Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

ঠাকুরবাড়ির দোল

জোড়াসাঁকোর বাড়িতে রঙের উৎসবের দিনটি কেমন কাটত, সেকথা রানি চন্দকে জানিয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথ। এমনই এক দোলের দিন নাটকে অভিনয় করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ

ঠাকুরবাড়ির দোল
  • ১ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

জোড়াসাঁকোর বাড়িতে রঙের উৎসবের দিনটি কেমন কাটত, সেকথা রানি চন্দকে জানিয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথ। এমনই এক দোলের দিন নাটকে অভিনয় করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। ঠাকুরবাড়ির বসন্তোৎসবের নানা কাহিনি শোনালেন পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়।

Advertisement

আগের রাতে চাঁচরের আলোয় মিশে যায় রুপো-গলা জোছনা-আলো। চাঁচরের রাত ফুরোলেই রঙিন সকাল। দোলের আনন্দে ছোটোরা মাতোয়ারা হয়। সেই আনন্দে, ভাগ বসায় বড়োরাও। রঙে,আবিরে সে কী আনন্দ! রং লাগে মনে, মন ভরে ওঠে হাসিতে-খুশিতে। রং লাগে প্রকৃতিতেও। একটাই রং, লাল। গ্রামের পথে পথে এখন শুধুই লাল পলাশ। ফুলে ছেয়ে যাওয়া পলাশগাছ কোথাও দাঁড়িয়ে আছে একলা-একা, কোথাও-বা সারিবদ্ধভাবে।
ঘরের কাছের পলাশগাছটার দিকে হয়তো তাকানোর ফুরসুত পাই না, অথচ দোলের আগে-পরে পলাশ দেখতে  ছুটি পুরুলিয়ায়। শান্তিনিকেতনে পলাশ-মালায় সজ্জিত হয়ে নৃত্যগীতির যে বসন্ত-বন্দনা, সে অনুষ্ঠানে এখন আর সাধারণের প্রবেশাধিকার নেই। তাই দোলে শান্তিনিকেতনে ছোটার প্রবণতা খানিক কমেছে। আজকের ছোটোরা বালতিতে রং গুলে পিচকিরিতে ভরে হইহই করে দোলযাত্রায় শামিল হয় কি? নিশ্চয়ই হয়, তবে তাদের উদ্দীপনাতেও এখন ভাটার টান। সেই ভাটায় জোয়ার আসতে পারে, যদি তারা শোনে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির ছোটোরাও দোলে কী আনন্দই না করত! ঠাকুরবাড়ির দোল-গল্প শুনতে শুনতে আজকের ছোটোরাও হয়তো নিজেদের মতো আনন্দ করবে, রং-আবিরে রঙিন হয়ে উঠবে।
ঠাকুরবাড়ির এই দোলের আনন্দ-যজ্ঞে সবার নিমন্ত্রণ ছিল না। বাড়ির মানুষজনের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ ছিল, দোলের আনন্দ-সমারোহে শামিল হত ছোটোরাও। জোড়াসাঁকোর দেউড়ি, বাড়ির উঠোন মজা-তামাশায় ভরে উঠত। সব আনন্দ এসে যেন সেখানেই জড়ো হত। অবনীন্দ্রনাথ সেসব গল্প মুখে মুখে বলে গিয়েছিলেন রানি চন্দকে। রানির অনুলিখনে বেরিয়েছে ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’ বইটি। সে বই থেকে জানা যায় দোল-সকালে দেউড়ি  ‘গমগম’ করত। ‘গামুর গুমুর’ ঢোল বাজত। শোনা যেত ‘হোরি হ্যায় হোরি হ্যায়’। বচ্ছরভর ঢোল দেয়ালে টাঙানো থাকত। দোলের দু-চার দিন আগে‌ দেয়াল থেকে ঢোল নামিয়ে কীসব মাখানো হত। বলা ভালো, ঢোল যাতে ভালো বাজে, সে কথা ভেবেই এটা-সেটা মাখানোর চেষ্টা। ঢোল যেত দেউড়ির দারোয়ানদের কাছে, অন্যটি অবনীন্দ্রনাথের পিতৃদেব গুণেন্দ্রনাথের কাছে। গুণেন্দ্রনাথের ঢোল বাড়তি যত্নে বছরভর রাখা থাকত, ‘সবুজ মখমল দিয়ে মোড়া, লাল সুতোয় বাঁধা।’
