মৃণালকান্তি দাস: কল্পনা করুন, ঐতিহাসিক সেই মুহূর্তের। ১৯৩৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। ৪৮ ঘণ্টা আগে জার্মানির মসনদে অ্যাডলফ হিটলার। দেশজুড়ে এক অদ্ভুত আলোড়ন। একদিকে অর্থনৈতিক মন্দার দগদগে ক্ষত। বেকারত্ব। হাহাকার। রাজনৈতিক অস্থিরতা। অন্যদিকে এক নতুন নেতার আবির্ভাব। ‘সোনায় মোড়া জার্মানি শ্মশান কেন?’— এই আওয়াজ তুলে যিনি আকাশছোঁয়া প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অমিত শক্তিধর এক জার্মানির স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। ফিরিয়ে আনবেন জার্মানির হারানো গৌরব। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন...
হিটলার ক্ষমতায় বসেই যে ব্রহ্মাস্ত্র তাঁর অর্থনৈতিক ঝুলি থেকে বের করলেন, তা হল শুল্ক বা ট্যারিফ। তাঁর ভাষায়, এই শুল্কই হবে জার্মান জাতির ‘মুক্তির’ চাবিকাঠি। বিশ্বায়নের শৃঙ্খল ছিঁড়ে জার্মানকে আবার স্বনির্ভর করে তুলবে। ফিরিয়ে আনবে জার্মানির অতীত সম্মান আর গর্ব। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, এই ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ শেষ পর্যন্ত মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এক স্বৈরাচারীর সেই অদ্ভুত জেদ, আত্মঘাতী শুল্কনীতি একটা গোটা দেশকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। জার্মান অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বদলে তা পাগলা ঘোড়ার মতো উল্টো দিকে ছুটতে শুরু করেছিল। আর সেই ঘোড়ার লাগাম ছিল খোদ হিটলারের হাতেই। যিনি অর্থনীতি বুঝতেন কম। কিন্তু ক্ষমতা আর যুদ্ধের নেশায় ছিলেন মত্ত। সম্প্রতি মার্কিন সাময়িকী ‘দ্য আটলান্টিক’-এ ইতিহাসবিদ টিমথি ডব্লিউ রেব্যাক ‘হিটলারস টেরিবল ট্যারিফস’ শীর্ষক প্রবন্ধে সেই ভয়ঙ্কর ‘শুল্ক যুদ্ধ’-এর পরিণতির কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন।
ইনস্টিটিউট ফর হিস্টোরিক্যাল জাস্টিস অ্যান্ড রিকনসিলেশনের ডিরেক্টর রেব্যাক লিখছেন, হিটলার চ্যান্সেলর হিসেবে শপথ নিলেন ৩০ জানুয়ারি, ১৯৩৩। আর ১ ফেব্রুয়ারি, বুধবার তাঁর মন্ত্রিসভায় আলোচনার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়াল শুল্ক। হিটলারের সদ্য নিযুক্ত অর্থনীতি-বিষয়ক মন্ত্রী আলফ্রেড হুগেনবার্গ যেন তৈরিই ছিলেন। তিনি সগর্বে ঘোষণা করলেন, কৃষি খাতের দীর্ঘদিনের দাবি অর্থাৎ আমদানি করা কৃষিপণ্যের উপর চড়া শুল্ক অবশ্যই পূরণ করতে হবে। তবে সঙ্গে একটা লেজুড় জুড়ে দিলেন, একইসঙ্গে শিল্পের যাতে ক্ষতি না হয়, সেটাও দেখতে হবে। কিন্তু কীভাবে এই বিপরীতমুখী স্বার্থ রক্ষা হবে? তার কোনও স্পষ্ট কর্মসূচি তো দূরের কথা, ধারণাও দিলেন না তিনি।
মন্ত্রিসভায় তখন দুশ্চিন্তার কালো মেঘ! বিদেশমন্ত্রী কনস্টানটিন ফন নিউরাথ প্রমাদ গুনছেন। একদিকে অস্ট্রিয়া থেকে আসা কাঠের উপর সম্ভাব্য শুল্কের প্রভাব, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ঝুলে থাকা প্রায় ২০০ মিলিয়ন রাইখসমার্কের (আজকের হিসাবে প্রায় ১.১৪ বিলিয়ন ডলার) বিশাল বাণিজ্য চুক্তি– এসব নিয়ে তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ। অর্থমন্ত্রী কাউন্ট জোহান লুডভিগ গ্রাফ শোয়েরিন ফন ক্রোসিক আরও বেশি উদ্বিগ্ন। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। তিনি জোর দিয়ে বললেন, অবিলম্বে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার!
