Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

মায়াপুর ও নবদ্বীপে দোল উৎসব

বাতাসে রঙের নেশা লেগেছে। পলাশ শিমুল গাছগুলোয় আর পাতা দেখা যাচ্ছে না। যেদিকে চোখ যায় কেবলই লাল ফুলের সমারোহ। নীল দিগন্তে সত্যিই যেন ফুলের আগুন জ্বলছে। প্রকৃতি জুড়েই রঙের হিল্লোল।

মায়াপুর ও নবদ্বীপে দোল  উৎসব
  • ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বাতাসে রঙের নেশা লেগেছে। পলাশ শিমুল গাছগুলোয় আর পাতা দেখা যাচ্ছে না। যেদিকে চোখ যায় কেবলই লাল ফুলের সমারোহ। নীল দিগন্তে সত্যিই যেন ফুলের আগুন জ্বলছে। প্রকৃতি জুড়েই রঙের হিল্লোল। বাতাসে বইছে রঙিন নেশা। এ নেশায় ভক্তপ্রাণে পুজো আর প্রেম মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। লোকে লোকারণ্য চারপাশ। খোল করতালের ধ্বনিতে বাজছে হরে কৃষ্ণ নাম। নবদ্বীপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়েই শুরু হয়ে গিয়েছে দোল উৎসব। সপ্তাহব্যাপী এখানে দোলের উৎসব। আনন্দের রেশ যেন বসন্তের ছোঁয়ায় মনকে ভরিয়ে রাখে সারাক্ষণ। তারই সঙ্গে জুড়ে যায় গৌর পূর্ণিমা। তাই নবদ্বীপে দোলের সময় দ্বৈত উৎসবের আয়োজন হয়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব দিবসও বসন্ত পূর্ণিমায়। তাই রঙের উৎসব, কৃষ্ণনাম জপ ও গৌর পূর্ণিমার মেলা একযোগে অনুষ্ঠিত হয় এখানে ফাগুন মাসে। ধর্ম আর উৎসব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। রঙের খেলায় অংশগ্রহণ করেন দেশ বিদেশের সাধক সাধিকারা। কীর্তন মেলা, কথা মেলা, হরিনাম সংকীর্তন সবই চলে পাশাপাশি। ফাগের রং ওড়ে আকাশে বাতাসে। বসন্তের আবেগ প্রকৃতি ছাড়িয়ে আমাদের মন রাঙিয়ে দিয়ে যায়। এক ভিন্নধর্মী আবেশ ছড়িয়ে থাকে নবদ্বীপের পরিমণ্ডল জুড়ে। 

