


রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়
—আপনার নাম?
—শ্রীপর্ণা মিত্র।
—বয়স?
—চৌত্রিশ।
—হুম। এবার বলুন, আপনার সমস্যাটা কী?
—আমার না অনেক কিছু হারিয়ে যাচ্ছে!
—মানে!
—মানে, আমি কিছু কিছু জিনিস ঠিক মনে করতে পারছি না!
—এই বয়েসে তো এমন হওয়ার কথা নয়! কোথায় কী রাখছেন সেটা কি খেয়াল থাকছে না?
—না, ব্যাপারটা ঠিক সেরকম নয়। আসলে আমি কিছু কিছু জরুরি ঘটনা একদমই মনে করতে পারছি না!
—কীরকম?
—যেমন ধরুন নিজের বিয়ের ঘটনাটা আমার একদমই মনে পড়ছে না!
—মানে বিয়ে, বউভাত, বাসর, খাওয়াদাওয়া— কিছুই মনে পড়ছে না?
— না। কিচ্ছু না।
দুঁদে সাইকিয়াট্রিস্ট ডাক্তার অর্ণব দাশগুপ্ত এবার নিজের রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে কয়েক সেকেন্ড পজ নিলেন। চোখ থেকে খুলে ফেললেন রিমলেস চশমাটা। ছোট্ট স্টাডি করে দেখলেন তাঁর সামনে বসে থাকা পেশেন্ট মিসেস শ্রীপর্ণা মিত্র যথেষ্ট সুশ্রী। কথাবার্তায় কোনো আড়ষ্টতা নেই। অবস্থা বেশ সচ্ছল। চোখ-মুখের যে ভাব বা কথাবার্তার যে স্টাইল তাতে মানসিক কোনো অসুস্থতা আছে বলেও মনে হচ্ছে না। ডাক্তার দাশগুপ্ত নিজের শরীরটা টেবিলের সামনের দিকে আবার কিছুটা এগিয়ে এনে জিজ্ঞেস করলেন— এটা মোটামুটি কতদিন ধরে হচ্ছে?
—বিয়ের ঠিক পর থেকেই।
—হুঁ। তা কতদিন আগে বিয়ে হয়েছে আপনার?
এখন যে দশ বাই দশ ঘরটিতে মিসেস শ্রীপর্ণা মিত্র বসে রয়েছেন, তার চারধারে লুকিয়ে রাখা ওয়ার্ম ইয়ালো লাইটের মায়াময় আলো। সেই সঙ্গে খুব লো ভল্যুমে প্যানফ্লুট বাজছে। বাঁ পাশের দেওয়ালের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে শ্রীপর্ণা মিত্র বললেন—ছ’বছর আগে।
—বাঃ, এটা তো মনে রয়েছে দেখছি!
—হ্যাঁ। মনে রয়েছে কারণ আমাদের ম্যারেজ সার্টিফিকেটে বিয়ের সাল আর তারিখ লেখা ছিল। কিন্তু আমাদের বিয়ের অ্যালবামে যে অল্প কিছু ছবি, সেগুলো সবই আমার কেমন অচেনা লাগছে। মনে হচ্ছে, এমন কোনো ঘটনা আমার জীবনে যেন কোনোদিনই ঘটেনি।
ডাক্তার অর্ণব দাশগুপ্ত এবার মাথাটা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—আচ্ছা মিসেস মিত্র, আপনাদের লাভ ম্যারেজ না অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ?
