শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: এক ছাদের নীচে বসবাস। হেঁসেল থেকে দৈনন্দিন ঘরকন্না সামলান হাতে হাত মিলিয়ে। সংসারের কাজ সেরে দু’জনে একসঙ্গে চোখ রাখেন সন্ধ্যার সিরিয়ালে। দিন দুয়েক হল, সেখানেই যেন ঝড়ের পূর্বাভাস! শাশুড়ির মুখভার। মুখ কালো করে ঘুরছেন সারাদিন। আর বউমার মুখে যেন হাজার ওয়াটের আলো! সৌজন্যে অন্নপূর্ণা যোজনা! ১৮ তারিখ বউমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ঢুকে গিয়েছে কড়কড়ে তিন হাজার। আবেদন করেছিলেন শাশুড়িও। কিন্তু টাকা ঢোকেনি। অনলাইনে দেখিয়েছে ‘আন্ডার প্রসেস’। আর তাতেই গোল বেধেছে সুখের সংসারে! এ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। চলতি মাসের ১৭ তারিখ থেকে রাজ্য সরকার অন্নপূর্ণা যোজনার আর্থিক সহায়তা উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে পাঠানো শুরু করেছে। অনেকেই সেই টাকা পেয়েছেন। আবেদনকারীদের একটা বড়ো অংশ এখনও তা পাননি। আর তাতেই এখন ঘরে ঘরে কার্যত গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি। কোথাও বউমা খুশি তো শাশুড়ির মেজাজ গরম। কোনো পরিবারে আবার উলটো। কোথাও আবার বাড়ির পুরুষ সদস্যটি মা এবং স্ত্রীর ফর্ম পূরণ করে দিয়েছিলেন। সেই বেচারা পড়ে গিয়েছেন মহা ফাঁপরে।
অন্নপূর্ণার টাকা পাওয়া নিয়ে বারাসত, হাবড়া, দেগঙ্গা থেকে বসিরহাটসহ উত্তর ২৪ পরগনার বিভিন্ন ব্লকে এমন ঘটনার ছড়াছড়ি। বিশেষ করে কোনো পরিবারের একাধিক মহিলা সদস্য যদি আবেদন করে থাকেন এবং তাঁদের মধ্যে কারও অ্যকাউন্টে টাকা ঢোকার প্রক্রিয়া ‘বিবেচনাধীন’ বা ‘আন্ডার প্রসেস’ দেখায়, তখম বিভ্রান্তি চরমে উঠছে। কারণ, একই পরিবার হওয়ায় প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার বেশিরভাগ মাপকাঠিও সাধারণত অভিন্ন হয়। তাহলে কেন টাকা এল না? বিভ্রান্তি কাটছে ব্লক অফিসে গিয়ে। তার আগে আচমকা উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পারিবারিক পরিস্থিতি। মহিলাদের প্রশ্নবাণে নাজেহাল অবস্থা সরকারি আধিকারিকদের। জেলা প্রশাসনের এক কর্তা মজার ছলে বলছিলেন, ‘অন্নপূর্ণা তো গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে দিল মশাই!’
বারাসতের দত্তপুকুর থানা এলাকার বাসিন্দা সৌমি পাল। একই সংসারে থাকেন পুত্রবধূ সুস্মিতা পাল দাস। দু’জনেই অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য আবেদন করেন। শাশুড়ি সৌমিদেবীর অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকেছে মঙ্গলবার। কিন্তু বউমা সুস্মিতা অনলাইনে দেখেছেন, তাঁর আবেদন ‘আন্ডার প্রসেস’। সুস্মিতার খেদ, ‘শাশুড়ির টাকা ঢুকল। আমিই তো ওঁর ফর্ম পূরণ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমি পেলাম না।’ অশোকনগর শহরের বাসিন্দা অনিন্দিতা বসু। তাঁর বউমা সৃজা বসুর অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকলেও অনিন্দিতাদেবীর নামের পাশে লেখা, ‘ফর ফারদার ভেরিফিকেশন’। তার নীচে লেখা, ‘আন্ডার এনকোয়ারি গভর্নমেন্ট এমপ্লিয়ি’। অনিন্দিতাদেবী বলছিলেন, ‘বউমার টাকা এসেছে বলে রাগ নেই। কিন্তু একসঙ্গে আবেদন করেও আমারটা এতদিন আটকে আছে কেন, বুঝতে পারছি না।’ প্রশাসনের অবশ্য আশ্বাস, প্রক্রিয়াধীন মানেই আবেদন বাতিল নয়। আবেদন যাচাই, নথিপত্র পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর টাকা দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। সেই সময়টা দিতে হবে।