কাল যখন চণ্ডীগাছা হইতে আসিতেছিলাম, সেই সময় সাঁওতাল পাড়ায় তিন চারিটা কুকুর ডাকিতে ডাকিতে পিছু পিছু আসিতে লাগিল। কামড়ায় আর কি। আমি করমালায় রাম রাম জপ করিতে করিতে, ধীরভাবে অগ্রসর হইতে লাগিলাম। প্রতি মুহূর্তে মনে হইতেছে এইবার বুঝি কামড়াইল, আর স্মরণও হইতেছে-কুকুর, তাহাও ত’ তুমি! কিন্তু সেই ভাব থাকিতেছে না। ভয় এবং ‘সবই তুমি’-এই দুই-ই মনে হইতেছে। পশ্চাৎ ফিরিয়া দেখিলাম না, কোন চেষ্টা করিলাম না। খানিক দূর ডাকিতে ডাকিতে আসিয়া তাহারা ফিরিয়া গেল। কুকুর সাজিয়া খুব উপদেশ দিয়া যাইলে। তখন বুঝি নাই, পরে বুঝিলাম যে-বিশ্বাস দৃঢ় না হইলেও যদি সব সময় তোমাকে মনে পড়ে, তাহা হইলে সুখ দুঃখ অভিভূত করিতে পারে না, “সব তুমি” এই বিশ্বাস দৃঢ় হইলে ত’ কথাই নাই। এই সংসারে শোক, দুঃখ, রোগ, অভাব, ঋণ, সুখ, ঐশ্বর্য্য, সাধুবাদ, নিন্দাবাদ ইত্যাদি কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করিবেই। তাহাদিগকে গ্রাহ্য না করিয়া, রাম রাম করিতে করিতে অগ্রসর হইতে পারিলে, তাহারা কিছুক্ষণ চীৎকার করিয়া পশ্চাদ্ধাবন করিবে, তাহার পর আপনা আপনি নীরব হইয়া যাইবে।
রোগ, শোক, দুঃখ, জ্বালা, অভাব, ঋণ, ধন, ঐশ্বর্য্য, সুখ, শান্তি—“সবই তুমি,” এই বিশ্বাস স্থির হইলে, আর মন আকুল হইতে পারে না। এই কথা ধ্রুব সত্য—বিশ্বাস দৃঢ় হয় নাই, “সব তুমি” মনেও হইতেছে আবার বিক্ষেপ আসিতেছে, এই অবস্থাতেও যদি রাম রাম জপ করা যায়, তাহা হইলেও তোমার কৃপা লাভ করিতে পারা যায় এবং রকম বিরকম কুকুরের চিৎকার ও আক্রমণের হাত হইতে নিস্তার পাওয়া যায়। এ সংসার-কুকুর চীৎকার করিবেই—সুখে বল, দুঃখে বল, ঐশ্বর্য্যে বল, মানে বল, অপমানে বল, অর্থাগমে বল, অর্থ ব্যয়ে বল—এ চীৎকার না করিয়া কিছুতেই থাকিতে পারিবে না। এ করুক চীৎকার তাহা গ্রাহ্য না করিয়া নাম করা আর “সব তুমি,” “সব তুমি” মনে করা, তাহা হইলে সব স্বতঃই শান্ত হইবে।
দেখ তুমি কত রূপ ধারণ করিয়া আমায় এ উপদেশ দিতেছ, অভয় দিতেছ—তথাপি আমি স্থির হইতে পারি না। কি নিত্যকর্ম্মে, কি পূজাপাঠে যদি প্রাণের ভিতর তোমার সাড়া না পাই প্রাণটা বড় খারাপ হয়। মনে হয় সবটাই ব্যর্থ হইল। পরক্ষণে যখন মনে হয় সবই তুমি—পূজাপাঠে আনন্দও তুমি—নিরানন্দও তুমি তখন সে ভাব আর থাকে না। তুমি আমার পাঠ শুনিতেছ-‘স্মরণ করিয়া পাঠ করিলে খুব আনন্দ হয়, তোমায় ভুলিয়া পাঠ করিলে মোটেই আনন্দ পাই না। আবার যখন মনে হয় সবই তুমি, তুমি ছাড়া কিছু নাই, তোমার বিস্মরণও তুমি তখন মন একটু শান্ত হয়।
আমার চেষ্টায় কিছু হইবে না আমি বেশ বুঝিয়াছি। সাধনা করিয়া তোমায় পাইবার আশা করা উন্মত্ততা ভিন্ন আর কিছু নয়। আমার সাধন-ভজন কিছু নাই, আমার যোগ ধ্যান কিছু নাই, আমার কিছুই নাই; তাহা হইলে আমি কি করিব? কাহাকে আশ্রয় করিব? কাহাকে মনের বেদনা জানাইব? কে আমার ব্যথা বুঝিবে? —কেহ বুঝিবে না, কেহ একটা কথার আশ্বাস দিবে না। সবাই ভয় দেখাইতেছে, আমাকে কর্তা সাজাইয়া নিন্দা-সুখ্যাতি করিতেছে; আমি এখন দেখিতেছি তুমি ভিন্ন আমার গত্যন্তর নাই। তাই তোমাকে জানাইতে চাই, তাই তোমাকে ধরিতে চাই, তাই তোমার সঙ্গে কথা কহিতে চাই। মনের কথা কওয়া বন্ধ করিতে পারি না, মন যখন কথা কহিবেই তখন আজ হইতে আমার সঙ্গেই কথা কহিব।
শ্রীগুরুপ্রকাশন প্রকাশিত ‘শ্রীওঙ্কারনাথ-রচনাবলী’ (১ম খণ্ড) থেকে