ঠিক এই সময় চেম্বারের দরজা নক করে ডাক্তারবাবুর পিএ মিস মনিকা মণ্ডল ভেতরে এলেন এবং দু’জনের সামনে দুটো ধোঁয়া ওঠা কফির মাগ এবং দুটো ছোটো কাচের প্লেটে কিছু চকোলেট কুকি রেখে গেলেন।
তিনি বেরিয়ে যেতেই শ্রীপর্ণা মিত্র বললেন—লাভ ম্যারেজ। আমি আর জয়দীপ একই কলেজে পড়তাম। ও আমার থেকে এক বছরের সিনিয়র ছিল।
—বেশ বেশ। আচ্ছা আপনাদের বিয়ের আগের মেলামেশার ঘটনাগুলো কি মনে আছে, না সেগুলোও...।
—না না, সেগুলো সবই মনে আছে! যেমন মনে আছে বিয়ের পরে আমাদের নতুন ভাড়া নেওয়া ফ্ল্যাটে যাওয়া, সেই ফ্ল্যাট দু’জনে মিলে সাজানো— এইসব ছোটো ছোটো স্মৃতি।
হাতে খুলে রাখা চশমা চট করে চোখে পরে নিয়ে ডাক্তার অর্ণব দাশগুপ্ত বললেন, যাক। আচ্ছা এর মধ্যে এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে কি যার ফলে আপনি আপনার হাজব্যান্ডের ওপর রেগে গেছেন বা ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে দু’জনের মধ্যে...।
—না না, একেবারেই না। জয়দীপ খুব ঠান্ডা মানুষ। ও উত্তর কলকাতার একটা কলেজে পড়ায়। টুকটাক লেখালিখি করে। ও আমার খুব ভালো বন্ধু।
—বেশ। নিন, কফিটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে! বলে ডাক্তার দাশগুপ্ত নিজের কফি মাগে একটা ছোট্ট চুমুক দিয়ে বললেন—আচ্ছা, বিয়ের মতো আপনার আর কি কোনো মেমরি আছে, যেটা আপনি রি-কল করতে পারছেন না?
—আছে।
—আছে? কী সেটা?
চকোলেট কুকিতে একটা কামড় দিয়ে শ্রীপর্ণা মিত্র বললেন—বিয়ের প্রায় বছরখানেক পরে আমরা একটা পিকনিকে গিয়েছিলাম। সেখানে প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে আমার হাজব্যান্ডের কাছ থেকে উপহার পাওয়া একটা নতুন শাড়ি কীসে যেন খোঁচা লেগে অনেকটা ছিঁড়ে গিয়েছিল। সেই পিকনিকের তো আর কিছুই মনে করতে পারছি না! শুধু শাড়িটা ছিঁড়ে যাওয়ায় কষ্ট হয়েছিল খুব—এটা পরিষ্কার মনে আছে। কিন্তু কী করে যে ওটা ছিঁড়ল সেটা কিছুতেই মনে পড়ছে না!
অর্ণব দাশগুপ্ত এবার তাঁর আটান্ন বছরের পুরানো মাথার কাঁচাপাকা চুলে একবার আলতো করে হাত বুলিয়ে নিলেন। মাঝারি হাইটের পেটানো শরীরের শ্যামলা মানুষটা এখন প্রুশিয়ান ব্লু কালারের একটা সিল্কের সামার স্যুট পরে রয়েছেন। পায়ে চকচকে লেদার শু। পার্ক স্ট্রিট লাগোয়া এই প্রাইভেট চেম্বারে তিনি রোগী দেখছেন প্রায় এগারো বছর হয়ে গেল। এর আগে চেম্বার করতেন রাসবিহারীতে। ডাক্তার অর্ণব দাশগুপ্তর কনসালটেশনের বৈশিষ্ট্য হল উনি একদিনে শুধুমাত্র একজন রোগীকেই দেখেন। তার কথাই শোনেন। তার ওপরেই পুরোপুরি কনসেনট্রেট করেন। সেই জন্য ওঁর ফিজটাও বেশ চড়া।
ডাক্তার অর্ণব দাশগুপ্ত বিবাহিত। ওঁর স্ত্রী অনন্যা খুবই সুন্দরী ও ব্যক্তিত্বময়ী। অনন্যা বাইপাস কানেকটারের কাছে একটি নামকরা বেসরকারি স্কুলের সফল প্রিন্সিপাল। মোটিভেশনাল স্পিচের জন্যে অনন্যা খুবই বিখ্যাত। কিছু কিছু অভিভাবক এটা বিশ্বাস করেন যে, অনন্যার কথায় যেকোনো বেপথু পড়ুয়ার জীবন আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে। হয়তো এই কারণেই প্রতি বছর আইসিএসই এবং আইএসসিতে তাঁর স্কুলের ছেলেমেয়েরা ওপরের দিকে র্যাংক করে।
অর্ণব এবার নিজের কফির কাপে একটা লম্বা চুমুক দিলেন। তারপর খুব ঠান্ডা গলায় বললেন—দেখুন ম্যাডাম, আপনার যে জিনিসগুলো মনে পড়ছে না, সেগুলো তো আসলে আপনার মনের মধ্যেই কোথাও না কোথাও চাপা পড়ে রয়েছে। লুকিয়ে রয়েছে নানান স্মৃতির ফাঁকফোঁকরে। তাই আমাকে আপনার মনের মধ্যে নেমে দেখতে হবে যদি ওগুলো কোনোভাবে উদ্ধার করা যায়!
