সুদীপ্ত রায়চৌধুরী, কলকাতা: দল। এই শব্দের মধ্যেই রয়েছে একসঙ্গে থাকার বিষয়টি। অর্থাৎ জোটবদ্ধভাবে থাকা। দমদম পার্ক তরুণ দলের পুজোয় তাই এবার সবকিছু তৈরি হচ্ছে একসঙ্গে, বেঁধে বেঁধে। আর এর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এবারের পুজোর ভাবনা—‘জোট’। মণ্ডপ ও প্রতিমাশিল্পী পূর্ণেন্দু দে’র কথায়, সমাজের সর্বত্রই জোট বাঁধার বার্তা রয়েছে। আমরা যখন কথা বলি, তখন জোট বাঁধে শব্দরা। আবার রামায়ণে রাবণকে হারাতে বানর সেনাদের নিয়ে জোট বেঁধেছিলেন স্বয়ং রামচন্দ্র। এমনকি অসুরকূলকে ধ্বংস করতে জোট বেঁধেছিলেন দেবতারাও। সেখান থেকেই মা দুর্গার সৃষ্টি। সেই ভাবনাই এবারে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে মণ্ডপজুড়ে। চট, দড়ি, খড়, কাঠ দিয়ে জোট বেঁধে বেঁধে মণ্ডপ সাজাচ্ছেন শিল্পী। কোথাও তৈরি হচ্ছে মানুষের ডিএনএ, সারিবদ্ধ পিঁপড়ের দল, মৌমাছির দলের প্রতিকৃতি। আবার কোথাও মটকি তোড়ের জন্য একে অপরের কাঁধে ওঠা মানুষের জোট। দেবী প্রতিমার কাছেও দেখা যাবে জোটের বার্তা। অসুর বধের জন্য মহামায়াকে জোট বেঁধে নানা অস্ত্রে ভূষিত করেছিলেন দেবতারা। সেই শক্তির জোটের সমাহারে সাজছেন দেবী দুর্গা। পুজোর কোষাধ্যক্ষ প্রতিক্ষণ ঘোষের কথায়, বাড়ি, স্কুল, অফিস থেকে পুজো—আমরা জোটবদ্ধভাবেই সব করি। সেই থেকেই এই ভাবনা।
দমদম পার্ক যুবকবৃন্দে এবার তৈরি হচ্ছে ‘কালান্তর’। পুজোর জয়েন্ট সেক্রেটারি স্নেহাংশু বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুমিত দে জানান, ‘কালান্তর’ অর্থ কালের অন্তর। সময়ের স্রোতে পৃথিবী বদলেছে। কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, স্বপ্নপূরণের আকাঙ্ক্ষা এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এগিয়ে চলার মানসিকতা আজও একই রয়েছে। সেই চিরন্তন মানবসংগ্রামের গল্প বলবে ‘কালান্তর’। শিল্পী সুশোভন রায়ের ভাবনায় রয়েছে দুই সময়ের দু’জনের লড়াইয়ের কথা। প্রথমজন মনসামঙ্গল কাব্যের চরিত্র বেহুলা। স্বামী লখিন্দরকে বাঁচাতে সমস্ত প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে তাঁর ভালোবাসা ও বিশ্বাসের শক্তিতে অসম্ভব এক যাত্রায় বেরিয়েছিলেন। দ্বিতীয়জন দশরথ মাঝি। স্ত্রী ফাল্গুনীর মৃত্যুর পর পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করেছিলেন তিনি। আজও মানুষ প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলেছে। সাধারণ মানুষের এই ছোটো ছোটো সংগ্রামই আসলে আমাদের সময়ের বড়ো গল্প। প্লাইউডের উপর রং করে চারকোল দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে বেহুলার যাত্রাপথ থেকে দশরথ মাঝির সংগ্রাম। এছাড়াও ব্যবহার করা হচ্ছে লোহার শিট, বাঁশ, টিন, ফাইবার। ঠাকুরঘরে থাকবে দশমমহাবিদ্যার নানা ছবি। প্রতিমা তৈরি হচ্ছে মাটি দিয়ে। তবে একঝলকে মনে হবে তা বুঝি পাথরের মূর্তি। ঠাকুরঘরে সেই মূর্তি থাকবে ‘ভাসমান’ অবস্থায়।
দমদম পার্ক থেকে কিছুটা এগলেই দেখা মিলবে কুরুক্ষেত্রের। লেকটাউন প্রদীপ সংঘের পুজোয়। শিল্পী অরিন্দম দাসের কথায়, মণ্ডপে পা রাখলেই মনে হবে আপনি পৌঁছে গিয়েছেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধভূমিতে। পাণ্ডব-কৌরবদের মধ্যে দিয়ে কিছুটা এগোলেই মাতৃপ্রতিমা। দেবী এখানে রথে সওয়ার। সেই রথ টানছে চারটি ঘোটকমুখী সিংহ। লাগাম কার্তিকের হাতে। গণেশ মায়ের কোলে। দু’পাশে লক্ষ্মী-সরস্বতী। দেবীর হাতে তির-ধনুক। পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা বাবু দাস বলেন, মহাভারতের যুদ্ধ আজও আমাদের সবার মধ্যে বর্তমান। সেকথাই মনে করিয়ে দেবে কুরুক্ষেত্রের এই ধর্মযুদ্ধ।



