Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / বিশেষ ক্রোড়পত্র

বাঙালির লক্ষীসাধনা

প্রাচীন যুগে কৃষিকাজ, কুটিরশিল্পের পাশাপাশি বণিকবৃত্তিকে অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ করেছে বাঙালি। বাঙালি বণিক সাগর পাড়ি দিয়েছে। ব্রহ্মদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ইন্দোচীনে গিয়েছে।

বাঙালির লক্ষীসাধনা
  • ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু বসু: প্রাচীন যুগে কৃষিকাজ, কুটিরশিল্পের পাশাপাশি বণিকবৃত্তিকে অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ করেছে বাঙালি। বাঙালি বণিক সাগর পাড়ি দিয়েছে। ব্রহ্মদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ইন্দোচীনে গিয়েছে। তাম্রলিপ্ত বন্দর-নগরীর সমৃদ্ধির কথা আমরা জানি। নীহাররঞ্জন রায় লিখেছেন, ‘...প্রাচীন বাঙলার লক্ষ্মী ব্যবসা-বাণিজ্য-নির্ভর ছিলেন বেশি...’।

Advertisement

মধ্যযুগে এসে দেখছি মঙ্গলকাব্যের নায়ক সওদাগর। চাঁদ, ধনপতি, শ্রীমন্ত। সপ্তডিঙ্গা নিয়ে তাঁরা চলেছেন বাণিজ্য অভিযানে। বাঙালির রক্তে ব্যবসা নেই একথা যেমন ঠিক নয়, তেমনই এই সত্য স্বীকার করতে কুণ্ঠা নেই যে, বাণিজ্য বসতে লক্ষ্মী —এ কথায় কোনো যুগেই আম বাঙালির তেমন প্রত্যয় হয়নি। 
রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন, ‘...ব্যবসা-বাণিজ্যের খুব প্রচলন থাকিলেও বাংলায় কৃষিই ছিল জনসাধারণের উপজীব্য...।’ অর্থাৎ বাংলায় কৃষিজীবী মানুষের তুলনায় বণিকেরা বরাবরই সংখ্যালঘু। 
কৃষিকাজ প্রাধান্য পেয়েছে বাংলায়। সেটা সঙ্গত কারণেই। এ দেশের মাটি সরস। জল পর্যাপ্ত। এখানে সামান্য আয়াসেই সোনার ফসল ফলে। সহজেই গোটা পরিবারের সংবৎসরের আহার জুটে যায়। তাছাড়া বাঙালি তেমন উচ্চাকাঙ্ক্ষী নয়। খেয়ে-পরে জীবনটা একরকম বয়ে গেলেই হল। আজও বাঙালি এই আদর্শে যেন অটল। 
ভূমি আশ্রিত জীবনে নিরাপত্তা অনেক বেশি। তুলনায় ব্যবসা-বাণিজ্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। আদি ও মধ্যযুগে সমাজের চোখে বাণিজ্যের চেয়ে কৃষিকাজই গৌরবজনক বৃত্তি বলে স্বীকৃত ছিল। বণিকদের দেখা হত একটু খাটো চোখে। এইসব নানাকারণে বৃহত্তর বাঙালি সমাজ হয়তো বাণিজ্যের প্রতি তেমন আকৃষ্ট হয়নি।  
তবুও লক্ষ্মীলাভের আশায় বাণিজ্যে ব্রতী হয়েছেন এক শ্রেণির বাঙালি। সব যুগেই। অনিশ্চয়তাকে উপেক্ষা করে মেতেছেন লক্ষ্মীর সাধনায়। এঁরা ব্যতিক্রমী। পর্তুগিজ পর্যটক বারবোসা এদেশে এসে দেখেন রপ্তানি বাণিজ্যে বাঙালি বণিকের জয়জয়কার। সপ্তগ্রামকে সমৃদ্ধশালী বন্দর বলেছেন ইতালীয় পর্যটক সিজার ফ্রেডেরিক। 
