তামিম ইসলাম, ডোমকল: অভাবের সংসার। পেটে খিদে। স্কুল ছেড়ে ভাত জোগাড়ে নামছে কিশোররা। বই-পত্তর শিকেয় তুলে কেউ হয়েছে ফেরিওয়ালা। কেউ বা কাজ করছে দোকানে। কেউ আবার সব্জি কিংবা মাছ বিক্রেতা। ডোমকল মহকুমাজুড়েই এই ছবি বেশ ভাবাচ্ছে সমাজ বিজ্ঞানীদের। তাঁদের মতে এ এক গভীর সামাজিক সঙ্কট। এর থেকে উত্তরণের দিশা দেখাতে পারে একমাত্র সরকারের সুসংহত পরিকল্পনা।
বর্তমানে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দর আকাশছোঁয়া। একার আয়ে সংসার চালিয়ে নিয়ে প্রায় অসম্ভব। ফলে, অভাব নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে একাধিক পরিবারে। দু’বেলা দু’মুঠো খেতে নাভিশ্বাস উঠছে। বাধ্য হয়ে বাড়তি উপার্জনের পথে নামতে হচ্ছে কিশোরদের। যেমন, রানিনগরের রাহুল শেখ (নাম পরিবর্তিত)। বছর তেরোর এই কিশোর সাইকেলে থার্মোকলের বাক্স বেঁধে রোজ ১০ কিমি ঘুরে মাছ বিক্রি করে। পড়াশোনার কথা শুনে সে বলছিল, ‘বাবার একার আয়ে আর সংসার চলছে না। খালি পেটে কি আর পড়াশোনা হয়? সারাদিন মাছ বিক্রি করে যা আয় হয় তা বাবার হাতে তুলে দিই।’ পাশের এলাকার সবুজ শেখ (নাম পরিবর্তিত)-এর গল্পটা একটু অন্যরকম। সবুজের বাবা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। শয্যাশায়ী। কাজ করতে পারেন না। সবুজ সোনপাপড়ি বিক্রি করে সংসার টানছে।
রাহুল কিংবা সবুজ উদাহরণ মাত্র। ডোমকল মহকুমার রাস্তাঘাট, দোকানপাটগুলিতে ঢুঁ মারলে একাধিক রাহুলের দেখা মিলবে। যাদের পরিপাটি হয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, তাদের পিঠে সংসারের জোয়াল। স্বভাবতই বাড়ছে স্কুলছুটের সংখ্যা! ছাত্রাভাবে ধুঁকছে স্কুলগুলি। কেউ কেউ আবার তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা স্কুল ছেড়ে কাজে লেগে পড়েছে। প্রথম দিকে ছুটির দিনে রোজগারের সন্ধানে বেরোত। ক্রমেই তাদের টাকার নেশা পেয়ে বসে। স্কুলে যাওয়া ছেড়ে পুরোদমে নেমে পড়ে কাজে। চৈত্রের দুপুরে গ্রাম ডোমকলের পথে আইসক্রিম ফেরি করছিল এক নাবালক। কারণ জানতে সে বলল, ‘বছর খানেক আগেই আমার বাবা মারা গিয়েছে। মা বিড়ি বাঁধে। সংসারে অভাব। তাই সাইকেল নিয়ে আইসক্রিম বিক্রি করছি।’ কথা হচ্ছিল ডোমকলের এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, ‘দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে সংসারে অভাব আর ঘুঁচছে না। বাড়তি উপার্জনের প্রয়োজন পড়ছে। সেই কারণে কিশোররা নেমে পড়ছে আয় করতে। বাড়ছে স্কুলছুটের সংখ্যা।’
জলঙ্গির এক নাবালকের মা সাবিয়া বিবি বলছিলেন, ‘আমার ছেলে মাঝে মধ্যে স্কুলে যায়। বাকি সময় সাইকেলে করে আইসক্রিম বিক্রি করে। বছরের অন্য সময় চায়ের দোকানে কাজ করে। আমরা খুব গরিব। ছেলে কাজ করলে বাড়তি টাকা সংসারে আসে।আমরা অসহায়।’