শ্রীপর্ণা মিত্র এই পর্যন্ত শুনে অবাক হয়ে বললেন—মনের মধ্যে নেমে মানে?
—মানে, আমায় চেষ্টা করতে হবে আপনার মনের মধ্যে ঢুকে পড়ে চারপাশটা একটু খুঁজে পেতে দেখতে।
—আচ্ছা! তা সেটা ঠিক কীভাবে ?
—আসলে মনের ভেতরের সব জায়গাগুলোতে তো ঠিকঠাক আলো পৌঁছয় না। সেখানে একটু হাতড়ে হাতড়ে খুঁজতে হবে।
—আমার মনের মধ্যে? হাতড়ে হাতড়ে! হাউ ক্যান ইট বি পসিবল ডক্টর দাশগুপ্ত? আশা করি, আপনি আমার সঙ্গে এটা নিয়ে মজা করছেন না!
—ও নো নো, এক্সট্রিমলি নট মিসেস মিত্র। এটা একটা সায়েন্টিফিক প্রসেস যার মধ্যে দিয়ে মানুষের মনের অবচেতনে থাকা কথা বা ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর ঝাপসা ভাব কেটে গিয়ে সেগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একে কেউ কেউ ‘থিওরি অব মাইন্ড’ নামের এক আদ্যিকালের তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু আমি এটাকে আমার ‘ডাইভার থিওরি’ দিয়েই এক্সপ্লেন করার চেষ্টা করি।
—ডাইভারস থিওরি?
—হ্যাঁ। ডাইভার মানে সোজা কথায় ডুবুরি। ডুবুরির মতো মানুষের মনের মধ্যে নেমে সেখানে তলিয়ে যাওয়া একগাদা স্মৃতিকে উদ্ধার করাই হল এই থিওরির মূল এসেন্স।
—কিন্তু আপনি আমার মনের মধ্যে ডুবুরি নামাবেন কী করে? এটা কি সেই স্টিফেন স্পিলবার্গের ‘ইনার স্পেস’ সিনেমার মতো একটা ফিক্সনাল এক্সপেরিমেন্ট নাকি?
—না মিসেস মিত্র। এটা প্রায় পুরোটাই একটা চিন্তাভাবনার সেতু, যেটা একজন মানুষের থেকে আরেকজন মানুষের মনের মধ্যে বাঁধা হয়ে থাকে। আর সেই সেতু বেয়ে এক-একটা লুকিয়ে থাকা বা হারিয়ে যাওয়া ভাবনা চলে আসে রিসেপ্টর মানুষটির ব্রেনে।
—তাহলে এটা তো এক ধরনের থট রিডিং প্রসেসে বলেই মনে হচ্ছে। আপনি এর মধ্যে হঠাৎ ডুবুরি নামানোর ভাবনাটা জুড়ে দিলেন কেন?
—ডুবুরি না নামলে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো খুঁজে বের করবে কে? আর আপনার মনের মধ্যে ওই সেতুর যে দিকটা রয়েছে, সেটাই বা কে তৈরি করবে মিসেস মিত্র?
—আপনি কি এর আগে কারওর মনের মধ্যে ডুবুরি নামিয়েছেন ডাক্তার দাশগুপ্ত?
—ও সিওর! অন্তত শ’খানেক মানুষের মনের মধ্যে ডুব দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে।
—আপনি কি প্রতিবারই সাকসেসফুল হয়েছেন?
—ওয়েল, এ ব্যাপারে আমার সাকসেস রেট আশি পারসেন্টের বেশি বলেই আমার মনে হয়।
—আশ্চর্য!