মধ্যযুগেই হুগলি-সপ্তগ্রামের গৌরব-রবি অস্ত গেল। যুগসন্ধির সূচনায় লক্ষ্মী প্রকট হলেন কলকাতায়। নগর কলকাতা ইংরেজ বণিকদের ঘাঁটি। বণিকবৃত্তিকে অবলম্বন করে একদল দুঃসাহসী বাঙালির লক্ষ্মীসাধনার যে ধারা মধ্যযুগে বয়ে চলছিল তারই অনুবর্তন দেখা গেল আধুনিক যুগের সূচনায়। 
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বণিকদের দেওয়ানি, বেনিয়ান ও মুৎসুদ্দিগিরি, দালালি এবং কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য করে একদল মানুষ প্রভূত ধনসম্পদের অধিকারী হয়ে উঠলেন। এদের অনেকেরই পূর্বপুরুষ একদা প্রসিদ্ধ বাণিজ্যনগরী সপ্তগ্রামের বণিক-সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ ছিলেন। পরে অবশ্য এরা কলকাতায় চলে আসেন। 
প্রাক্‌পলাশি যুগে ইংরেজ সান্নিধ্যে এসে যে সমস্ত বাঙালি বাণিজ্যে লক্ষ্মীলাভ করলেন তাঁরা হলেন বৈষ্ণবচরণ শেঠ, পঞ্চানন কুশারী, লক্ষ্মী ধর, শোভারাম বসাক, নয়নচাঁদ মল্লিক, শুকদেব মল্লিক প্রমুখ। 
অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পলাশি-উত্তর পর্বে অন্য একদল বাঙালি বিত্তবান লোকের নাটকীয় উত্থান হল। এঁদের মধ্যে মুখ্য চরিত্র হলেন ক্লাইভের স্নেহধন্য রামচাঁদ রায় ও নবকৃষ্ণ দেব এবং ওয়ারেন হেস্টিংসের স্নেহধন্য কৃষ্ণকান্ত নন্দী ও গঙ্গাগোবিন্দ সিং। এরা কেউই কারবারি নন। বলা যেতে পারে প্রশাসনে নীচু স্তরের আমলা। সরকারি পদের অপব্যবহার মারফত ঘুরপথে এঁরা অঢেল বিত্তের অধিকারী হয়েছিলেন। কিন্তু সেই পুঁজিকে অবলম্বন করে এঁদের বংশধরেরা বড়ো কোনো উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারলেন না।
১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ভূসম্পত্তিতে ব্যক্তি মালিকানার সৃষ্টি করল। এ সময় বাঙালি বিত্তবানদের অধিকাংশই জমিদারির প্রতি আকৃষ্ট হলেন। তারা দেখলেন বণিকবৃত্তি শ্রমসাধ্য কাজ। এতে লোকসানের ঝুঁকিও রয়েছে। তাছাড়া ব্রিটিশ প্রভু নেটিভদের বাণিজ্য উদ্যোগে নানান বাধার সৃষ্টি করে। প্রভু ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই করে ব্যবসায় টিকে থাকার নিত্যধকল কম নয়। 
১৮৩১ সালে তুলো ও রেশমের কারবারের সঙ্গে যুক্ত ১১৭জন বাঙালি ব্যবসায়ী ইংরেজ সরকারের কাছে এক দরখাস্ত করেছিল এই মর্মে, ‘...সম্প্রতি বিলাতি কাপড়ের আমদানি এত বৃদ্ধি পাইয়াছে যে আমাদের ব্যবসায় বন্ধ হইবার উপক্রম হইয়াছে।...’ 
