


খয়েরি পাহাড়ের বুক চিরে ধুলো উড়িয়ে ছুটে চলেছে গাড়িটা। দূরে দেখা যাচ্ছে বরফ পাহাড়ের সারি, শরতের আকাশের মতো তুলো তুলো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে ধূসর পাহাড়ের উপর। তার ছায়া পড়ছে রুক্ষ শীতল মরুভূমির পাদদেশে। নুব্রা উপত্যকা থেকে আমাদের গাড়ি ছুটে চলেছে লাদাখের প্যাংগং হ্রদের উদ্দেশ্যে। উঁচু-নিচু রুক্ষ শীতল মরুভূমির পাহাড়ের রাস্তাতে ছুটে চলেছে গাড়ি, পাশ দিয়ে সবুজ নীল মেশানো সিয়ক নদী আমাদের পথের সঙ্গী হয়েছে। আঁকাবাঁকা পথে উঠতে উঠতে ড্রাইভার পাহাড়ের একটা ঢালে পৌঁছে জানাল এখানে শাহরুখ খান, ক্যাটরিনা কাইফের ‘জব তক হ্যায় জান’ ছবির খানিকটা শ্যুটিং হয়েছিল। জায়গাটা প্যাংগংয়ের ঠিক ১৭ কিলোমিটার আগে। রুক্ষ রাস্তায় কোনো গাছপালা নেই ঝলমলে রোদে আশপাশের রংবেরঙের পাহাড়গুলোর রূপ আরো ধারালো হয়েছে। রাস্তায় দেখা হল দু’জন সাইকেল আরোহীর সঙ্গে। তাঁরা লেহ্ থেকে সাইকেল নিয়ে ছুটছেন প্যাংগংয়ের উদ্দেশ্যে। ব্রিটেন থেকে আগত সেই দুই সাইকেল আরোহী বন্ধুরা এককথায় স্বীকার করলেন, তাঁরা পৃথিবীর এত দেশে সাইকেল নিয়ে ভ্রমণ করেছেন কিন্তু লাদাখে সাইকেল চালানোর চ্যালেঞ্জটাই আলাদা। গাড়ি আবার চলা শুরু করল। এলোমেলো পথের শেষে উপরে দুটো পাহাড়ের মাঝে দেখতে পেলাম খয়েরি পাহাড়ের বুকে নীলোৎপল এক মণিখণ্ড। হ্রদের নীল আলোয় আমরা আলোকিত হয়ে শুধু দু’চোখ ভরে তাকে দেখতে লাগলাম।
তিব্বতি ভাষায় ‘সো’ কথার মানে ‘হ্রদ’। অনেকে তাই বলেন প্যাংগং সো। লেহ্ থেকে প্রায় ১৫২ কিলোমিটার দূরে ১৪,৩৪৫ ফুট উচ্চতায় এটি একটি নোনা জলের হ্রদ। বলা হয় ১৩৫ কিমি দীর্ঘ এবং পাঁচ থেকে সাত কিলোমিটার প্রস্থ বিশিষ্ট এই নীল হ্রদের তিন ভাগের ২ ভাগ তিব্বতের দখলে মাত্র ৪৫ কিলোমিটার ভারতের অন্তর্গত। লেহ্ থেকে সরাসরি প্যাংগং হ্রদ আসতে হলে পেরতে হবে পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম মোটর পথ চাংলা পাস ১৭৩৫০ ফুট। এই চাংলা পাস আমরা প্যাংগং থেকে লেহ্ শহর ফেরার পথে পার করেছিলাম। সেখান থেকে উত্তর-পশ্চিমের আদি অনন্ত লাদাখের বিস্তীর্ণ পর্বতমালা এবং স্টক কাঙ্গরির অবাধে দর্শন পাওয়া যায়। সেও এক অসাধারণ দৃশ্য। দেখে মনে হয় পৃথিবী বুঝি মহাশূন্যে গিয়ে মিশেছে।
ঘন গেরুয়া রঙের পাহাড়ের সারি, নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মতো ডুমো ডুমো সাদা মেঘের দল, তার মাঝে সূর্যের আলোর তীব্রতার সঙ্গে প্যাংগং মুহূর্তে মুহূর্তে নীল থেকে ঘন নীল, পান্না সবুজ স্বচ্ছ আকাশি নীল, সমুদ্র নীল, তুঁতে নীল বিভিন্ন রঙের খেলায় মাতল। প্যাংগং হ্রদের সৌন্দর্য ছবিতে পুরোপুরি বোঝানো যাবে না। প্রতিটি কোণ থেকে, হ্রদের বিভিন্ন দিক থেকে, উপরে-নীচে, সামনে-পিছন থেকে এই সরোবর তার রঙের খেলা দেখিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দেবে।
শীতকালে এই হ্রদ পুরো জমে যায়। তখন এর তাপমাত্রা মাইনাস ৩০ এর নীচে চলে যায়। শীতকালে লাদাখে কেমন ঠান্ডা হয় সেই অভিজ্ঞতা আমার আছে। সিন্ধুর উপনদী জাস্কার শীতকালে পুরো জমাট বেঁধে যায়। তখন তার উপর চাদর ট্রেক করেছিলাম। সেইসময় একটা জায়গাতে মাইনাস ৪৬-এর তীব্র ঠান্ডা সহ্য করতে হয়েছিল। এই হ্রদ হিমালয়ের জলাভূমি সংরক্ষিত এলাকা এবং বছরের নির্দিষ্ট সময় এখানে অনেক পরিযায়ী পাখি আসে। প্যাংগং হ্রদের প্রতি চীনের আগ্রাসন নীতিও লক্ষ করা গিয়েছে। কারণ এই হ্রদ ভারত ও চীনের মধ্যে একটা বাফার জোন হিসাবে কাজ করে। প্যাংগং হ্রদকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের উৎসব হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রীষ্মকালে স্থানীয় মানুষেরা এখানে মান ডেরাম চেনমো উৎসব পালন করেন।
স্বচ্ছ হ্রদের জলে নীচের নুড়ি পাথরগুলো একদম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হ্রদের সামনেই বিখ্যাত ছবি ‘থ্রি ইডিয়েটস’-এর যে দৃশ্যটা ক্যামেরাবন্দি হয়েছিল সেই স্থানটিও চিহ্নিত করা আছে। এই মায়াবী রূপসী সরোবরের রঙের খেলা দেখতে দেখতে কখন যে চলে গেল কয়েক ঘণ্টা খেয়ালই করিনি। এবার ফেরার পালা। তাই তাড়াতাড়ি প্যাংগং হ্রদের জল হাতে নিয়ে মাথায় দিলাম। প্রতিবারের মতো এবারও হিমালয়ের আশীর্বাদ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করলাম না। মনে প্রশান্তি নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম।
হোমাগ্নি ঘোষ