দোলের দিন সাতসকালেই শুরু হয়ে যেত ঢোল-বাদন। ঢোল বাজত, গান হত, আর থেকে থেকেই সমবেত কণ্ঠে শোনা যেত ‘হোরি হ্যায়, হোরি হ্যায়।’ শুধু গান নয়, দেউড়িতে নাচও হত। বাড়ির ছোটোরা ভিড় করে দেখত। অবনীন্দ্রনাথও দেখতেন। তাঁর লেখা থেকেই জানা যায়, পুরুষরা মেয়ে সেজে নাচত। ঠাকুরবাড়িতে ওড়িয়া-ভাষী কয়েকজন কাজের লোক ছিল। তারা জড়ো হত দক্ষিণদিকের বাগানে। ওই বাগানে হাতে লাঠি নিয়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে নাচত। নাচের সঙ্গে চলত লাঠি-খেলা।
দারোয়ানদের মধ্যে একজনের নাম ছিল মনোহর সিং। মুখে তার ধবধবে সাদা দাড়ি। ছোটোরা ভাবত, আহা, যদি ওই দাড়িতে হাত বোলানো যেত! তার কাছে গেলে সে আদর করে যে কাছে টেনে নিত, তা নয়, বরং তেড়ে আসত। ছোটোরা একটু ভয়ই পেত তাকে। দোলের দিন মনোহর সিংয়ের দাড়িতে হাত বুলানোর ইচ্ছেটা আবির দেওয়ার আছিলায় মিটিয়ে নেওয়ার সুযোগ মিলত। মনের গোপনে রাখা ইচ্ছেটা মিটিয়ে নিতেন অবনীন্দ্রনাথও। তাঁর লেখায় আছে, সেই আনন্দ-সুখের বিবরণ, ‘হোলির দিনে এই দেউড়ি গমগম করত; লালে লাল হয়ে যেত মনোহর সিং-এর শাদা দাড়ি পর্যন্ত। ওই একটি দিন তার দাড়িতে হাত দিতে পেতুম আবির মাখাতে গিয়ে। সেদিন আর সে তেড়ে আসত না।’
নীচে বাড়ির ছোটোদের দোল খেলা, বাড়ির দোতলায় অন্য ছবি। অবনীন্দ্রনাথের ‘বাবামশায়’য়ের বন্ধুবান্ধবরা আসতেন। ঘরে ফরাশ পাতা হত। বাবামশায়ের সামনে থাকত গোলাপজলের পিচকারি। আবির দিয়ে দেওয়া হত আলপনা। বাবামশায়ের বন্ধু অক্ষয়বাবু তানপুরা বাজাতেন। নাচ হত, গান হত। বড়োদের এই দোলোৎসবে ছোটোদের যাওয়া বারণ ছিল। অবনীন্দ্রনাথ স্বীকার করেছেন, ‘উঁকিঝুঁকি মারতুম এদিক ওদিক থেকে।’
বৈঠকখানার এই দোলোৎসব অবনীন্দ্রনাথের পছন্দের ছিল না। বলেছেন, ‘শখের দোল, শৌখিনতার চূড়ান্ত।’ ঠাকুরবাড়িতে বেশ ক’জন রাজপুত দারোয়ান ছিল। প্রাণের আনন্দে দোলের দিনে তারা হইহই করত, সে সব দূর থেকে ছোটোরা উপভোগ করত। খুব ভালো লাগত অবনীন্দ্রনাথেরও।
ঠাকুরবাড়িতে ছোটোরা সকলেই কম-বেশি দোল খেলত। বড়োলোক বাড়িতে পিতলের পিচকারিই স্বাভাবিক। কিন্তু ঠাকুরবাড়িতে পিতলের নয়, অভিভাবকরা কিনে দিতেন টিনের পিচকারি। আসলে ঠাকুরবাড়িতে দৈনন্দিন জীবনে কখনোই বৈভব দেখানোর চেষ্টা ছিল না। খুব সাদামাঠা ছিল তাদের জীবনযাপন। অবনীন্দ্রনাথের ‘জোড়াসাঁকো ধারে’ বইতে আছে, ‘আমাদের জন্য আসত টিনের পিচকারি। ওইতেই আনন্দ। টিনের পিচকারি বালতি-ভরা লাল জলে ডুবিয়ে, যাকে সামনে পাচ্ছি পিচকারি দিয়ে রং ছিটিয়ে দিচ্ছি আর তারা চেঁচামেচি করে উঠছে, দেখে আমাদের ফুর্তি কী!’
রং খেলার পর বাড়ির ছোটোরা এ বাড়িতে, ও বাড়িতে যেত। অন্দরমহলে গিয়ে বড়োদের আবির দিত। মাখানোর ব্যাপার ছিল না, হাতে একটু আবির নিয়ে দিত বড়োদের পায়ে। তাঁরা মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করতেন। বড়োদের আবির মাখানোর অনুমতি ছিল না, যত খুশি মাখানো যেত সমবয়সি ছোটোদের। অবনীন্দ্রনাথ তাদের কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মাখাতে শুরু করতেন মাথায়। ছোটোদের রং মাখানো যেত। বড়োদের ক্ষেত্রে মাখানোর হুকুম ছিল না। অবনীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ওই পা পর্যন্ত পৌঁছত আমাদের হাত।’