চারপাশে যখন এমন অর্থনৈতিক ঝড়ের প্রস্তুতি চলছে, তখন হিটলারের মনোযোগ কোথায়? তাঁর মাথায় তখন ঘুরছে অন্য হিসেব। তিনি তাঁর মন্ত্রীদের সাফ জানিয়ে দিলেন, তাঁর কাছে এই মুহূর্তে একটাই অগ্রাধিকার— আসন্ন ৫ মার্চের রাইখস্ট্যাগ (জার্মান সংসদ) নির্বাচন। যেকোনও মূল্যে এই নির্বাচনের আগে দেশে অস্থিরতা এড়াতে হবে। কারণ তিনি জানতেন, এই নির্বাচনই হবে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার মূল চাবিকাঠি। অর্থনীতির ভালোমন্দের চেয়ে তাঁর কাছে তখন রাজনৈতিক জয় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বোঝাই যাচ্ছিল, অর্থনীতির স্টিয়ারিং হুইলে এমন একজন বসেছেন, যাঁর পথের দিশা নিয়ে নিজের কোনও স্পষ্ট ধারণাই নেই।
হিটলারের অর্থনীতি নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সাদামাটা। তাঁর নিজেরই ঘাড়ে তখন ঝুলছে ৪ লক্ষ রাইখসমার্কের বিপুল অঙ্কের করের বোঝা! অর্থনীতি নিয়ে তাঁর জ্ঞান কতটা ‘গভীর’ ছিল, তা তাঁর একটি কথাতেই স্পষ্ট। তিনি দাবি করেন, মুদ্রাস্ফীতি তখনই হয়, যখন আপনি তা চান। মুদ্রাস্ফীতি হল শৃঙ্খলার অভাব। ভাবুন একবার! অর্থনীতির মতো জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য হিটলার নির্ভর করেছেন তাঁর কুখ্যাত আধা সামরিক গুন্ডাবাহিনী, এসএ বা ব্রাউনশার্টসের উপর! অর্থাৎ দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য লাঠিপেটা! আর জার্মানির যাবতীয় অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য সহজ সমাধান ছিল ইহুদিদের ঘাড়ে দোষ চাপানো। তাঁর বিকৃত চিন্তাভাবনায়, জার্মান জাতির সব সঙ্কটের মূলে ছিল এই ইহুদিরাই। অর্থনৈতিক যুক্তি বা তথ্যের ধার তিনি ধারতেন না। তাঁর কাছে সমাধান ছিল একটাই— শত্রু চিহ্নিত কর আর তাকে শেষ করে দাও। এই বিপজ্জনক সরলীকরণই ছিল তাঁর অর্থনৈতিক দর্শনের ভিত্তি।
হিটলার নিজে অর্থনীতি না বুঝলেও তাঁর এক ‘অর্থনৈতিক গুরু’ ছিলেন। নাম গটফ্রিড ফেডার। ইনি ছিলেন নাৎসি পার্টির দীর্ঘদিনের প্রধান অর্থনীতিবিদ। পার্টির সেই কুখ্যাত ২৫ দফা কর্মসূচির অন্যতম কারিগর ছিলেন এই ফেডার। এই কর্মসূচিতে সমাজতন্ত্র আর উগ্র জাতীয়তাবাদের এক অদ্ভুত খিচুড়ি পাকানো হয়েছিল। ১৯৩২ সালের মে মাসে যখন হিটলার ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখছেন, সেই সময়ই ফেডার ৩২ পৃষ্ঠার নীলনকশা তৈরি করেন। ফেডারের এই নীলনকশার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কী? হ্যাঁ, সেই শুল্ক!
