Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

স্বপ্নও হতে পারে দুঃস্বপ্ন

সব বুথ ফেরত সমীক্ষাকে ছাপিয়ে বিহারে এনডিএ জোটের ডবল ইঞ্জিন সরকার ডবল সেঞ্চুরি করে ফের ক্ষমতায় ফিরেছে। প্রতিষ্ঠান বিরোধী মনোভাবের তত্ত্বকে দূরে ঠেলে স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে রায় দিয়েছেন বিহারের ভোটাররা।

স্বপ্নও হতে পারে দুঃস্বপ্ন
  • ১৬ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সব বুথ ফেরত সমীক্ষাকে ছাপিয়ে বিহারে এনডিএ জোটের ডবল ইঞ্জিন সরকার ডবল সেঞ্চুরি করে ফের ক্ষমতায় ফিরেছে। প্রতিষ্ঠান বিরোধী মনোভাবের তত্ত্বকে দূরে ঠেলে স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে রায় দিয়েছেন বিহারের ভোটাররা। এই বিপুল জয়ের পর আগামী বছর বাংলা দখলের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, বাংলায় বিজেপির জন্য জয়ের রাস্তা তৈরি করে দিয়েছে বিহার। ঠিক যেমন গঙ্গা বিহার হয়ে বাংলায় পৌঁছেছে। বঙ্গের বিজেপি নেতাদের মতে, কলিঙ্গ (ওড়িশা), অঙ্গ (বিহার)-র পর এবার বঙ্গ (পশ্চিমবঙ্গ) জয়ের পালা। গেরুয়া শিবিরের স্লোগান: ‘বিহারের পর বাংলা/ এবার ঠেলা সামলা।’ ভোট-বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, সেই ২০২১ সাল থেকেই এ রাজ্য দখলের কথা শোনাচ্ছেন মোদি-অমিত শাহরা। কিন্তু তাঁদের যাবতীয় প্রচেষ্টা মাঠে মারা পড়েছে। অতএব ২০২১-এর বিধানসভা এবং ২০২৪-এর লোকসভার মতো ২০২৬-এও রাজ্য দখলের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে। কারণ, মমতার তৈরি পাঠশালায় প্রশিক্ষণ নিয়েই সাফল্য পেয়েছে বিহারের এনডিএ জোট। ফলে এ রাজ্যে গুরুমারা বিদ্যায় কাজ হবে না। তৃণমূলের কথায়, বঙ্গের মানুষ ‘আসল’ থাকতে ‘নকল’ নিতে যাবেন কেন! 