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পরিচালিত সরকার বিভিন্ন বাণিজ্য উদ্যোগের জন্য ইংরেজদের নানারকম সুবিধা দিত ও অর্থ সাহায্য করত। বাঙালিদের ভাগ্যে তা জুটত না।   
এইসব প্রতিকূল ও বৈষম্যমূলক পরিস্থিতির কারণেও ঊনবিংশ শতকের বিত্তবান বাঙালিরা ব্যবসাবিমুখ হলেন। তাঁরা দেখলেন, জমিদারিতে ঝঞ্ঝাট কম। বৎসরান্তে খাজনার টাকা সরকারের ঘরে জমা করলেই হল। জমিদার হয়ে কলকাতায় কোঠাবাড়ি হাঁকিয়ে চলতি শহুরে হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিব্যি আমোদ-ফুর্তি করা যায়, আবার নায়েব, প্রজাদের শোষণ করে জমিদারি থেকে অর্জিত মুনাফায় পকেট উপচে পড়ে। তাই জমিদারিতে অর্থ লগ্নিকে তাঁরা নিরাপদ মনে করলেন। উদ্যোগপতি না হয়ে বিত্তবান বাঙালি হল জমিদার।  
নবজাগরণ এল। পাশ্চাত্যের মুক্ত চিন্তা ও আধুনিক শিক্ষার সুপবন বইতে লাগল বাংলায়। এ সময় চলতি স্রোতের প্রতিকূলে সাঁতার কেটে বেশ কয়েকজন বাঙালি লক্ষ্মীসাধনায় নিবেদিত হলেন। সাহেবদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাণিজ্য সাধনায় সাফল্যও পেলেন। তালিকাটা নাতিদীর্ঘ নয়। রামদুলাল দে, দ্বারকানাথ ঠাকুর, মতিলাল শীল, রামগোপাল ঘোষ, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রমোহন বোস, ইন্দুমাধব মল্লিক, কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত, চন্দ্রকিশোর সেন, ফণীন্দ্রনাথ গুপ্ত, মন্মথনাথ ঘোষ, বীরেন্দ্রনাথ সরকার ও এমন আরও অনেকে। 
দীর্ঘকাল যাবৎ বাঙালি সমাজ এই ধারণা পোষণ করে আসছিল যে লক্ষ্মী অপেক্ষা সরস্বতীর সাধনা অনেক বেশি গৌরবের। ঊনবিংশ শতকের উদ্যমী মানুষেরা প্রমাণ করলেন যুগপৎ সরস্বতী ও লক্ষ্মীর সাধনায় কোনো বিরোধ নেই। সফল উদ্যোগপতি হতে হলে যথার্থ শিক্ষার প্রয়োজন। ১৮৫৭ সালের পরে যে সকল বাঙালি উদ্যোগপতিকে আমরা পেলাম তাঁদের অনেকেই বিলেতের ডিগ্রিধারী কৃতবিদ্য মানুষ। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, তাঁদের অধ্যবসায়, নেটিভ হয়েও সাহেবদের সঙ্গে লড়াই করে ব্যবসায় নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার অদম্য জেদ ও সাফল্যের দৃষ্টান্ত সমুখে থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী প্রজন্ম সে ভাবে অনুপ্রাণিত হল না। সিপাহি বিদ্রোহের পরবর্তী যুগে যে মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজ গড়ে উঠল তারা আচ্ছন্ন হল চাকরির মোহে। নব্য সমাজের চোখে চাকরি হয়ে উঠল খুবই সম্মানজনক বৃত্তি। 
তবুও আধুনিক যুগে বাঙালির লক্ষ্মীসাধনা নিতান্ত অগৌরবের নয়। গোটা ঊনবিংশ শতক পেরিয়ে বিশ শতকের প্রথমার্ধ— প্রায় এই দেড়শো বছর ধরে বাণিজ্যে বাঙালির গৌরবগাথা রচিত হয়েছে। এই সময়কালকে দু’টি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। প্রাক্‌-সিপাহি বিদ্রোহ ও উত্তর-সিপাহি বিদ্রোহ। প্রাক্‌-সিপাহি বিদ্রোহ পর্যায়ে উদ্যোগপতি হিসেবে বাঙালির আইকন রামদুলাল দে, দ্বারকানাথ ঠাকুর, মতিলাল শীল, রামগোপাল ঘোষ প্রমুখ। এঁদের কর্মোদ্যোগ সমাজের উপরে স্থায়ী প্রভাব ফেলল না, এটা খুবই আক্ষেপের বিষয়। 