ফেডার বিশ্ব অর্থনীতিকে দেখতেন হয় উদার, নয়তো মার্ক্সবাদী হিসেবে— দু’টিই তাঁর চোখে সমান ঘৃণ্য। তিনি চেয়েছিলেন কঠোর ‘আমদানি বিধিনিষেধ’ চাপিয়ে জার্মান অর্থনীতিকে জার্মানদের হাতে ফিরিয়ে দিতে, জার্মান শ্রমিক আর কৃষকদের ‘বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করতে’। এই ছিল তাঁর ‘জার্মানি ফার্স্ট’ নীতির অর্থনৈতিক রূপ। এক বিচ্ছিন্ন, আত্মকেন্দ্রিক দুর্গ তৈরির নীলনকশা। কিন্তু এই দুর্গ তৈরির ভাবনাটা যে কতটা বিপজ্জনক, তা হিটলারের বিদেশমন্ত্রী কনস্টানটিন ফন নিউরাথ ঠিকই আঁচ করতে পেরেছিলেন। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন, এই নীতি হিতে বিপরীত রূপ নিয়ে বিধ্বংসী বাণিজ্য লড়াই বাধিয়ে দেবে। শুধু তা-ই নয়, তিনি এমনও আশঙ্কা করছিলেন, এই শুল্কের ধাক্কায় ডিমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যেতে পারে। বেড়ে যেতে পারে প্রায় ৬০০ শতাংশ। কিন্তু হিটলারের তাতে কী যায় আসে! যুক্তি বা অর্থনীতিকে ছাপিয়ে উঠেছিল হিটলারের অন্ধ জাতীয়তাবাদী এক আবেগ।
প্রাক্তন অর্থনীতি-বিষয়ক মন্ত্রী এবং জার্মান শিল্প ও বাণিজ্য সমিতির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এডওয়ার্ড হ্যাম হিটলারকে রীতিমতো চিঠি লিখে অর্থনীতির কিছু মৌলিক পাঠ দেওয়ার চেষ্টা করেন। হ্যাম মনে করিয়ে দেন, মুক্তবাজার অর্থনীতির ভিত্তি হল বিশ্বাস। আইনের শাসন এবং চুক্তি মেনে চলার মানসিকতা। হিটলারকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, যদি শুল্কের প্রাচীর তুলে বাণিজ্যকে ‘শ্বাস রোধ’ করা হয়, তবে তা হবে নিজের পায়ে আঘাত করার শামিল। এর ফলে জার্মান শিল্প উৎপাদন মুখ থুবড়ে পড়বে। বাড়বে বেকারত্ব। অন্যদিকে অর্থনীতিতে নেমে আসবে ভয়াবহ বিপর্যয়। হয়েওছিল তাই!