Advertisement

গত লোকসভা ভোটে বিজেপি কোনওক্রমে জিতে কেন্দ্রে সরকার গঠন করলেও তার আগে-পরে একাধিক রাজ্যে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে এনডিএ। এই ধারাবাহিক সাফল্যের অন্যতম প্রধান ‘অস্ত্র’ হিসাবে মহিলাদের হাতে নগদ পৌঁছে দেওয়ার প্রকল্প যে ম্যাজিকের মতো কাজ করেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বিহারেও সেই পথে হেঁটেই নীতীশ কুমারের সরকার বাজিমাত করেছে। তথ্য বলছে, এবার ভোটের আগে সে রাজ্যের ১ কোটি ২২ লক্ষ মহিলা ভোটারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এককালীন ১০ হাজার টাকা করে দিয়েছে নীতীশ সরকার। ফল হয়েছে, গতবারের চেয়ে এবার ১২ শতাংশ বেশি মহিলা ভোট দিয়েছেন। জাত-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে এই ভোটের সিংহভাগ এনডিএ-র ঝুলিতে গিয়েছে বলে মেনে নিচ্ছে বিরোধীরাও। ঘটনা হল, মহিলাদের কাছে নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়ার প্রকল্প চালু করে বিহারের আগে মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা, মহারাষ্ট্র, দিল্লি, হরিয়ানায় সাফল্য পেয়েছে এনডিএ জোট। পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের উদ্যোগে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ নামে এ ধরনের প্রকল্প চালু আছে ২০২১ সাল থেকেই। বছরে ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা পর্যন্ত নগদ পাচ্ছেন দু’ কোটির বেশি মহিলা। এই প্রকল্পকে সামনে রেখে ২০২১-এর বিধানসভা ও ২০২৪-এর লোকসভায় সাফল্য পেয়েছে মমতার দল। ’২৬-এও তার ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়। শুধু লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নয়, কন্যাশ্রী, রূপশ্রীর মতো মহিলাকেন্দ্রিক প্রকল্প ছাড়াও রাজ্যের প্রায় সর্বস্তরের মানুষের জন্য প্রায় ১০০টি সামাজিক প্রকল্প বাংলায় চলছে গত কয়েকবছর ধরে। এর সাফল্য ও সুবিধা বিহারের ডুগডুগি বাজিয়ে রোধ করা যাবে না। বিজেপি নেতৃত্ব এই সারসত্যটা বুঝলেই ভালো। 
বিহারের সাফল্যে বিজেপি বঙ্গ-জয়ের খোয়াব দেখলেও দুই রাজ্যের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। প্রথমত, বিহারে মুসলিম ও পিছিয়ে পড়া অংশের একটা বড়ো সংখ্যক ভোট নীতীশ, চিরাগ পাসোয়ানের হাত ধরে এনডিএ-র ঝুলিতে পড়েছে। কারণ, এঁদের গায়ে সেই অর্থে গেরুয়া ‘হিন্দুত্বে’র ছাপ নেই। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির কোনও জোটসঙ্গী নেই। এ রাজ্যে গেরুয়া শিবিরের তীব্র মেরুকরণের রাজনীতির দৌলতে এমনিতেই মুসলিমদের সিংহভাগ ভোট পায় তৃণমূল। এবার ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনে ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কা, সেইসঙ্গে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালি খেদাও অভিযানের জেরে মুসলিম ও গরিব মানুষের বেশিরভাগ ভোট মমতার ঝুলিতে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। দ্বিতীয়ত, এ রাজ্যে দুর্নীতিকে বিরোধীরা ইস্যু করলেও শহরাঞ্চলের বাইরে তার বিশেষ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। কারণ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে সিবিআই, ইডির মতো কেন্দ্রীয় এজেন্সি তদন্ত করলেও এখনও প্রায় কোনও অভিযোগই প্রমাণিত নয়। তৃতীয়ত, বিজেপি অনুপ্রবেশকে রাজ্যের বিরুদ্ধে হাতিয়ার করতে চাইছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, সীমান্তে পাহারায় থাকে বিএসএফ। স্বাভাবিক নিয়মেই বেআইনি অনুপ্রবেশ আটকানোর দায়িত্ব তাদের। তাই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীন কেন্দ্রীয় বাহিনীর এই সীমাহীন ব্যর্থতার দায় যে রাজ্যের হতে পারে না, তা বিজেপি বুঝতে না চাইলেও রাজ্যের মানুষের কাছে পরিষ্কার। চতুর্থত, ভোটে জিততে সবচেয়ে বেশি যেটা জরুরি, তা হল সংগঠন। রাজ্যের ৮০ হাজারের বেশি বুথের অর্ধেকের বেশি অংশে যে বিজেপির সিকি-আধুলির মতো কর্মীও নেই, তা কারও অজানা নয়। সেইসঙ্গে দলীয় কোন্দল নিত্যদিনের ঘটনা। ভোটের সময় বা আগে বাইরে থেকে নেতা আনলে যে বুথ স্তরের সংগঠন তৈরি হবে না, তা জানে বিজেপি। তবু ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে বুঝে নেওয়ার রোয়াবি দেখাচ্ছে মোদির দল। পঞ্চমত, শাসক তৃণমূলে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত মুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা তথা গোটা দেশে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় সর্বজনবিদিত। সঙ্গে রয়েছে পনেরো বছর রাজ্য চালানোর অভিজ্ঞতা। বিজেপি ক্ষমতায় এলে কে এই দায়িত্ব পালন করবেন, তা নিয়ে দলীয় স্তরে একটা ভোট হতে পারে। তাই আবারও হয়তো সেই স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়েই তাঁদের সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