ঊনবিংশ শতকের উদ্যোগপতিদের উত্তরপুরুষেরা অনেকেই জমিদারির দিকে ঝুঁকলেন, ব্যবসা চালাতে গিয়ে কেউ অনভিজ্ঞতা ও অপেশাদারিত্বের কারণে তরি ডোবালেন, কেউ বা বিলাসিতার স্রোতে গা ভাসিয়ে সঞ্চিত পুঁজিকে তামাকের ধোঁয়ার মতো উড়িয়ে দিলেন। এক প্রজন্মের চমকপ্রদ উড়ান অচিরেই বেসামাল হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল। 
ওই সময়েই লক্ষ্মীর খোঁজে কলকাতায় আগমন বিড়লা, গোয়েঙ্কাদের। বংশ পরম্পরায় আজও কিন্তু তাঁরা সাফল্যের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। বাঙালি তা পারেনি। সুযোগ হারিয়েছে। ঝুঁকি এড়িয়ে নিরাপদ জীবনকে বেছে নিয়েছে। সে যুগে জমিদারি, এ যুগে চাকরি।    
এবারে আধুনিক যুগে লক্ষ্মীসাধনায় বাঙালির অতীত গৌরবের কথা স্মরণ করা যাক। বারবার বললেও এসব কথা কখনোই পুরানো হয় না। বাঙালির এই গৌরবগাথা রূপকথার মতোই অমলিন। 
প্রবল দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন রামদুলাল দে। একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে হয়েছিলেন মস্ত উদ্যোগপতি। মৃত্যুকালে রামদুলাল প্রায় ১ কোটি ২৩ লক্ষ টাকা রেখে গিয়েছিলেন। তাঁর দুই পুত্র — আশুতোষ দেব (ছাতুবাবু) ও প্রমথনাথ দেব (লাটুবাবু) ইচ্ছে করলে অনায়াসে বড়ো বড়ো কল-কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। এঁদেরই তো সমসাময়িক ছিলেন জামশেদজি টাটা। মাত্র ২১ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে তিনি কারবারে নেমেছিলেন। সেই থেকে আজকের টাটা কোম্পানি। এমন একটা কোম্পানির মালিক হতেই পারতেন ছাতুবাবু-লাটুবাবু ও তাঁদের উত্তরসূরিরা। অথচ বিলাসিতা ও বাবুগিরিতে সঞ্চিত পুঁজি তাঁরা অপচয় করলেন। টাকা উড়ল পারিবারিক বিয়ে, শ্রাদ্ধ, অন্নপ্রাশন, দুর্গাপুজোর মাত্রাতিরিক্ত আড়ম্বর অনুষ্ঠানে, বিড়ালের বিয়েতে, কবিগান-আখড়াই গানের আসরে, বুলবুলির লড়াইয়ে, খ্যামটা নাচের পৃষ্ঠপোষকতায় ও বাইজিবিলাসে। পুঁজি অপচয়ের এই উদাহরণ বাঙালির ঊনবিংশ শতকের ইতিহাসে অজস্র।    
দ্বারকানাথ ঠাকুর রপ্তানি ব্যবসায় নামেন ১৮২১ সালে। এর পরই তিনি গড়ে তোলেন ওরিয়েন্টাল লাইফ ইনস্যুরেন্স সোসাইটি ও অনেকগুলি বিমা কোম্পানি। বিনয় ঘোষ লিখেছেন, ‘...উনিশ শতকের বাঙালীদের মধ্যে দ্বারকানাথ ঠাকুরের মতো স্বাধীন শিল্পবাণিজ্যের প্রতি উৎসাহ ও অনুরাগ দ্বিতীয় আর কারও ছিল কি না সন্দেহ।...’ ১৮২৯ সালে দ্বারকানাথের উদ্যোগে স্থাপিত হয় ইউনিয়ন ব্যাংক। কয়েক বছর পর স্থাপিত হল ‘কার টেগোর অ্যান্ড কোম্পানি’ — বাঙালি ও ইউরোপীয় বণিকের যৌথ সংস্থার প্রথম নিদর্শন। ১৮৪৩ সালে দ্বারকানাথ স্থাপন করেন ‘বেঙ্গল কোল কোম্পানি’। এসবের পাশাপাশি রেশম, নীল, আফিম চাষেও তিনি অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। পণ্য পরিবহণের জন্যও দ্বারকানাথ একাধিক কোম্পানি গড়ে তোলেন। যেমন ‘ক্যালকাটা স্টিম টাগ অ্যাসোসিয়েশন’, ‘স্টিম ফেরিব্রিজ কোম্পানি’ ও ‘ইন্ডিয়া জেনারেল স্টিম নেভিগেশন’ কোম্পানি। এইসব বহুমুখী উদ্যোগ আজও আমাদের বিস্ময় উদ্রেক করে। ১৮৪৬ সালের পয়লা আগস্ট ইংল্যান্ডে মৃত্যু হয় দ্বারকানাথের। এর পরে মাত্র দেড় বছরের মধ্যে তাঁর কোম্পানিগুলি দেউলিয়া হয়ে যায়। শুধু ভূসম্পত্তিতে নিযুক্ত মূলধনটুকু অক্ষত ছিল। দ্বারকানাথের পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ব্যবসামুখী হলেন না। জমিদারিকেই তিনি নিরাপদ মনে করেছিলেন।   