—আশ্চর্য নয় মিসেস মিত্র! আচ্ছা, আপনি কি কোনোদিন মফস্সল বা গ্রামের দিকের কোনো পুকুরে বা গেরস্ত বাড়ির কোনো পাতকুয়োয় ডুবুরি নামতে দেখেছেন?
—না তো।
এইবার ডাক্তার অর্ণব দাশগুপ্তের ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল।
—দেখলে বুঝতেন যে সেটা কত কঠিন আর তাতে কী সাংঘাতিক স্কিল লাগে।
শ্রীপর্ণা মিত্র ঘাড় নেড়ে বললেন—বুঝলাম।
—আমার দাদামশায়, মানে আমার মায়ের বাবাকে আমি এইভাবে ডুবুরি হয়ে পুকুরের নীচ থেকে পাড়া-প্রতিবেশীদের নানান হারানো জিনিস খুঁজে আনতে দেখেছি।
—মাই গড! আপনার নিজের দাদু!
—হ্যাঁ। নিজের। ছিপছিপে, লম্বা, টকটকে ফর্সা রং, একবুক ধবধবে সাদা দাড়ি। শুনেছি অল্প বয়েসে বাজি ধরে গঙ্গা এপার-ওপার করতেন।
—কিছু মনে করবেন না, মানে ওটা কি ওঁর প্রফেশন ছিল নাকি প্যাশন?
এবার ডাক্তার অর্ণব দাশগুপ্ত আবার একটু খুকখুক করে হাসলেন। তারপর বললেন—উনি ছিলেন সংস্কৃতের মাস্টারমশাই। বেলডাঙা উচ্চ বিদ্যালয়ে ছাত্রদের নিয়মিত সংস্কৃত পড়াতেন। একবার কিশোর বয়েসে ওঁর আপন কাকিমার একটি সোনার কানপাশা নাকি মেয়েদের স্নান করার পুকুরে ডুবে গিয়েছিল। কাকিমা বাড়ি ফিরে খুব কান্নাকাটি করছিলেন। তখন দাদু, একখানা লাল গামছা কোমরে মালকোঁচা দিয়ে বেঁধে, সারা গায়ে-মাথায় সর্ষের তেল মেখে সেই পুকুরে ডুব দিয়ে তার তলা থেকে কাকিমার সেই সোনার কানপাশা তুলে এনেছিলেন।
—বলেন কী!
—সেই থেকে কারওর কোনো দামি জিনিস পুকুরে ডুবে গেলেই আমার দাদুর ডাক পড়ত। উনি কিন্তু তার বিনিময়ে কিছু নিতেন না। দাদু খুব খেতে ভালোবাসতেন। তাই কেউ হয়তো সাত ভরির সোনার হার ফিরে পেয়ে বাড়িতে তৈরি ক’খানা নারকোল নাড়ু দিয়ে যেত। কেউ হয়তো সোনার দুল খুঁজে পেয়ে দিয়ে যেত বাড়ির গাছের এক কাঁদি ডাব বা এক ফানা কাঁঠালিকলা। সে বেলা দাদু কিন্তু না করতেন না।
—এইভাবে জলে ডুব দিতে গিয়ে ওঁর কখনো কোনো বিপদ হয়নি?
—হয়েছিল তো! একবার গ্রামের একটি মেয়ে গলায় দড়ি-কলসি বেঁধে আত্মহত্যা করবে বলে পুকুরে ডুব দিয়েছিল। দাদু তখন ছাত্র পড়িয়ে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন। পুকুরঘাটে হইহই শুনে দৌড়ে গিয়ে ধুতি-ফতুয়া পরা অবস্থাতেই জলে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। সেদিন পুকুরের একদম নীচের ঘন পাতাঝাঁঝিতে দাদুর পা নাকি ফেঁসে গিয়েছিল। পুকুরঘাটে জড়ো হওয়া মানুষদের মধ্যে সেদিন আমার দিদিমাও ছিলেন। জলে ডুব দেওয়ার পর যখন প্রায় মিনিট পাঁচেক কেটে গেছে অথচ দাদু উঠছেন না, তখন আমার দিদিমা ঘাটের কাছে দাঁড়িয়ে—‘ওগো শুনছ, এবার উঠে এসো!’ বলে বেশ কয়েকবার চিৎকার করেছিলেন। আর সেই চিৎকারেই নাকি গায়ে বল পেয়ে দাদু ঝাঁঝি-টাঝি সব ছিঁড়ে আধমরা মেয়েটির নড়া ধরে জলের ওপরে ভেসে উঠেছিলেন।
—বাবা, এ তো রীতিমতো থ্রিলিং ব্যাপার!
