


সুনীতি বন্দ্যোপাধ্যায়: বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিটি অক্ষয় তৃতীয়া নামে বিশেষ করে হিন্দু ও জৈন ধর্মালম্বীদের কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি তিথি। এটি এমন এক তিথি যে এর মাহাত্ম্য বলে শেষ করা যায় না। যেমন— বিষ্ণুর দশটি অবতারের মধ্যে ষষ্ঠ অবতার অর্থাৎ পরশুরাম এই তিথিতে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেইজন্য এই তিথিকে পরশুরাম জয়ন্তী বলা হয়। সিদ্ধিদাতা গণেশ মহর্ষি বেদব্যাসের সহযোগিতায় মহাভারত লিখতে শুরু করেছিলেন। এই দিন সত্য যুগের শেষ দিন, ত্রেতা যুগের সূচনা হয়েছিল। রাজা ভগীরথ গঙ্গা দেবীকে মর্তে নিয়ে এসেছিলেন। কুবেরের তপস্যায় মহাদেব সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে অতুল ঐশ্বর্য দান করেছিলেন। কুবের এই দিন লক্ষ্মীলাভ করেছিলেন বলেই এই দিন বৈভব লক্ষ্মীরও পুজো করা হয়ে থাকে। আবার পুরীতেও জগন্নাথদেবের রথ নির্মাণ শুরু হয় এই তিথিতে।
‘অক্ষয়’ শব্দের অর্থ যার ক্ষয় নাই। এই দিন কোনো শুভকার্য অনুষ্ঠান করলে তা চিরকাল অক্ষয় থাকে। কেদারনাথ ও বদ্রীনাথদেবের মন্দির ছ’মাস বন্ধ থাকার পর, এই দিনে দ্বার খোলা হয়। এই দ্বার বন্ধের সময় মন্দিরের গর্ভগৃহের ভেতরে একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে আসা হয়, ছ’মাস পরে দ্বার খুলে দেখা যায় সেই প্রদীপ তখনও জ্বলছে।
এই দিন হিন্দুধর্মাবলম্বীরা সোনা, রুপো, তামা, পিতলের বাসনও কিনে থাকেন। তাঁরা মনে করেন এইদিনে গহনা, রত্ন কিনলে সেই কেনার ক্ষমতা তাদের অক্ষয় থাকবে, আর টাকা-পয়সার অভাবও হবে না।
অক্ষয় তৃতীয়া চিরস্থায়ী সমৃদ্ধি, বৈভব ও মঙ্গলের দিন হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি নতুন সূচনা বিনিয়োগ ও দাতব্য কাজের জন্য উপযুক্ত।
অক্ষয় তৃতীয়া আকাতি বা আকা নামেও পরিচিত। এই সময় সূর্য মেষ রাশিতে অবস্থান করে এবং চন্দ্র বৃষ রাশিতে রোহিণী নক্ষত্রে অবস্থান করে। এই সংযোগ সর্বোচ্চ শুভশক্তি নিশ্চিন্ত করে। যা নতুন উদ্যোগ শুরু করার জন্য একটা আদর্শ সময়ে হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দিন ভগবান গণেশ, বিষ্ণু, মা লক্ষ্মী, কুবেরের পুজো করা হয়।
মাতা পার্বতীর অবতার দেবী অন্নপূর্ণা অক্ষয় তৃতীয়ায় অভাবীদের অন্ন জোগান, যা পুষ্টির দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর গুরুত্ব বোঝাতে ভগবান শিব ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে মা অন্নপূর্ণার কাছ থেকে অন্ন প্রার্থনা করেছিলেন।
এই দিন ভগবান কৃষ্ণ দ্রৌপদীকে তাঁদের বনবাস কালে যাতে অন্নের অভাব না হয় সেজন্য একটি তামার পাত্র দান করেছিলেন।
এই দিন মানবজাতিকে শুদ্ধ করার জন্য পবিত্র গঙ্গা নদী পৃথিবীতে অবতরণ করেছিলেন।
এই দিনে যে শুভ কাজের সূচনা করা হয় তা মানুষের জীবনের সমৃদ্ধি ও বৈভব দান করে। বিভিন্ন অঞ্চল ভেদে সারা ভারতে অক্ষয় তৃতীয়া পালন করা হয়।
ওড়িশাতে অক্ষয় তৃতীয়ার দিন রথ নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। ২১ দিন ব্যাপী চন্দনযাত্রা উৎসবের সূচনা হয়।
এই একটি মাত্র দিনে বৃন্দাবনে ভক্তদের উদ্দেশে বাঁকেবিহারীজির চরণ দর্শন করা যায়। সারাবছর কোনোদিনই রাধার পা দেখা যায় না। কিন্তু এই দিনে ভক্তদের আশীর্বাদের জন্য বাঁকেবিহারীজির চরণ উন্মোচন করা হয়।