ফোর্ট উইলিয়ামে মাল সরবরাহ করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন মতিলাল শীল। জলবাণিজ্যে বিদেশিদের সঙ্গে রীতিমতো পাল্লা দিয়ে নিজের বণিকসত্তা সদর্পে ঘোষণা করতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন। কেলসল নামে এক সাহেবের সঙ্গে যোগ দিয়ে রামগোপাল গড়ে তোলেন ‘কেলসল ঘোষ অ্যান্ড কোম্পানি’। পরে ‘আর জি ঘোষ অ্যান্ড কোম্পানি’ নামে নিজস্ব কোম্পানি খুলে প্রভূত উন্নতি করেছিলেন।    
উত্তর-সিপাহি বিদ্রোহ পর্যায়ে উদ্যোগপতি হিসেবে বাঙালির শ্রেষ্ঠ আইকন নিঃসন্দেহে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে বিজ্ঞানশিক্ষার আগে দেশে শিল্প স্থাপন প্রয়োজন। তাঁর কথায়, ‘...প্রত্যেক দেশেই শিল্প-বাণিজ্যের উন্নতি হইয়াছে, তাহার পরে বিজ্ঞান ও বিবিধ শিল্পবিদ্যা প্রভৃতি আসিয়াছে।...’ তিনি লক্ষ করেছিলেন বাঙালি ছাত্ররা যেকোনোভাবে একটা চাকরি জোগাড় করতেই ব্যস্ত। বাঙালিকে জীবিকা নির্বাহের বিকল্প পথের সন্ধান দিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল’। এই প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের পর প্রফুল্লচন্দ্র লিখেছিলেন, ‘... বেঙ্গল কেমিক্যাল পুরাপুরি বাঙ্গালীর প্রতিষ্ঠান। এইখানে বাঙ্গালীর অর্থ, বাঙ্গালীর বুদ্ধি, বাঙ্গালীর সামর্থ্য সবই বাঙ্গালীর। আমাদের দেশের যে সকল অতি পণ্ডিত লোকেরা বাঙ্গালীর কর্মকুশলতায় আস্থাবান নহে তাহারা একবার বেঙ্গল কেমিক্যাল কারখানা দেখিয়া আসিলে বুঝিতে পারিবে, কেমন করিয়া কেবল বাঙ্গালীর দ্বারা এত বড় কলকব্জার ব্যাপার চলিতে পারে।...’    
উনিশ শতকের শেষের দিকে স্থাপিত হয় এইচ বোস অ্যান্ড কোম্পানির পারফিউমারি ওয়ার্কস। এইচ বোসের পুরো নাম হেমেন্দ্রমোহন বসু। ইনি ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ভগ্নীপতি। এইচ বোস অ্যান্ড কোম্পানির কুন্তলীন হেয়ার অয়েল এক সময়ে বাংলাদেশে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।  
বাটনা বাটার ঝামেলা এড়াতে বাঙালিকে গুঁড়ো মশলার সুলুকসন্ধান দিলেন কৃষ্ণচন্দ্র দত্ত। সেই প্রতিষ্ঠান আজও দাপটের সঙ্গে বিরাজ করছে। ১৮৭৮ সালে আয়ুর্বেদ চিকিৎসক চন্দ্রকিশোর সেন তৈরি করলেন ‘জবাকুসুম’ তেল। বাঙালির ঘরে ঘরে আধিপত্য করল এই ব্র্যান্ড। প্রোডাক্ট জনপ্রিয় করতে চাই বিজ্ঞাপন। বুঝেছিলেন চন্দ্রকিশোর। ১৯০৩ সালে হীরালাল সেনকে দিয়ে তিনি তৈরি করালেন দেশের প্রথম বিজ্ঞাপনী চলচ্চিত্র। 
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ও বিলিতি দ্রব্য বর্জনের ঢেউ অনেক বাঙালিকে উদ্যোগপতি হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সে সময় আমবাঙালির হাতে দেশীয় পেন, পেনসিল, রবার তুলে দিলেন ফণীন্দ্রনাথ গুপ্ত। আরেক উদ্যোগপতি অন্নদাপ্রসাদ শীল তৈরি করলেন ঝরনা কলম। ফাউন্টেন পেন-এর এই বাংলা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনিই বাঙালির তৈরি  ফাউন্টেন পেন-এর ব্র্যান্ড নাম দিলেন ভারতী কলম। 