ঠাকুরবাড়ির সবাই যে রং মেখে সঙ সাজাতেন, তা নয়। ছোটোরা অংশ নিলেও বড়োরা অনেককেই রং খেলতেন না। ছোটোরা পায়ে যে আবির দিয়ে যেত, সেই আবিরের ছোঁয়াতেই তাদের দোল-পর্ব সাঙ্গ হত। সত্যিই কি সাঙ্গ হত! ‘বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’, প্রকৃতির রূপ বদলের সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুরবাড়িতে শুরু হয়ে যেত  বসন্তোৎসব উদযাপনের প্রস্তুতি। নাটক-নাচ-গান— সবই বসন্ত নিয়ে। দোলের কথা মাথায় রেখে চটজলদি নাটকও লিখে ফেলা হত। রবীন্দ্রনাথের দিদি স্বর্ণকুমারী দেবী ‘বসন্ত-উৎসব’ নামে গীতিনাট্য রচনা করেছিলেন। সে নাটকের অভিনয় হয়েছিল জোড়াসাঁকোয়। রবীন্দ্রনাথ নিজে সে নাটকে অভিনয় করেছিলেন। অভিনয় করেছিলেন কবির ‘নূতনদা’ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, এমনকি কবির বউঠান কাদম্বরী দেবীও। রবীন্দ্রনাথের মতো জ্যোতিরিন্দ্রনাথের আত্মজীবনীর নামও ‘জীবনস্মৃতি’। সে বইতে আছে, বসন্ত-উৎসবের হারানো জাঁকজমক ফিরিয়ে আনতে তিনি কতখানি সক্রিয় হয়ে হয়েছিলেন। অবনীন্দ্রনাথের পিতৃদেব গুণেন্দ্রনাথ ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ‘গুণুদাদা’। খুব ভালো ছবি আঁকতেন তিনি। তাঁর সঙ্গে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের খুব মধুর সম্পর্ক ছিল। এক সময় যেভাবে বসন্ত-উৎসব পালিত হত, ঠিক তেমনভাবে আবারও পালিত হোক, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নিজের ইচ্ছের কথা তাঁকে জানানো মাত্র ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তিনি। হয়তো ‘গুণুদাদা’ও তেমনই কিছু ভেবেছিলেন, ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ উসকে দেওয়া মাত্রই তিনি শুরু করে দিলেন বসন্ত-উৎসব উদযাপনের প্রস্তুতি। বসন্ত-সন্ধ্যায় সমস্ত বাগান সেজে উঠল রঙিন আলোয়। রংচঙে এত আলো, যে দেখে মনে হয়েছিল স্বর্গের ‘নন্দনকানন’। আনা হয়েছিল রং-পিচকারি-আবির-কুমকুম। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের লেখা থেকে জানা যায়, খুব আবিরখেলা হয়েছিল। গান-বাজনায় বড়ো আনন্দময় হয়ে উঠেছিল বসন্ত-সন্ধ্যা। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ‘বসন্ত লীলা’ নামে একটা গীতিনাট্য রচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথও লিখেছিলেন ‘বসন্ত’, এটাও গীতিনাট্যের বই। কবি অত্যন্ত স্নেহ করতেন নজরুলকে। বিদ্রোহী কবি তখন কারারুদ্ধ। রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে উৎসর্গ করা বই কারাগারে পৌঁছে দিয়েছিলেন পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়। রবীন্দ্রনাথ বই উৎসর্গ করেছেন জেনে আনন্দে আত্মহারা হয়েছিলেন নজরুল। প্রথমে জেলের ইউরোপিয়ান ওয়ার্ডার বিশ্বাস করেননি, পরে বুঝতে পেরেছেন, সত্যিই ‘পোয়েট টেগোর’ এই বন্দিকে বই উৎসর্গ করেছেন। বন্দি থাকা মানুষটি অপাঙক্তেয় নয় বুঝতে পারার পর একমুহূর্তের জন্য হলেও গারদের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। ‘বসন্ত’ হাতে পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় গারদে প্রবেশের পর নজরুল তাঁকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে নাচতে শুরু করেছিলেন। নাচতে গিয়ে বইটাই পড়ে গিয়েছিল মাটিতে। মাটি থেকে তুলে মাথায় ঠেকিয়ে নজরুল বুকে চেপে ধরেছিলেন রবীন্দ্রনাথের ‘বসন্ত’।
শান্তিনিকেতনের যে বসন্তোৎসব, তা প্রথম হয়েছিল এক বালকের উদ্যোগে। কবি-পুত্র শমীন্দ্রনাথের ছোটো মাথায় প্রথম এই বড়ো ভাবনা এসেছিল। ছোটোরা তো এমনভাবেই বড়ো কিছু সহজে ভেবে ফেলে। দোলযাত্রায় নয়, শান্তিনিকেতনে প্রথম বসন্তোৎসব হয়েছিল শ্রীপঞ্চমীতে।

সম্পর্কিত সংবাদ