—হ্যাঁ, কিছুটা তো বটেই। আচ্ছা, এবার আমরা আমাদের সেশনের প্রায় শেষ দিকে চলে এসেছি। আপনি যদি পারমিশন দেন তাহলে আমি এবার আপনার মনের মধ্যে একটা ডুব দিয়ে সেখানে লুকিয়ে থাকা আপনার অজানা প্রশ্ন দুটোর উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করব। তবে সেটা যে পাবই তার কোনো গ্যারান্টি নেই। আপনি কি সেটা চাইবেন ম্যাডাম?
শ্রীপর্ণা মিত্র কী যেন চিন্তা করলেন কয়েক সেকেন্ড। তারপর বললেন—ইয়েস ডক্টর দাশগুপ্ত, প্লিজ ক্যারি অন!
—ওকে ম্যাডাম। বলে ডাক্তার অর্ণব দাশগুপ্ত ইন্টারকম টেলিফোন টিপে নিজের পিএ-কে জিজ্ঞেস করলেন—মিস মনিকা,
আমার ডাইভিং শুট রেডি তো?
—হ্যাঁ স্যার। চেঞ্জ রুমে আমি সব গুছিয়ে রেখে এসেছি।
—ভেরি গুড।
তারপর কিছুটা অবাক শ্রীপর্ণা মিত্রের দিকে তাকিয়ে বললেন—ম্যাডাম, আপনি জাস্ট দু’মিনিট ওয়েট করুন। আমি এক্ষুনি আসছি।
শ্রীপর্ণা মিত্র লক্ষ করলেন, ডাক্তার দাশগুপ্ত দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সারা ঘরের আলোর রং ওয়ার্ম ইয়ালো থেকে সমুদ্রের মতো স্বচ্ছ নীল হয়ে গেল। আর সেই সঙ্গে ব্যাকগ্রাউন্ডের প্যানফ্লুটের আওয়াজ বদলে গিয়ে ভেসে আসতে লাগল নূপুরের মতো খুব মৃদু রিনরিনে একটা শব্দ আর তার সঙ্গে সমুদ্রের ঢেউয়ের পারে আছড়ে পড়ার চাপা আওয়াজ। একটা-দুটো নাম না জানা সামুদ্রিক পাখির ডাকও ভেসে আসতে লাগল সেই সঙ্গে। এইভাবে কিছুক্ষণ চলার পর প্রায় নিঃশব্দে একটি দরজা খুলে ঘরে ঢুকে এলেন ডাক্তার অর্ণব দাশগুপ্ত। সেই আবছা আলোতেও তাঁর সারাটা আদুল গা এখন সর্ষের তেল মাখায় চকচক করছে। আর পরনে রয়েছে প্রায় হাফপ্যান্টের মতো করে গুটিয়ে পরা একটি লাল গামছা—যার কাপড়টি ফ্লোরেসেন্ট কালারের মতো চিকচিকে।
শ্রীপর্ণা মিত্র সেই অদ্ভুত পোশাকে ডাক্তার দাশগুপ্তকে দেখে কেমন যেন ভেবলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে কথা বলার কোনো সুযোগ না দিয়ে ডাক্তারবাবু সোজা এসে তাঁর রিভলভিং চেয়ারে বসে পড়লেন। তারপর হাসিমুখে বললেন—ম্যাডাম, এবার আপনার অনুমতি নিয়ে আমি আপনার মনের গভীরে ডুব দেব। আপনি অনুগ্রহ করে নড়াচড়া না করে একটু স্থির হয়ে বসুন আর আমার চোখ দুটোকে একদৃষ্টে লক্ষ করতে থাকুন।
শ্রীপর্ণা মিত্রর হঠাৎ কেমন যেন একটু শীতশীত করতে লাগল। মনে হল খুব কাছে বুঝি কোনো জলের উপস্থিতি রয়েছে। একটা তন্দ্রার মতো ভাব যেন ঘিরে ধরল তাঁকে।