জাপান থেকে সেলুলয়েড শিল্প শিখে এসে যশোরের জমিদার প্রমথভূষণ দেবরায়, কাশিমবাজারের মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী, বর্ধমানের মহারাজা বিজয়চাঁদ মহাতবের সহায়তায় মন্মথনাথ ঘোষ গড়ে তুললেন ‘যশোর কম্ব বাটন অ্যান্ড ম্যাট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড’। মন্মথনাথই ভারতের সেলুলয়েড শিল্পের জনক।  
চর্মশিল্পের সম্ভাবনার কথা ভেবে ‘ন্যাশনাল ট্যানারি’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নীলরতন সরকার। ইংল্যান্ডের লিডস থেকে লেদার টেকনোলজি শিখে এসে বিরাজমোহন দাস যোগ দিলেন ন্যাশনাল ট্যানারিতে। পরে ১৯১৮ সালে তিনি গড়ে তুললেন ‘ক্যালকাটা রিসার্চ ট্যানারি’। নাম পরিবর্তিত হতে হতে সেটাই এখন ‘কলেজ অব লেদার টেকনোলজি’। বিরাজমোহন চেয়েছিলেন বাঙালি শিক্ষিত যুবকেরা চর্মশিল্পে নিজেদের ব্যবসায়ী সংস্থা গড়ে তুলুক। কিন্তু তারা আগ্রহী হল মাস মাইনের চাকরিতে। কলকাতার চর্মশিল্পের দখল নিল চীনা ব্যবসায়ীরা। ১৯৩২ সালে চেকোশ্লোভাকিয়া থেকে চলে এলেন টমাস বাটা। কোন্নগরে স্থাপিত হল বাটা কোম্পানির জুতোর কারখানা। বাঙালি সুযোগ হারাল। 
বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে এক বিরাট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হন স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। তিনি স্থাপন করেছিলেন ‘ইন্ডিয়ান আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানি’, ‘ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড ওয়াগন কোম্পানি’, ‘বার্ন অ্যান্ড কোম্পানি’, ‘মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি’। কর্মজীবনের শুরুতে রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জি ছিলেন সুদক্ষ ইঞ্জিনিয়ার ও ঠিকাদার। এদেশে মার্টিন রেলপথসমূহ স্থাপনের কৃতিত্ব তাঁরই। 
বিংশ শতকের গোড়ায় নয়া শিল্পমাধ্যম চলচ্চিত্রে বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাঙালি। বলতে গেলে ভারতের চলচ্চিত্র শিল্পের বুনিয়াদ গড়ে দিল তারাই। এ তালিকায় নাম অনেক — হীরালাল সেন (এদেশে চলচ্চিত্রের জনক) , বীরেন্দ্রনাথ সরকার (নিউ থিয়েটার্স), অনাদিনাথ বসু (অরোরা ফিল্ম কর্পোরেশন), হিমাংশু রায় ও শশধর মুখার্জি (বম্বে টকিজ) প্রমুখ। পুস্তক ব্যবসায় নেমে পথ দেখিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। রামতনু লাহিড়ীর দ্বিতীয় পুত্র শরৎকুমার লাহিড়ী গড়ে তুললেন ‘এস কে লাহিড়ী অ্যান্ড কোং’ নামে প্রকাশনা সংস্থা। শিশিরকুমার ঘোষ প্রতিষ্ঠা করলেন ‘যুগান্তর’ ও ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকা। প্রফুল্লকুমার সরকার ও সুরেশ মজুমদার গড়ে তুললেন ‘শ্রী গৌরাঙ্গ প্রেস’, চালু করলেন দৈনিক বাংলা খবরের কাগজ। উদ্যোগপতি মহেন্দ্রনাথ দত্ত প্রতিষ্ঠা করলেন ‘শ্রী সরস্বতী প্রেস’, ‘শিশু সাহিত্য সংসদ’ ‘সাহিত্য সংসদ’ ও ‘তারা বাইন্ডিং ওয়ার্কস’। এমন আরও অনেক উদাহরণ আছে। স্থানাভাবে সব উল্লেখ করা গেল না। 
