Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার নিদান রুখেই বাঁচার লড়াই শুরু ‘অকাল জরা’র শিকার পারভিনের

ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার নিদান রুখেই বাঁচার লড়াই শুরু ‘অকাল জরা’র শিকার পারভিনের
  • ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: বাংলায় বলে ‘অকাল জরা’। ইংরেজিতে প্রোজেরিয়া। অত্যন্ত বিরল একটি জেনেটিক রোগ। অকাল বার্ধক্যের সুস্পষ্ট  লক্ষণই চিনিয়ে দেয় এই রোগকে। চিকিৎসক মহল ছাড়া এই প্রোজেরিয়াকে সিনেমার পর্দায় দর্শকদের চিনিয়ে দিয়েছিলেন বিগ-বি অমিতাভ বচ্চন। ‘পা’ সিনেমায় ‘আরো’ চরিত্রায়নে তাঁর অভিনয় দেড় দশক পরও দর্শক-মননে টাটকা। সেই ‘আরো’র জীবন-যুদ্ধকে বাস্তবের জমিতে যেন ফিরিয়ে আনল আসানসোল পুরসভার ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের কালিকাপুরের নিখাত পারভিন।  
Advertisement
প্রোজেরিয়ার চেয়েও আরও ভয়ানক শারীরিক সমস্যা নিয়ে জন্মেছিল পারভিন। তাকে নিয়ে চিকিৎসকদের চেম্বারে চেম্বারে কেটেছে বাবা-মায়ের। সবাই হাত উল্টে জানিয়ে দিয়েছিলেন, কিচ্ছুটি করার নেই। পারলে একবার দক্ষিণ ভারতে গিয়ে দেখিয়ে আসতে পারেন। এক নিষ্ঠুর চিকিৎসক এমনও নাকি জানিয়ে দিয়েছিলেন, ডাস্টবিনে ফেলে দিন। সেদিন চেম্বার থেকে চোয়াল শক্ত করে বেরিয়ে এসেছিলেন মা হাসিনা খাতুন। 
হাসিনার লড়াই শুরু ঠিক এখান থেকেই। জীবন-যুদ্ধে পা রাখে পারভিনও। তার বয়স এখন বারো। সেদিন যদি সত্যিই ডাস্টবিনে ঠাঁই হতো পারভিনের, তা হলে আজ হয়তো তাকে নিয়ে গর্ববোধ করতে পারতেন না নরসমুদা জনকল্যাণ হাইস্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। সে এখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। ৬০ শতাংশ শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েই কোনও ক্লাসে প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হয়নি। পাশাপাশি বিজ্ঞান মেধা-অন্বেষণ পরীক্ষায় সেন্টারের সেরা হয়ে স্কুলের মুখ আরও উজ্জ্বল করেছে সে। ছোট বোন তার থেকেও বেশি শারীরিক সমস্যা নিয়ে জন্মেছে। প্রায় ৯০ শতাংশই প্রতিবন্ধী। তাকে নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকতে হয় বাবা-মাকে। নিজের বেঁচে থাকার লড়াই নিজেই করছে পারভিন। 
বাবা সিরাজুদ্দিন সিদ্দিকি মার্বেল মিস্ত্রির জোগাড়ে। হাসিনা সম্পূর্ণ গৃহবধূ। ২০১২ সালে দু’জনের প্রথম সন্তান পারভিনের জন্ম। অতি অল্প ওজন। বিশাল বড় মাথা। অথচ, অতি নরম। চিকিৎসকরা তার বেঁচে থাকার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। অগ্যতা বাড়িতে রেখে ঘরোয়া টোটকা। বেঁচে যায় নিখাত। কিন্তু মেয়ের পরবর্তী চিকিৎসা করাতে পারেননি সিদ্দিকি। কারণ, আর্থিক অনটন। ওই অবস্থাতেই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয় পারভিনকে। ধীরে ধীরে এলাকাবাসীরও সহানুভূতি আদায় করে নেয় সে। তার নম্র ব্যবহার সবাইকে খুশি করে। 
ইংরেজি পছন্দের বিষয় পারভিনের।  বিজ্ঞানেও সমান পারদর্শী। ২ ডিসেম্বর নরসমুদা জন কল্যান সমিতি হাইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণির বিজ্ঞান মেধা অভিক্ষা পরীক্ষা হয়। পাঁচটি বড় হাইস্কুলের মেধাবীরা সেই পরীক্ষায় অংশ নেয়। সেন্টারের মধ্যে প্রথম স্থান দখল করে নেয় পারভিন। ‘তারে জমিন পর’ সিনেমায় ইশানকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছিলেন নিকুম্ভ স্যর। পারভিনের অবশ্য ‘নিকুম্ভ স্যর’ স্কুলের কম্পিউটার শিক্ষক সৈকত চট্টোরাজ। তাঁর উদ্যোগেই কম্পিউটারেও দক্ষ হয়ে উঠেছে নিখাত পারভিন। চোখ বন্ধ করে কম্পিউটারের মাউস থেকে কি-বোর্ডে অনায়াস বিচরণ করে।  সৈকতবাবু বলছিলেন, ‘অনেক শিশু প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু পারভিন তাদের চেয়েও অতি প্রতিভাশালী। পঞ্চম শ্রেণি থেকেই ওকে নিখুঁত ভাবে অনুসরণ করি। ওর বয়স যেন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। দ্রুত ভালো চিকিৎসার প্রয়োজন। তা না হলে অচিরেই আমরা একটি ভবিষ্যতের মেধাবী পড়ুয়াকে হারাব।’ স্কুলের প্রধান শিক্ষক দীপক মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘নিখাত পারভিন আমাদের স্কুলের গর্ব। ও স্কুলে কখনও দ্বিতীয় হয়নি। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু করা সম্ভব করছি।’ 
মেয়ের প্রশংসায় গর্বিত মা হাসিনাও। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ছোট মেয়ে জান্নাতকে কোলে নিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘দেখছেন তো ছোট মেয়ের এই অবস্থা! ওকে নিয়ে আমরা দু’জনেই দিনের সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকি। বড় মেয়েকে দেখার সময় পাচ্ছি না। অর্থের অভাবে চিকিৎসাও করাতে পারিনি। ওর কপালে যা রয়েছে, তাই হবে।’ মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে পারভিনের সাহসী মন্তব্য—‘আমার পড়তে খুব ভালোলাগে। আরও উঁচু ক্লাসে গিয়ে ঠিক করব, আমি ডাক্তার হব না কি শিক্ষিকা।’  মা-বোনের সঙ্গে পারভিন।
সম্পর্কিত সংবাদ