মহারাষ্ট্রের মহিলারা এইদিন দেবী গৌরীকে পুজো করেন এবং সবার সঙ্গে হলুদ ও কুমকুম বিনিময় করেন। পশ্চিমবঙ্গে এই দিন নতুন ব্যবসার সূচনা ও নতুন খাতা খোলা, লক্ষ্মী-গণেশের পুজো হয়।
পূর্ব ভারতে এই দিনটা ফসল কাটার মরশুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভালো ফসলের জন্য প্রার্থনা করা হয় প্রকৃতিদেবীর কাছে।
ব্যবসার সমৃদ্ধির জন্য এই দিন হালখাতা সূচনা লক্ষ্মী-গণেশের পুজো করা হয়।
এই দিন জৈনদের একটা পবিত্র স্মৃতি হিসেবে ধরা হয় এবং তাঁরা এই দিনে আখের রস পান করে উপবাস ভাঙেন।
বনবাসের সময় পঞ্চপাণ্ডবদের আশ্রমে অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে অতিথি হয়ে ঋষি দুর্বাসহ অনেক মুনি ঋষিরা এসেছিলেন। কিন্তু তখন পাণ্ডবরা ভিক্ষা করে দিন গুজরান করতেন। শ্রীকৃষ্ণের দেওয়া একটি বাটি দিয়ে দ্রৌপদী যে যাত্রায় রক্ষা পেয়েছিলেন। বাটিটি এমনই ছিল যে যতক্ষণ খাদ্য পরিবেশন করা হবে ততক্ষণ এই বাটির খাবার শেষ হবে না। কৃষ্ণের সাহায্যে পাণ্ডবরা ক্রুদ্ধ ঋষি দুর্বাসার অভিশাপ থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন।
বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরামের জন্মদিন বলে হিন্দু ও ঋষি ব্যাসদেব গণেশকে এই দিন মহাভারত শোনান এবং গণেশ মহাভারত লিখতে শুরু করেন।
গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রী মন্দির এইদিন খোলা হয়। অক্ষয় তৃতীয়ার অভিজিৎ মুহূর্তে মন্দির খোলা হয়। অক্ষয় তৃতীয়ার দিন কৃষ্ণ এবং সুদামার পুনর্মিলন এবং মহাভারতের যুদ্ধের সমাপ্তিও ঘটেছিল।
আজ অক্ষয় তৃতীয়া। এই দিনে সোনা রুপোর রত্ন গহনা কেনার শুভ মুহূর্ত রবিবার অর্থাৎ ১৯ এপ্রিল ২০২৬ সকাল ১০টা ৪৯ মিনিট এবং তার পরের দিন সোমবার ২০ এপ্রিল ২০২৬ ভোর ৫টা ৫১ মিনিট পর্যন্ত চলবে। অর্থাৎ রবিবার সারাদিন কেনার শুভ মুহূর্ত থাকছে।
এইদিন কেনাকাটার সঙ্গেও পুজোপাঠ, বৈভব লক্ষ্মীর আরাধনা, হোম যজ্ঞ, পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে অর্ঘ্য নিবেদন এবং দান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
অক্ষয় তৃতীয়ার দিন দান করিলে দান সহস্রগুণ পুণ্য বৃদ্ধি করে। এই দিন দান করলে লক্ষ্মী দেবী প্রসন্ন হন। দাতার ঘর সুখ সমৃদ্ধি ও ধন বৈভব বৃদ্ধি পায়
এই দিন পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে দান করলে তাঁদের পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ মেলে। কারও কুণ্ডলীতে যদি পিতৃদোষ থাকে তা থেকে মুক্তিও পাওয়া যায়।
এই দিন দানে জন্মকুণ্ডলীর গ্রহের যে ফাঁড়া থাকে সেগুলো থেকে আপনি মুক্তি পাবেন বিশেষ করে চন্দ্র ও শুক্রের কুদৃষ্টি থেকে মুক্তি সম্ভব।
এই দিন অন্নদানও সবচেয়ে পুণ্য বলে মানা হয়, এতে ঘরে অন্নের কোনো অভাব থাকে না। গরিব ও অসহায় ব্যক্তিকে বস্ত্র দান, গুড় দানে ভাগ্য প্রবল হয়, সূর্যদেব দাতার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন।
সৈন্ধব লবণ দানে কেতুর অশুভ শক্তি বিনাশ আদি ভৌতিক ক্রিয়া থেকে কেউ যদি কোনো ক্রিয়া করে থাকে তার থেকে মুক্ত হওয়া যায়। এটি ধূমাবতী দেবীর আবির্ভাব তিথি।
সাদা বস্তু অর্থাৎ দুধ, দই, চিনি, শাঁখা, সাদা কাপড় এইসব দানে অনন্ত পুণ্য লাভ হয়। সোনা, রুপো, রত্ন, তিল, ছাতা, পাখা, কলসি, গাভী দানে বিশেষ মহত্ত্ব আছে।
