Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

পোশাকে ঘরোয়া রং

পোশাকে  ঘরোয়া রং
  • ১০ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হাতের কাজের ক্লাস। অথবা কর্মশিক্ষার ক্লাস। স্কুলের রুটিনে বরাদ্দ আধ ঘণ্টা বা চল্লিশ মিনিটের সেই অভ্যেস পেরিয়ে এসেছেন অনেকেই। কেউ বা পরের প্রজন্মকে এখন এসবে অভ্যস্ত হতে দেখছেন। মনে পড়ে, সেসব ক্লাসে প্রথম শেখা ছোট্ট রুমালে বাঁধনির কাজ? কীভাবে সুতো বেঁধে প্রাকৃতিক রঙে রঙিন হয়ে উঠত এক টুকরো কাপড়? শিক্ষকদের দেখিয়ে দেওয়া মন্ত্রে কখনও ফুলের পাপড়ি, কখনও বা ফলের বীজ দিয়ে রং করা হতো সেই কাপড়ে। যা আদতে প্রাকৃতিক রঞ্জক বা ন্যাচরাল ডাই। আধুনিক ফ্যাশনে যার কদর রয়েছে। ইচ্ছে করলে বাড়িতেই এই পদ্ধতিতে কাপড়ে রং করতে পারেন। 

Advertisement


ইতিহাস


প্রাকৃতিক রঞ্জক হল এমন রং যা উদ্ভিদ, প্রাণী এবং খনিজের মতো প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়। এই ধরনের রং ব্যবহার করার প্রচলন প্রাচীনকাল থেকেই শুরু হয়েছে। ১৮৫৬ সালের আগে, শুধুমাত্র প্রাকৃতিক রঙই পাওয়া যেত। ১৮৫৬ সালে প্রথম সিন্থেটিক রঞ্জক তৈরি করা হয়। খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ অব্দ থেকে প্রাকৃতিক রঞ্জকের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৩৪০০ অব্দে জর্জিয়া অঞ্চলে ফ্লাক্স ফাইবারে রং করার জন্য প্রাকৃতিক রঞ্জক ব্যবহৃত হয়েছিল। প্রাচীনকালে উদ্ভিদের শিকড়, পাতা, বাকল, বীজ এবং প্রাণীদের চামড়া ও পোকামাকড় থেকে প্রাকৃতিক রঞ্জক তৈরি করা হতো। মাটি, পাথর এবং খনিজ লবণের মাধ্যমেও রঞ্জক তৈরি করা হতো। প্রাচীন চীন, ভারত, মিশরীয় সংস্কৃতিতে প্রাকৃতিক রঞ্জকের ব্যবহার দেখা যায়। চীনে পাঁচ হাজার বছর আগে গাছপালা, বাকল এবং পোকামাকড় দিয়ে রং করার প্রচলন ছিল। প্রাচীন ভারতের সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান থেকে উদ্ভিজ্জ রং দিয়ে রং করা একটি তুলোর টুকরো পাওয়া গিয়েছে, যা প্রাকৃতিক রঞ্জকের ব্যবহার প্রমাণ।


ডিজাইনারের মত


প্রায় ৩০ বছর ধরে ফ্যাশন দুনিয়ায় কাজ করছেন ‘মোহর’ বুটিকের কর্ণধার নন্দিনী বসু। ন্যাচারাল ডাই নিয়ে কাজ করেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘এই ধরনের হাতের কাজ অবশ্যই বাড়িতে করা যায়। ন্যাচারাল ডাইয়ের কিছু পদ্ধতি রয়েছে। ডাই করাটা শক্ত নয়। কারণ প্রাকৃতিক জিনিস থেকেই রং তৈরি হয়। চা পাতা, কাঁচা হলুদ, ডালিমের খোসা, গাঁদা ফুলের পাপড়ি দিয়ে রং করা যায়। এর পরের পদ্ধতিটা কঠিন। রং স্থায়ী করতে হবে। সেটা ঠিক মতো করে ফেলতে পারলে বাড়িতেও ডাই করে নেওয়া সম্ভব। ডাই করে নেওয়ার পর কালার ফিক্স করতে হয়। তারপর হিট ট্রিটমেন্ট দিতে হয়। বাড়িতে করলে প্রেসার কুকারে করতে পারেন। স্টিম দিতে হবে। তবেই রং স্থায়ী হবে।’ 


প্রাকৃতিক রঙে পোশাক রাঙানোর পাঠ দিয়েছিল স্কুল। পরবর্তীতে অনেকে সেটাই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। প্রকৃতি থেকে নেওয়া নানা উপকরণে ফ্যাব্রিক রং করার পর তা ডিজাইন করে বিক্রি করেন। কেউ বা শখে নিজের জন্যই তৈরি করেন রঙিন পোশাক। শাড়ি, শার্ট, টপ, ধুতি, ওড়না, স্কার্ট, ব্লাউজ, কোঅর্ড সেট, প্যান্ট— সব ধরনের পোশাকেই ন্যাচারাল ডাই ফ্যাশন সচেতনদের অন্যতম পছন্দ। এমনকী পর্দা, বিছানার চাদর, টেবিল কভার সবই এভাবে রং করা যায়। কোন রং কোন উপাদান থেকে পাওয়া সম্ভব, তার একটা তালিকা দেওয়া হল। পাশাপাশি কীভাবে বাড়িতে ন্যাচারাল ডাই করবেন, তার পদ্ধতিরও হদিশ রইল। আপনার এবার সময় করে পরীক্ষা করার পালা।