কোনো সন্দেহ নেই উনিশ শতকের নবজাগরণ এক দল সাহসী বাঙালিকে লক্ষ্মীর সাধনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। ‘বাঙালির দ্বারা ব্যবসা হয় না’ — একথা ভুল বলে তাঁরা প্রমাণ করেছিলেন। তবে ঔপনিবেশিককালে দীর্ঘকাল বাণিজ্যিক ভারতের কেন্দ্রবিন্দু কলকাতায় অবস্থান করেও বেশিরভাগ বিত্তবান বাঙালির প্রধান আগ্রহ ছিল জমিদারি এবং ইংরেজ সরকারের অধীনে উচ্চপদের চাকরি। এ কথা আগেই বলেছি। বৃহত্তর বাঙালি সমাজের বাণিজ্যে অনীহা যে শূন্যতার সৃষ্টি করেছিল, তা ভরাট করে দিল পশ্চিম ভারত থেকে আসা বণিকেরা। বংশ পরম্পরায় এখনও তাঁরা সাফল্যের সঙ্গে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড বজায় রেখেছে। আর অতীত গৌরব হারিয়ে রিক্ত বাঙালি ছুটে চলেছে চাকরিকে মুঠোবন্দি করার প্রচেষ্টায়।   
বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাণিজ্যে বাঙালির অতিদ্রুত পিছু হটা। তার আগে বিশ শতকের চল্লিশের দশকের পরপর কয়েকটি ঘটনা দুমড়ে মুচড়ে দিল বাঙালি জাতির মেরুদণ্ড ও মূল্যবোধকে। যুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা, দেশভাগ তছনছ করে দিল বাঙালির সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা। দেশভাগে গরিব হল বাঙালি। সংকুচিত হল ব্যবসার ক্ষেত্র। তারপর জমিদারি প্রথা বিলোপ। জমিতে বিনিয়োগ করে নিশ্চিন্তে যারা বসেছিলেন, হঠাৎ একদিন তাঁরা দেখলেন জমি-জায়গা নেই। পুঁজি ক্রমশ পিছলে যেতে লাগল বাঙালির হাত থেকে। জমিদারি খুইয়ে অনেকে মরিয়া হয়ে বাণিজ্যকে আঁকড়ে ধরতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু যথার্থ আগ্রহ ও উদ্যমের অভাব এবং অনভিজ্ঞতার কারণে ব্যর্থতার পাল্লাই এখানে ভারী। পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর দশকে বাংলার রাজনৈতিক আবহও বাণিজ্যের প্রতিকূল হয়ে উঠেছিল। একথাও মানতে হবে।   
মনোবল হারিয়ে আম বাঙালি মনে করল চাকরিই তার ভবিতব্য। ওদিকে চাকরি সংখ্যায় পর্যাপ্ত নয়। সামান্য একটা আর্দালির চাকরির জন্য উচ্চশিক্ষিত বাঙালি যুবক মাথা খুড়ে মরছে। এদৃশ্য বেদনাদায়ক। তবে হতাশার অন্ধকারে তো সব কিছু শেষ হয়ে যায় না। আশা নিয়েই মানুষ বাঁচে। স্বপ্ন আমরা দেখতেই পারি।
অতীতে কৃষি ও গ্রামীণ কুটির শিল্পকে অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ ছিল সহজসাধ্য। ইংরেজ আমলের সূচনায় জমিদারি এবং পরবর্তীকালে সরকারি চাকরিকে বাণিজ্য উদ্যোগের উপরে স্থান দিয়েছিল বাঙালি। এভাবে তার জীবন বয়ে গিয়েছে, তেমন অসুবিধা কিছু হয়নি। কিন্তু স্বাধীনতা উত্তরকালে সে পড়ল সমস্যায়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন হিসেবে কৃষিজমি আজ অপ্রতুল। গ্রামীণ কুটির শিল্প ঔপনিবেশিক আমলে ধ্বংসপ্রাপ্ত। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত। অগত্যা সম্বল কেবল চাকরি। তা আবার সহজে মেলে না।  
এই পরিস্থিতিতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে বাংলার যুবক যুবতীদের। একদিন সুযোগ পেয়েও হেলায় হারিয়েছে বাঙালি। আজ হয়তো জীবিকা-সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে অগণিত বাঙালি যুবকযুবতী অনুভব করবে সম্মানের সঙ্গে এই সমাজে বাচার জন্য বাণিজ্যই ভরসা। ‘বাণিজ্য বসতে লক্ষ্মী’— একথায় প্রকৃতই প্রত্যয় হবে বাঙালির। উদ্যোগপতি জন্ম নেবে বাঙালির ঘরে ঘরে। ছোটো, বড়ো যাই হোক না কেন।  

সম্পর্কিত সংবাদ