Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গৃহস্থ

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতের বহুজায়গায় দেখতে পাই শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তদেরকে ‘গৃহস্থের কর্তব্য’ সম্বন্ধে পরিষ্কার ভাষা উপদেশ দিচ্ছেন।

গৃহস্থ
  • ১০ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতের বহুজায়গায় দেখতে পাই শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তদেরকে ‘গৃহস্থের কর্তব্য’ সম্বন্ধে পরিষ্কার ভাষা উপদেশ দিচ্ছেন। একবার এক গৃহীভক্ত তাঁকে জিজ্ঞাসা করছেন, “আমরা গৃহী, আমাদের কি ভগবানকে লাভ করা সম্ভব?” শ্রীরামকৃষ্ণ উত্তর দিচ্ছেন “কেন সম্ভব নয়? ভগবান সকলের মধ্যেই বিরাজ করছেন, তিনি অন্তর্যামী, সর্বদা তাঁকে স্মরণ করবে ও নিজের কাজ করে যাবে। তাহলেই সব ঠিকঠাক চলবে”। এইভাবেই শ্রীরামকৃষ্ণ গৃহস্থদের উৎসাহিত করতেন—কথামৃত তার সাক্ষ্য বহন করে।

Advertisement

এটা আমাদের বুঝতে হবে যে গৃহী গৃহে বাস করলেও ঘরের ভেতরে বা বাইরে থাকার স্বাধীনতা তার আছে। এই স্বাধীনতাটুকু ছাড়া গৃহ পরিণত হয় কারাগারে। গৃহ বন্দিশালা নয়, একটি পরিবারের মিলনক্ষেত্র। আমাদের দেশে গৃহবাসীর জীবন হয়ে পড়েছিল বন্দিজীবনের মতো। আমাদের মন গৃহজীবনের বাইরে যেত না, আমরা বদ্ধ হয়েছিলাম ছোট্ট সীমানার মধ্যে, বিরাটের অনুভূতি হারিয়ে, আমাদের মন সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়েছিল, কেবল আমি-আমার চিন্তায় ব্যস্ত। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, ‘আমি ও আমার ত্যাগ কর’। আমরা শুধু আমি ও আমারই জানতাম, তার বাইরে আর কিছু নয়। দেশের প্রকৃত অবস্থা, হাজার হাজার মানুষের বুভুক্ষা ও উপবাসের কাহিনী, তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন, চরমতম শোষণ সবকিছুই ছিল আমাদের অজানা। আমরা যেন আমাদের গৃহকোণকে বন্দিগৃহ করে তুলেছিলাম। ফলস্বরূপ আটশো বছর ধরে ক্রমাগত আমরা নেমে গেছি। বহিঃশত্রু আক্রমণ চালিয়েছে। আমরা স্বাধীনতা হারিয়েছি। এরপর শ্রীরামকৃষ্ণ এসে গৃহস্থদের দিলেন সত্যপথের সন্ধান, দিলেন আত্মমর্যাবোধ।
‘মনুস্মৃতি’-তে একটি শ্লোক আছে, যেখানে গৃহস্থের মহত্ত্ব এইভাবে বর্ণনা করা হয়েছে—
যস্মাৎ ত্রয়োঽপ্যাশ্রমিণো জ্ঞানেনান্নেন চান্বহম্‌।
গৃহস্থেনৈব ধার্যস্তে তস্মাজ্জ্যেষ্ঠাশ্রমো গৃহী।।
চতুরাশ্রমের মধ্যে গৃহস্থাশ্রমই শ্রেষ্ঠ, কেননা, এই আশ্রমই অন্য তিন আশ্রমের মানুষকে অন্ন ও শিক্ষা প্রদান করে থাকে। ব্রহ্মচারী উপার্জন করে না, বাণপ্রস্থীও করে না, সন্ন্যাসীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। একমাত্র গৃহস্থই অর্থোপর্জন করে। উৎপাদনমূলক কাজে নিয়োজিত থাকে। সমগ্র সমাজকে প্রতিপালন করে। তবু সে-ই নিজেকে ছোটভাবে। প্রকৃতপক্ষে এই অবদানের জন্য তার গর্বিত হওয়া উচিত। গৃহস্থের শক্তিতেই সমাজ গতিশীল। এই কারণেই গৃহস্থাশ্রম, আশ্রম চতুঃষ্টয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। মনুর বক্তব্য আজ আমাদের কাছে নতুন ভাষায় প্রতিভাত। আমি স্বাধীন নাগরিকের আধুনিক সংজ্ঞার কথা বলতে চাইছি। একজন নাগরিক কেবলমাত্র তার ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে যুক্ত থাকবে না, সমগ্র দেশের কল্যাণ কামনায় নিয়োজিত হবে। দেশের অগ্রগতির ভাবনা মাথায় নিয়ে কাজ করার মধ্য দিয়েই ব্যক্তির প্রকৃত নাগরিক বা সৎ গৃহস্থে উত্তরণ সম্ভব। 
স্বামী রঙ্গনাথানন্দের ‘গৃহস্থ ধর্ম’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