছবি রীতিমতো ভাইরাল হয়ে গিয়েছে। তরুণ তুর্কি কিন্তু মীনাক্ষীও! শীর্ষণ্যর আবারও সহাস্য জবাব, সারা বছর মন দিয়ে পড়াশোনা করলে যেমন পরীক্ষার দিন টেনশন মুক্ত থাকা যায়, আমিও তাই আছি। স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিচ্ছেন মানুষ। তাই শেষ হাসি হাসব আমরাই। শীর্ষণ্যর এই আত্মবিশ্বাস আবার ভোটারদের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন মীনাক্ষীও। কানাইপুর হাইস্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ভোটাররা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন। আমরা এটাই চেয়েছিলাম। ভোটারদের লম্বা লাইনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আর্জি জানালেন, যাঁকে খুশি ভোট দিন, কিন্তু নির্ভয়ে ভোট দিন। যে মীনাক্ষী গত কয়েক মাসে ভোট প্রচারে লাগাতার ‘মমতার পুলিশ’কে তুলোধোনা করেছেন, এদিন তিনি কেন্দ্রীয় বাহিনীর পাশাপাশি সন্তোষ প্রকাশ করলেন পুলিশের ভূমিকা নিয়েও। কানাইপুরের এক জটলাকে লক্ষ্য করে পুলিশকে বললেন, ওরা এখানে ভিড় করছে কেন? কিছু করুন? পুলিশ কর্তার জবাব, আমি তো ভেবেছি ওঁরা আপনার লোক! আপনার সঙ্গে এসেছেন! তারপরই পুলিশের চোখরাঙানিতে রণে ভঙ্গ দিল ভিড়। একটু বেলা বাড়তেই ফের বৃষ্টি এল ঝিরিঝিরি। কিন্তু মেঘ-বৃষ্টি টলাতে পারেনি ভোটারের জেদকে। কোন্নগর জোড়াপুকুর এলাকায় একাধিক এলাকায় স্লো পোলিং বা ধীরগতির ভোটের অভিযোগ তুলেছেন অনেকেই। কিন্তু ময়দান ছেড়ে বেরলেন না কেউ। ভোট চলল উৎসবের মেজাজেই। নবগ্রাম হীরালাল পাল বালিকা বিদ্যালয়ের কাছের তৃণমূলের ক্যাম্প থেকে নমিতা সরকার বললেন, আধ ঘণ্টা আগেই ৩৮ নম্বর বুথে ৩৮ শতাংশ ভোট হয়ে গিয়েছে। তাও তো ইভিএমের গোলযোগে সাড়ে ৭টার আগে ভোটই শুরু হয়নি! এখানকার তৃণমূল কর্মী অর্ণব বিশ্বাসের কথায়, এতটা স্বতঃস্ফূর্ত ভোট আগে দেখা যায়নি। শাসকদলের এই আত্মবিশ্বাস জিইয়ে রইল সন্ধ্যা পর্যন্ত। কোন্নগর পুরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার অঞ্জলি বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, বিকাল ৫টার মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট হয়ে গিয়েছে কিশলয় স্কুলের ২৪৩ নম্বর বুথে। মানুষ উৎসবের মেজাজে ভোট দিয়েছেন প্রতিবারের মতোই। আমাদের এই সংস্কৃতি এতটাই জোরদার, কেন্দ্রীয় বাহিনীও রীতিমতো খোশমেজাজে ছিল। তবে অন্য চিত্রও দেখা গিয়েছে। শ্রীরামপুরের তৃণমূল প্রার্থী তন্ময় ঘোষকে এদিন রিষড়ার একটি বুথ থেকে বের করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। এ নিয়ে কমিশনকে অভিযোগ জানিয়েছেন তন্ময়।
বুধবারের ভোটে ‘ম্যান অব দি ম্যাচ’ ছিলেন উওমেন বা মহিলারাই। প্রায় প্রতিটি বুথেই সকাল থেকে ভিড়ের নিরিখে টেক্কা দিয়েছে দুর্গাবাহিনী। আর তাতেই খুশি চাঁপদানির বিদায়ী বিধায়ক ও তৃণমূলের প্রার্থী অরিন্দম গুঁইন। ভরদুপুরে বৈদ্যবাটী প্রেম মন্দিরের পাশে রাস্তার ধারে সপারিষদ বসেছিলেন তিনি। পাশেই রাখা বিরাট সাইজের মাটির তৈরি প্রতীকী লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। মুচকি হেসে বললেন, মহিলারাই তো সব! ভোট কেমন চলছে? বললেন, ভালোই। তবে একজন জানালেন, বুথে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর নাকি পোস্টাল ব্যালটে ভোট পড়ে গিয়েছে আগেই! কী যে হচ্ছে!
চাতরা নন্দলাল ইনস্টিটিউশন থেকে বেরচ্ছিলেন এক মহিলা। ভোট কেমন হল, জিজ্ঞাসা করতে স্পষ্ট জানালেন, এবার কিন্তু বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার ভোট। তাই দিদিকেই ভোট দিয়েছি। বুথের সামনেই রাখা ছিল নির্বাচন কমিশনের ‘মেছো’ ম্যাসকট। সেদিকে আঙুল তুলে তাঁর সহাস্য উক্তি, আমরা যে শেষ পর্যন্ত মাছে-ভাতে বাঙালি!