


সোমব্রত সরকার: অক্ষয় শব্দের অর্থ যা ক্ষয় হয় না, অর্থাৎ অক্ষয় তৃতীয়ার দিন যা কিছু শুভ কাজ করা হয়, তা অক্ষয় হয়ে থাকে। এই কারণে এই দিন নানা প্রকার শুভ কাজ করার বিধান শাস্ত্রে দেওয়া আছে। কারণ চান্দ্রমাসের তিথি নির্ধারণ করেই দেখা গিয়েছে যে, পৌরাণিক যুগে অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে নানা প্রকার শুভ কাজের সূত্রপাত ঘটেছিল। এই দিন বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই দিন মহাভারত রচনা শুরু হয়। অক্ষয় তৃতীয়ার দিনই পরশুরাম জয়ন্তী, দেবী ধূমাবতী, অন্নপূর্ণা দেবী ও গঙ্গাদেবীর আবির্ভাব তিথি। এই দিন মহাদেবকে তপস্যায় সন্তুষ্ট করে অতুল ধনসম্পদ অর্থাৎ অফুরন্ত ঐশ্বর্য প্রাপ্তির বর লাভ করেছিলেন কুবের। এই দিনে কেদারনাথ, বদ্রীনাথ, গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রী, যে মন্দিরের দরজা ছ’মাস বন্ধ থাকে, তাদের দ্বার খোলা হয়। এই দিন শ্রীকৃষ্ণের চন্দন যাত্রা শুরু হয়েছিল।
মৎস্যপুরাণে বলা হয়েছে, অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে দানকর্ম, হোম, জপ বা যেকোনো শুভ কর্মের ফল অক্ষয় বা চিরস্থায়ী হয়, অর্থাৎ এই কর্মের ফল কখনোই ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। এদিন কুবের শিবের আরাধনা করে অতুল ঐশ্বর্য ও সম্পদের অধিকারী হন। প্রয়াত পিতৃপুরুষদের এদিন জলদান বা তর্পণ করলে তাঁরা সন্তুষ্ট হন।
স্কন্দপুরাণে অক্ষয় তৃতীয়াকে ঐশ্বরিক আশীর্বাদের দিন হিসেবে বর্ণনা হয়েছে ইন্দ্রদেবের উপাখ্যানের মাধ্যমে। দেবতাদের রাজা ইন্দ্র এক ঋষির স্ত্রীর সঙ্গে শয়ন করার জন্য লজ্জিত হয়ে এবং সেই ঋষির অভিশাপের ভয়ে মেরুপর্বতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর এই কুকর্মের ফলে তিনি তাঁর শক্তি ও মর্যাদা হারান। ইন্দ্র যখন একটি গুহায় লুকিয়েছিলেন, তখন দৈত্যরা স্বর্গ দখল করে নেয়। ইন্দ্রের প্রত্যাবর্তনের জন্য ব্যাকুল দেবতারা বৃহস্পতি গ্রহের অধিপতি বৃহস্পতির সাহায্য প্রার্থনা করেন। বৃহস্পতির পরামর্শে ইন্দ্র অক্ষয় তৃতীয়ায় বিভিন্ন আচার- অনুষ্ঠান ও দান-খয়রাত করেন, যার পরে তিনি তাঁর ঐশ্বরিক শক্তি ফিরে পান, দৈত্যদের পরাজিত করেন এবং স্বর্গে শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপন করেন।
জৈনদের চব্বিশজন তীর্থঙ্করের মধ্যে প্রথম হলেন ঋষভনাথ। অক্ষয় তৃতীয়া প্রথম তীর্থঙ্কর মুক্তির পথ স্থাপনকারী ত্রাণকর্তা ঋষভনাথ বা বৃষরাজের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে চিহ্নিত করে। এই দিনে তিনি এক রাজার দেওয়া আখের রস পান করে তাঁর এক বছরব্যাপী উপবাস ভঙ্গ করেছিলেন। এই ঘটনা থেকেই এই দিনে ভিক্ষু এবং অভাবী মানুষদের খাদ্য ও জীবনধারণের ব্যবস্থা করার প্রথার উদ্ভব হয়।
ভারতজুড়ে অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে উৎসব পালিত হয় এবং প্রতিটি অঞ্চল নিজস্ব উপায়ে দিনটি পালন করে। বৃন্দাবনে অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে বাঁকেবিহারী মন্দিরের ভক্তদের কৃষ্ণমূর্তির চরণ দর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়, যা বছরের বাকি সময় ঢাকা থাকে। মহারাষ্ট্রের মুম্বাদেবী মন্দিরে অক্ষয় তৃতীয়া উদযাপনের সময় আলফানসো আম দিয়ে উৎসবের নৈবেদ্য ও মন্দির সজ্জা করা হয়। মহারাষ্ট্রের বিবাহিত মহিলারা একে অপরকে হলদি ও কুমকুম অর্পণ করেন এবং তাঁদের স্বামীদের দীর্ঘ জীবনের জন্য দেবী গৌরীর কাছে প্রার্থনা করেন। পশ্চিমবঙ্গে বণিক ও ব্যবসায়ীরা সিদ্ধিদাতা গণেশ ও মা লক্ষ্মীর পুজো করেন এবং হালখাতা পালন করেন। যেখানে নতুন হিসাবের খাতা খোলা হয়, যা একটি আর্থিক সূচনার প্রতীক। তামিলনাড়ুতে বিষ্ণু মন্দিরগুলিতে বিশেষ প্রার্থনা হয়; যেখানে ভক্তরা ব্রাহ্মণদের দান ও খাদ্য নিবেদন করেন। তামিলনাড়ুর ভিলানকুলামের অক্ষয়পুরেশ্বর মন্দিরে অক্ষয়পুরীশ্বর শিবের এইদিন বিশেষ পুজো হয়।
অক্ষয় তৃতীয়া শুভকর্মের বিশেষ মাঙ্গলিক তিথি। কর্মে, সাফল্যে, যশে, উন্নতিতে, খ্যাতিতে, সম্পদে চির-ভাস্বর হওয়ার জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষই এ দিনটি খুবই শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে পুজো, ব্রত, দান, অর্চনা, প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত করেন।