রঙের উপকরণ


গোলাপি: বেরি, চেরি, লাল, গোলাপি গোলাপ, অ্যাভোকাডোর খোসা, বীজ
নীল: ইন্ডিগো, লাল বাঁধাকপি, ব্লুবেরি, বেগুনি আঙুর 
কমলা: গাজর, পেঁয়াজের খোসা
ধূসর এবং কালো: ব্ল্যাকবেরি, আখরোটের খোসা।
খয়েরি: গাছের শিকড়, ওক গাছের বাকল, আখরোটের খোসা, চা, কফি
সবুজ: পালং শাক, পুদিনা পাতা, স্ন্যাপড্রাগন, ঘাস।
হলুদ: তেজপাতা, গাঁদা, সূর্যমুখীর পাপড়ি, ড্যান্ডেলিয়ন ফুল, পেপারিকা, হলুদ, সেলারি পাতা।


কীভাবে ফ্যাব্রিক তৈরি করবেন


সুতি, লিনেন, সিল্কের মতো প্রাকৃতিক ফ্যাব্রিক ব্যবহার করতে হবে। ন্যাচরাল ডাইয়ের ক্ষেত্রে সিন্থেটিক ফ্যাব্রিক ব্যবহার করলে রং ভালো ধরবে না। প্রথমেই ফ্যাব্রিকের কাপড় ভালো করে ধুয়ে শুকিয়ে নিন। এরপর একটি বড় গামলা বা বালতিতে অন্তত আট কাপ ঠান্ডা জলের মধ্যে অর্ধেক কাপ নুন মিশিয়ে নিন। অথবা জলের চার ভাগের এক ভাগ ভিনিগার মিশিয়ে নিন। ওই জলের মধ্যে ফ্যাব্রিক ডুবিয়ে রাখুন অন্তত এক ঘণ্টা। এরপর ঠান্ডা জলে কাপড় ধুয়ে নিন। 


‌শুকনো করার পদ্ধতি


যে টেবিলে রেখে কাপড়ে ডাই করবেন, সেই জায়গার উপরে একটা আস্তরণ দিয়ে দিন। হাতেও রবারের গ্লাভস পরে নিন। এমন পোশাক পরুন, যেখানে দাগ লাগলেও কোনও ক্ষতি নেই। এবার একটি স্টিল অথবা হিট প্রুফ কাচের পাত্রে ডাইয়ের উপকরণগুলি রাখুন। দ্বিগুণ পরিমাণ জল দিয়ে পাত্রটি ভরে ফেলুন। উপকরণগুলি থেকে গাঢ় রং না বেরনো পর্যন্ত ফোটাতে হবে। ভালো ভাবে সেদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর উপকরণগুলি ফেলে দিয়ে পাত্রে শুধুমাত্র জলটুকু রাখুন। এবার যে কাপড়ে রং করছেন, তা ওই তরলের মধ্যে দিয়ে অন্তত এক ঘণ্টা ফোটাতে হবে। মাঝেমধ্যে নেড়ে দেবেন। গাঢ় রং চাইলে এক ঘণ্টা ফুটিয়ে নেওয়ার পর ঠান্ডা জলে ডুবিয়ে রাখুন। ভালো করে ধুয়ে শুকিয়ে নেওয়ার পর ডাইয়ের রং আপনি দেখতে পাবেন। 


উপকারিতা


• সম্পূর্ণ প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত উপাদানে তৈরি হয় এবং পরিবেশে বিরূপ প্রভাব ফেলে না বলে ন্যাচারাল ডাই পরিবেশবান্ধব।
• সিন্থেটিক ডাই থেকে উদ্ভুত রাসায়নিক উপাদান শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। অপরদিকে ন্যাচারাল ডাই শরীরের ক্ষতি করে না। 


নন্দিনী স্পষ্ট বললেন, ‘আগের থেকে মানুষ এখন ন্যাচারাল ডাই নিয়ে বেশি সচেতন। কেমিক্যাল ডাইয়ের তুলনায় ন্যাচারাল ডাইয়ের খরচ বেশি। কারণ সামগ্রীর খরচ বেশি। ইকো ফ্রেন্ডলি জিনিস অনেকে সচেতনভাবেই কেনেন। আর একদল প্রাকৃতিক ডাইয়ের জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে কেনেন। এগুলো সাধারণত প্যাস্টেল, ন্যুড শেড হয়। যাঁরা এগুলো পছন্দ করেন, তাঁরা নেন। আমরা দুই ধরনের ক্রেতাই দেখি। তবে আমার ধারণা ন্যাচারাল ডাইয়ের প্রতি আকর্ষণ, সচেতনতা বাড়ছে। সেজন্য আসল মাড এবং আজরখ প্রিন্টের চাহিদা এখন অনেক বেশি।’ 


                 স্বরলিপি ভট্টাচার্য

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