সব সতর্কবাণীকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ১৯৩৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি হিটলার যখন সেই ভয়ঙ্কর শুল্কনীতি ঘোষণা করলেন, জার্মানির ঐতিহ্যবাহী ও প্রভাবশালী পত্রিকা ‘ভসিসচে জাইতুং’ তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে। তারা লেখে, এটা জার্মান অর্থনীতির জন্য এক ‘পথের বাঁক’। মনে হচ্ছে ইউরোপের সবচেয়ে শিল্পোন্নত দেশটি বুঝি এবার সত্যি সত্যিই ‘লাঙল আর জোয়ালের যুগে’ কদম বাড়াল! কোনও রাখঢাক না করেই ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ লিখল, আসলে এ হল ইউরোপীয় প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে জার্মানির ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ ঘোষণা। হিটলার ভেবেছিলেন, সাধারণ ভোটার হয়তো অর্থনীতির কচকচানি নিয়ে মাথা ঘামাবে না। কিন্তু বাজার? বাজার ঠিকই এই অনিশ্চয়তার গন্ধ পেয়েছিল। রেজাল্ট? হিটলারের জমানার শুরুতে অর্থনীতির যেটুকু উত্থান হয়েছিল, তা-ও মিলিয়ে গিয়ে এক স্থায়ী মন্দা দেখা দিল। খোদ বিদেশমন্ত্রী নিউরাথ কিছুদিন পরেই মন্ত্রিসভার বৈঠকে হিটলারকে করুণ সুরে জানালেন, ‘আমাদের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে... প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পথে।’ তিনি জানান, ডাচদের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বন্ধ। সুইডেন, ডেনমার্ক, এমনকী ফ্রান্স আর যুগোস্লাভিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে...
হিটলার যেদিন এই আত্মঘাতী বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছিলেন, সেদিন সন্ধ্যায়ই তিনি হাজির বার্লিনের সবচেড়ে বড় মুক্ত প্রাঙ্গণ স্পোর্টপালাস্ট ময়দানে। হাজার হাজার উন্মত্ত সমর্থকের সামনে এ যেন তাঁর বিজয় মিছিল! গায়ে সেই পরিচিত বাদামি স্টর্ম-ট্রুপার ইউনিফর্ম, হাতে লাল কাপড়ের উপর কালো স্বস্তিকা চিহ্ন আঁকা আর্মব্যান্ড। চ্যান্সেলর হিসেবে এটাই তাঁর প্রথম জনসভা। তিনি ডাক দিলেন ‘শুদ্ধিকরণের’। আমলাতন্ত্র, জনজীবন, সংস্কৃতি, এমনকী গোটা জার্মান জাতিকেই নাকি ‘শুদ্ধ’ করতে হবে!
অথচ, এই দীর্ঘ ভাষণে তিনি একবারও বাণিজ্যযুদ্ধের কথা উল্লেখ করলেন না! যেমন উল্লেখ করলেন না, ঠিক তার আগের দিন মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা করা জার্মানির পুনরায় বিশাল সমরসজ্জার পরিকল্পনার কথা। সেই বৈঠকের ভিতরের খবর কিন্তু ছিল আরও ভয়ঙ্কর। সেখানে হিটলার স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, পুনরায় বিশাল সমরসজ্জার নীলনকশায় বিলিয়ন বিলিয়ন রাইখসমার্ক প্রয়োজন... জার্মানির ভবিষ্যৎ শুধু এবং একচেটিয়াভাবে সেনাবাহিনীর পুনর্গঠনের উপর নির্ভর করছে। এই নীলনকশাই একদিন গোটা বিশ্বকে যুদ্ধের আগুনে ঠেলে দিয়েছিল!
এখনও জানা যায়নি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘হিটলারের ভয়ঙ্কর শুল্কযুদ্ধ’-র গল্পটা পড়েছেন কি না। তবে ইতিহাস সাক্ষী, এক আগ্রাসী, যুদ্ধবাজ স্বৈরাচারের ক্ষমতার আস্ফালন। যা জার্মানিকে শুধু অর্থনৈতিকভাবেই দেউলিয়া করেনি, বরং তাকে অনিবার্যভাবে এক বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এই বাণিজ্যযুদ্ধ ছিল সেই আসন্ন মহাযুদ্ধেরই এক অশুভ মহড়া। যার শেষ হয়েছিল এক ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞে!
ট্রাম্প জমানায় আমেরিকার নাগরিকরা কি সেই ধ্বংসযজ্ঞের ইতিহাস ফিরিয়ে আনতে চাইছেন?