এদিকে ডাক্তার অর্ণব দাশগুপ্ত ততক্ষণে ডুব দিয়েছেন শ্রীপর্ণা মিত্রের মনের ভেতরে। প্রথমটায় একটু ঠান্ডা লাগলেও তারপর সেটা গা-সওয়া হয়ে গেল তাঁর। আরো কিছুটা গভীরে নামতে মনে হল যেন একটা বিয়েবাড়ির মধ্যে এসে পড়েছেন, যার ভেতরের একটা ঘরে কনে সেজে নিজের বান্ধবীদের সঙ্গে বসে রয়েছেন শ্রীপর্ণা। চারপাশে লোকজন উঁচু গলায় কথা বলছে, হাসিঠাট্টা করছে। হঠাৎ একটা নীলরঙা বিশাল বড়ো গাড়ি বিয়েবাড়িটার একদম সামনে এসে থামল। গাড়ির দরজা খুলে নেমে এলেন একজন বয়স্ক ভারিক্কি মানুষ। তারপর ভেসে এল তাঁর গলার গম্ভীর আর কর্কশ আওয়াজ।
—তোমাকে বলেছিলাম না আমাদের বংশের একটা আলাদা মর্যাদা আছে। অন্য জাতের কোনো মেয়েকে আমাদের বংশের কেউ কখনো বিয়ে করেনি। এসব জেনেশুনেও তুমি আমাদের না জানিয়ে এই মেয়েটাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছ!
এবারে শোনা গেল একজন ঝকঝকে তরুণের গলা। সে গাড়ির আওয়াজে বরবেশেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছিল বাড়ির বাইরে।
—আমি তো তোমায় জানিয়েছিলাম বাবা, শ্রীপর্ণাকে ছাড়া আমি আর কাউকে বিয়ে করতে পারব না।
—তাহলে জয়, এটাই কি তোমার শেষ সিদ্ধান্ত?
এরপর আর কারও কথাই ঠিক করে শোনা গেল না। একটা গাড়ি যেন বিশাল জোরে হর্ন বাজিয়ে, অনেকটা ধুলো উড়িয়ে চোখের আড়ালে চলে গেল।
ডাক্তার অর্ণব দাশগুপ্ত দেখলেন ভেতরের ঘরে কনের সিংহাসনে বসে শ্রীপর্ণা মিত্র হঠাৎ যেন সংজ্ঞাহীন হয়ে এলিয়ে পড়েছেন একধারে। বন্ধুরা তাঁর চোখে-মুখে জলের ছিটে দিচ্ছে, বাতাস করছে। খবর পেয়ে নতুন বর জয়দীপ ভট্টাচার্য নিজেই চলে এসেছেন তাঁর কাছে। শ্রীপর্ণাকে এখন ধরে ধরে বিয়ের মণ্ডপের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
সপ্তপদী পর্যন্ত দেখে ডাক্তার অর্ণব দাশগুপ্ত সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সাঁতরে ঢুকে পড়লেন শ্রীপর্ণা মিত্রের মনের আরেকটি খোপে। সেখানে তখন একটা সারাদিনের পিকনিক প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। শ্রীপর্ণার হাজবেন্ড জয়দীপের বন্ধুরা সবকিছু গুছিয়ে আস্তে আস্তে উঠে পড়ছেন যে যার নিজের গাড়িতে। জয়দীপের গাড়িতে শ্রীপর্ণার সঙ্গে উঠছেন ওর মা ও বাবা। জয়দীপ বসেছেন সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে। ভেতরে একদম বাঁ দিকে শ্রীপর্ণা, মাঝখানে ওর বাবা আর একদম ডানদিকে বসেছেন ওর মা। বেশ কিছুটা যাওয়ার পর উলটোদিক থেকে আসা একটা মাল বোঝাই লরি ওদের গাড়িকে আচমকা চেপে দিতেই রাস্তার ধারের ঝুরো খোয়ায় পিছলে গেল তার ডানদিকের চাকা। পালটি খেতে খেতে নামতে লাগল বেশ কিছুটা নীচে থাকা ধানিজমির দিকে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে ডাক্তার দাশগুপ্ত শুধু শ্রীপর্ণার তীক্ষ্ণ চিৎকারটুকুই শুনতে পেয়েছিলেন। পিছনের দুটো গাড়ি থেকে বন্ধুরা নেমে এসে যখন ওদের গাড়ি থেকে বের