Advertisement

শহরের এক বহু পুরনো রাস্তা ধরে চলেছি আমরা ভক্তদের ভিড়ে মিশে, হরিনাম সংকীর্তনের সুরে গলা মিলিয়ে। এই রাস্তাতেই নবদ্বীপের বিভিন্ন মন্দিরের অবস্থান। একটি মন্দিরের নামেই রাস্তার নাম শ্রীবাস অঙ্গন রোড। শ্রীবাস অঙ্গন মন্দির ছাড়াও এখানে রয়েছে সমাজ বাড়ি ও সোনার গৌরাঙ্গ মন্দির। সর্বত্রই কৃষ্ণনাম জপ করছেন ভক্তরা। মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তের ভিড়। পূজারি দোল পূর্ণিমার পুজোর আয়োজনে মগ্ন। তবে এইসব মন্দিরের সাজকে ছাপিয়ে যায় ধামেশ্বর মহাপ্রভু মন্দিরের সাজ। পৌঁছে দেখি ভক্তের ভিড়ে মুখরিত মন্দির চত্বর। গুলাল আর রঙের সঙ্গে ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে কীর্তন মেলার মণ্ডপ। দেশের নানা প্রান্ত থেকে কীর্তনপ্রেমীরা এসেছেন। সকলের কণ্ঠেই এক সুর, ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, হরে রাম হরে রাম, রাম রাম হরে হরে।’ খোল-করতাল, ঢোল বা খঞ্জনির তালে তালে নৃত্যরত ভক্ত সকলেই। কেউ বা মহাপ্রভুর প্রাচীন মূর্তির সমুখে অবেশে ভরপুর হয়ে চেয়ে রয়েছেন নীরবে। আরতি, পুজোপাঠ চলছে দিনভর। সঙ্গে গান বাজনায় ভরে উঠছে চারপাশ। শুধু মন্দির চত্বরেই নয়, আরতির ধ্বনি মন্দির প্রাঙ্গণ ছাপিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ছে। সেখানেও ভক্তদের আকুল কৃষ্ণ নাম জপে গমগম করে উঠছে নবদ্বীপের প্রকৃতি। 
রাস্তাজুড়ে মন্দিরে মন্দিরে চলছে ভক্তদের পরিক্রমা। এক সপ্তাহ তো বটেই এমনকি অনেক সময় দিন দশেক ধরেও চলে এই পরিক্রমা। ভক্তরা মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের জন্মস্থান পরিক্রমা করেন দশ দিন ধরে। ভোর থেকে শুরু হয় পরিক্রমা। সারাদিন ধরে কৃষ্ণ নাম ভজনা আর শহরের অলিগলি ঘুরে দেখা। ঘুরতে ঘুরতে সন্ধে নামলে বা ক্লান্ত হয়ে ভক্তরা হয়তো কোথাও থমকে গেলেন, সেখানেই ইসকনের আয়োজনে তাঁবু ফেলা হয়। ভক্তরা বিশ্রাম নেন রাতটুকুর জন্য। পরদিন ভোরে উঠে আবারও শুরু হয় পরিক্রমা। এইভাবে নবদ্বীপ ঘুরে দেখেন কেউ সাত দিনে, কারও বা দশ দিন সময় লেগে যায়। 
শুধু তাই নয়, এই সময় একটা উৎসবের আমেজ থাকে সবার মনে। প্রকৃতি নব রূপে নিজেকে সাজায় আর সেই সাজের তরঙ্গ প্রবাহিত হয় মানুষের মধ্যে। চলে নানা ধরনের মেলা। আঞ্চলিক লোকেদের আয়োজনে সেইসব মেলা বসে। কেউ খাবারের স্টল দেন, কেউ বা পোশাক বিক্রি করেন। এছাড়াও শ্রীচৈতন্যদেবের বাণী, বৈষ্ণব ধর্মগ্রন্থ ইত্যাদিও পাওয়া যায় স্টলে। থাকে হরেক ধরনের মিষ্টান্ন। আরও থাকে প্রসাদের স্টল। মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে এই প্রসাদ পাওয়া যায়। ভক্তরাই পালা করে প্রসাদ বিতরণে লেগে থাকেন। আলোয় আলো হয়ে থাকে মন্দির প্রাঙ্গণ। দোল উপলক্ষ্যে বেশ কয়েকদিন রাত নামে না নবদ্বীপে। ভক্ত আর মানুষের ভিড়ে এলাকা গমগম করে সারাক্ষণ। মন্দির চত্বরে ভোরবেলায় গীতা পাঠের আয়োজন হয়। সূর্য ওঠার প্রাকমুহূর্তে শুরু হয় গীতা পাঠ। তারপর সূর্য বন্দনা হয়, প্রসাদ বিতরণ চলে। সারাটা দিন মহাসমাগমে ভক্তবৃন্দ ও সাধারণ মানুষ মেতে থাকেন। 
মোটামুটি একই আয়োজন থাকে মায়াপুরের ইসকন মন্দিরেও। সাধারণভাবে যে মন্দিরে বিদেশি ভক্তদের ভিড় বা প্রসাদে পিৎজা বার্গার পাওয়া যায়, দোলের সময় সেই মন্দির একেবারেই বদলে যায়। তখন রঙিন আয়োজনে দেশীয় সংস্কৃতির উদ্‌যাপন চলে সপ্তাহভর। এখানে মন্দিরে পুজো ঘরে রাধা-কৃষ্ণ নামে মজে থাকেন ভক্তরা। কেউ বা শ্রীকৃষ্ণকে দীপদান করেন। কেউ তাঁর পায়ে আবির দিয়ে পুজো করেন। প্রসাদের মধ্যেও ভারতীয় খাবারের বাহুল্য দেখতে পাবেন উৎসব উপলক্ষ্যে। ভক্তদের তৃপ্ত রঙিন মুখের হাসি আর উজ্জ্বল চাউনিতে ইসকনের মন্দির প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে। সাধারণ মানুষও মেলায় অংশগ্রহণ করতে আসেন। সে যেন এক মহা মিলনক্ষেত্র। কীর্তনের সুর মৃদঙ্গের তালে মেশে। উদ্বাহু নৃত্যে মশগুল হয়ে ওঠেন ভক্তরা। তাঁদের সঙ্গেই অনেক সাধারণ মানুষও যোগদান করেন। কেউ কীর্তনের সুরে গলা মেলান কেউ বা নাচের তালে শামিল হন। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত চলে এই উৎসব। তারপর সন্ধের আকাশ আলো করে পূর্ণিমার চাঁদ ওঠে। ভক্তদের আনন্দে অন্য মাত্রা যুক্ত হয় তখন। হরে কৃষ্ণ নামে ভরে যায় ভক্তের মনপ্রাণ। রঙের উৎসবে রঙিন হয়ে ওঠে মন।  
কমলিনী চক্রবর্তী 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