অক্ষয় তৃতীয়ার দিন এই দানের সঙ্গে ভগবান বিষ্ণু ও বৈভব লক্ষ্মীর পুজো করুন। এই দিন এমন কোনো জিনিস দান করবেন না, যা আপনি ব্যবহার করেন না।
বিবাহিত মহিলাকে সিঁদুর-আলতা দান অত্যন্ত শুভ মানা হয়। মন্দিরে মরশুমের ফল দান করুন।
অক্ষয় তৃতীয়ার দিন রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তি প্রতিষ্ঠা করুন। গণেশ ও বৈভব লক্ষ্মীর পুজো করুন। তাদের চরণে সিঁদুর ও চন্দনের ফোঁটা দিন। ব্রাহ্মণকে জল, পাখা, বস্ত্র, চন্দন, নারকেল এবং অন্নদান করুন।
এই দিন দানে এবং কেনায় চিরস্থায়ী সম্পদ ও বৈভব সূচনা করে সেই জন্য এই দিন সোনা কেনার বিশেষ রীতি আছে।
দরিদ্র অসহায় ব্যক্তি যারা রাস্তায় বসবাস করে তাদের খাদ্য দেওয়ার অর্থ হল আপনার পুষ্টি নিশ্চিন্ত করা। নিঃসহায় দরিদ্র ব্যক্তি যারা রাস্তায় থাকা-খাওয়া করে তাদের বস্ত্র দেওয়ার উদ্দেশ্য হল দাতার ঘুমকে নিশ্চিন্ত করা।
বিভিন্ন এনজিও সংস্থা যারা অসহায় ব্যক্তিদের দেখাশোনা করে সেখানে আপনার ঘরের অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় ওষুধ দান করার অর্থ হল পরিবারের মানুষকে নীরোগ ও সুস্থ রাখা সূচনা করে।
কাউকে নোংরা জামা কাপড় দান করবেন না, লোককে পরিষ্কার কাপড় দান করুন এতে আপনার সুস্থতা ও শ্রীবৃদ্ধি হয়।
দানই হল সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। বস্ত্র দানে ঘুম, জ্ঞান দানে মোক্ষ, ওষুধ দানে সুস্থতা, আর অভয় দানে নিরাপত্তা লাভ হয় দাতার।
এবার দেখা যাক দ্বাদশ রাশির কী কী করা উচিত।
মেষ রাশি: সূর্য প্রণাম ও পুজো করুন। লাল বস্ত্র কিনুন/ দান করুন। মিষ্টি খাওয়ান, বাড়ির জন্য অর্থ বিনিয়োগ করুন।
বৃষ রাশি: লক্ষ্মী ও বিষ্ণুর পুজো করুন। সাদা বস্ত্র, সাদা খাদ্য দান করুন। দেবতাকে সাদা চন্দন লেপে দিন, রুপোর গহনা, বাসন কিনুন। গোরুকে গুড় খাওয়ান, গবাদি পশু ক্রয় করুন।
মিথুন রাশি: ভাই-বোনের জন্য কিছু কিনুন। দুঃস্থ অথবা অনাথ শিশুদের সাধ্যমতো দান করুন। মাছকে খাওয়ান। বই কিনুন, ঘোড়াকে খাওয়ান।
কর্কট রাশি: মায়ের জন্য উপহার আনুন। লাল/সাদা বস্ত্র দান করুন। শাঁখা, দই, দুধ, চিনি দান করুন। ভিক্ষুককে খাওয়ান, নারকেল দান করুন।
সিংহ রাশি: পিতা অথবা গুরুজনদের জন্য কিছু কিনুন। লাল বস্ত্র দান করুন। অনাথ আশ্রমে ফল দান করুন। রেশম/পশম বস্ত্র পরিধান করুন।
কন্যা রাশি: অনাথ শিশুদের জন্য ওষুধ, খাবার দান করুন। বাচ্চাদের মারা থেকে বিরত থাকুন। পুজোর সামগ্রী কিনতে পারেন।
তুলা রাশি: মা লক্ষ্মী, ভগবান কুবেরের পুজো করুন। হলুদ বস্ত্র, হলুদ মিষ্টি দান করুন। রুপোর ত্রিশূল, রুপোর বেলপাতা মন্দিরে দান করুন। রুদ্রাক্ষ পরিধান করতে পারেন।
বৃশ্চিক রাশি: ভূতনাথ শিবের পুজো করুন। শ্মশানস্থিত ব্যক্তিকে কিছু দান করুন। কুকুরকে কিছু খাওয়ান। সাদাবস্ত্র সাদা খাদ্য দ্রব্য দান করুন।
ধনু রাশি: গুরুদেব, মঠ, আশ্রমে দান করুন। ধর্মগ্রন্থ কিনুন, ভাগবত পাঠ করুন, সু-পরামর্শ দিন।
মকর রাশি: পিতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের কিছু দান করুন, মাছ ও জলজ প্রাণীদের কিছু খেতে দিন। অভাবীদের অন্ন-বস্ত্র ও জল দান করুন।
কুম্ভ রাশি: বৃদ্ধাশ্রম ও অনাথ আশ্রমের আবাসিকদের ফল, মিষ্টি দান করুন। গ্রন্থাগারে ভালো বই দান করুন।
মীন রাশি: জলসত্র খুলুন, জল, মিষ্টি, গুড় দান করুন। জলজ প্রাণীদের কিছু খেতে দিন। হলুদ বস্ত্র দান করুন।