সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: শুশুকের চর্বিতে রয়েছে যৌনশক্তি বর্ধক রসদ—স্রেফ এই গুজবেই আরও বেশি বিপন্ন হয়ে পড়ছে ডলফিন, তিমির এই নিকট আত্মীয়। গঙ্গায় নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে শুশুকদের। পিছনে রয়েছে একটি অসাধু চক্র। তারাই মূলত রটিয়ে যাচ্ছে, যৌনবর্ধক ওষুধ তৈরির মূল কাঁচামাল শুশুকের চর্বি। মদতও দেওয়া হচ্ছে শুশুক মেরে চর্বি সংগ্রহের কাজকে। কিন্তু, সেই চর্বি কোথায় যাচ্ছে, কে নিচ্ছে, তার স্পষ্ট কোনও সূত্র আজও মেলেনি। তবে, গোপনে নাকি বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। এমনটাই দাবি উঠছে বিভিন্ন মহলে। যদিও প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুশুকের চর্বি দিয়ে যৌনশক্তি বৃদ্ধির ওষুধ তৈরির কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এসব অন্ধবিশ্বাসের উপর ভর করে রটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেটাই এখন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেদার শুশুক নিধন যজ্ঞ চলছে গঙ্গায়। গভীর সঙ্কটে পড়ছে গঙ্গার জীববৈচিত্র।
বনদপ্তর সূত্রে খবর, ১৯৮০-৮২ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী গঙ্গায় শুশুকের সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ হাজার। এখন মাত্র কয়েকশো বেঁচে রয়েছে। চক্রটি এভাবে সক্রিয় থাকলে আগামী ক’ বছরের মধ্যেই সংখ্যাটি একেবারে তলানিতে ঠেকবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। বনদপ্তরের এক আধিকারিক বলছিলেন, একটা গোষ্ঠীর মানুষের বিশ্বাস, শুশুকের চর্বি গলানো তেল নাকি যৌনশক্তি বাড়ানোর ওষুধ তৈরির কাঁচামাল। এমন গুজবেই গঙ্গার আদুরে জলজ প্রাণীটিকে মেরে ফেলা হচ্ছে। সেই তেলও নাকি বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। বিপন্ন প্রজাতির তালিকাভুক্ত শুশুক বাঁচাতে সম্প্রতি বনদপ্তরের উদ্যোগে কাটোয়ায় একটি বৈঠক হয়। সেখানে একাধিক উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
গঙ্গায় শুশুক হত্যা রুখতে বদ্ধপরিকর পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদ। সভাধিপতি শ্যামাপ্রসন্ন লোহার বলেন, ‘একটি অসাধু চক্র এই নিরীহ জলজ প্রাণীটিকে গোপনে হত্যা করছে। তাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আমি কাটোয়ার ওই বৈঠকে ছিলাম। সেখানে সচেতনতামূলক প্রচারের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ পূর্ব বর্ধমানের এডিএফও সৌগত মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘গঙ্গায় শুশুক বাঁচাতে আমরা প্রায়ই সচেতনতামূলক প্রচার করি। অনেক সময় মৎস্যজীবীদের মাছ ধরার জালে প্রাণীটি আটকে যায়। সেটিকে না মেরে যাতে জলে ছেড়ে দেওয়া হয়, তারজন্য কর্মশালা করা হয়।’
কিন্তু তাতেও রক্ষা করা যাচ্ছে না শুশুকদের। জলজ প্রাণীবিদরা বলছেন, স্বভাব বৈশিষ্ট্যে শুশুকরা ঘোরতর প্রেমিক। জোড়ায় জোড়ায় ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে। সেই সুযোগটাই নেয় হত্যাকারীরা। খুব সহজেই শিকার করে ফেলে তারা। তার উপর এদের জীবন বেশ ঠুনকো। জল থেকে তোলার ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেই মারা যায়। সেই কারণে জালে জড়িয়ে গেলে দ্রুত এই প্রাণীকে জলেই ছাড়িয়ে ফেলতে হয়। কিন্তু পাচারকারীরা বিশেষ ধরনের জাল দিয়ে শুশুক শিকার করে চলছে। বনদপ্তরের এক আধিকারিকও জানিয়েছেন, শুশুকের চর্বি থেকে যৌনশক্তি বৃদ্ধির ওষুধ তৈরি হয়, এমন কোনও প্রমাণ আজও পাওয়া যায়নি। শুধুমাত্র অন্ধবিশ্বাসের কারণেই একটি চক্র প্রাণীটিকে হত্যা করে চলেছে। কয়েক হাজার টাকায় মৃত শুশুক বিক্রি করা হয়। এখনই সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে গঙ্গায় বিলুপ্ত হয়ে যাবে শুশুক।