করল তখন শ্রীপর্ণা অক্ষত থাকলেও সংজ্ঞা হারিয়েছেন। গাড়ি থেকে বের করতে গিয়ে অনেকখানি ছিঁড়ে গেল ওঁর শাড়ির আঁচল। মায়ের কপালের ডান দিক, ডান কাঁধ আর পা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। বাবার চোট লেগেছে বুকের ডান দিকে আর ডান পায়ে। জয়দীপ আর সামনে বসা ড্রাইভারের গায়ের দু’তিন জায়গা কেটে-ছড়ে গেলেও আঘাত তেমন গুরুতর নয়। সেখান থেকে ওঁদের সরাসরি নিয়ে যাওয়া হল কাছের একটা বেসরকারি হাসপাতালে। গাড়ির সামনে বসা দু’জনকে আর শ্রীপর্ণার বাবাকে সঙ্গে সঙ্গে ফার্স্ট এড দেওয়া হল। শ্রীপর্ণার জ্ঞান ফিরল প্রায় দু’দিন পরে। ওর মায়ের শরীরের ন’জায়গায় আঘাত লাগা সত্ত্বেও তিনি সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলেন। তিনটে অপারেশনের পরে এখন তাঁর হাঁটাচলা মোটামুটি স্বাভাবিকের দিকে।
এইসব খুব মন দিয়ে দেখার পর ডাক্তার অর্ণব দাশগুপ্ত বুঝতে পারলেন যে, তাঁর দম এবার ফুরিয়ে আসছে। সুতরাং শ্রীপর্ণার মনের ভেতর থেকে তাঁকে এবার হুস করে উঠে আসতে হবে। তাই তিনি তাড়াতাড়ি সেই মনের গায়ে লেগে থাকা ভয় আর আতঙ্কের সবজেটে শ্যাওলা দু’হাতে ঘষে-মেজে পরিষ্কার করতে লেগে গেলেন। কিন্তু শ্রীপর্ণার মনের নীচে চাপা পড়ে থাকা আলোছায়ার বেশ কিছু ফাঁকফোকর তাঁকে এখনও আকর্ষণ করে চলছিল। উঠে পড়বেন, না আরেকটু থাকবেন—এই দোলাচল যখন তাঁর মনের মধ্যে তখন খুব কাছ থেকে নিজের গিন্নি অনন্যার গলার সেই বিখ্যাত মোটিভেশনাল কথাগুলি শুনতে পেলেন। ‘ওগো শুনছ, এবার উঠে এসো!’ ‘ওগো শুনছ, এবার উঠে এসো!’—আর এটা শুনেই তিনি যেন একটি দক্ষ ডলফিনের মতো সাঁ করে বেরিয়ে এলেন মিসেস শ্রীপর্ণা মিত্রের মনের মধ্যে থেকে। এটা আসলে ডাক্তার অর্ণব দাশগুপ্তর মোবাইল ফোনের একটা টাইমার অ্যালার্ম, যা একটা নির্দিষ্ট সময় পরে বারে বারে বেজে উঠে তাঁকে সতর্ক করে দেয়, অন্যের মনের গভীরে ডুবে থাকার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে বলে।
সারা গায়ে জল মাখা ডাক্তার অর্ণব দাশগুপ্ত নিজের চেঞ্জ রুমের দিকে দ্রুত হেঁটে যেতে যেতে দেখলেন, শ্রীপর্ণা এখন চেয়ারে ঘাড় হেলিয়ে অঘোরে ঘুমিয়ে রয়েছেন। আর তাঁর পাশে সতর্ক প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছেন তাঁর বিশ্বস্ত পিএ মিস মনিকা মণ্ডল।
চোখাচুখি হতেই মিস মনিকা, ডাক্তার দাশগুপ্তর দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে নিজের ডান হাতের বুড়ো আঙুল উঁচু করলেন। কারণ তিনি জানেন, ঘুম ভাঙলেই মিসেস শ্রীপর্ণা মিত্রের সমস্ত হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি একেবারে সিনেমার মতো মনে পড়ে যাবে।