Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বঞ্চনার পাঁকে পদ্ম ফোটে?

বাংলার জন্য এত দরদ! অথচ ৪৫ মিনিটের বক্তৃতায় নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান কিংবা মহিলা ও যুব সম্প্রদায়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা শোনা গেল না নরেন্দ্র মোদির মুখে

বঞ্চনার পাঁকে পদ্ম ফোটে?
  • ১৫ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: বাংলার জন্য এত দরদ! অথচ ৪৫ মিনিটের বক্তৃতায় নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান কিংবা মহিলা ও যুব সম্প্রদায়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা শোনা গেল না নরেন্দ্র মোদির মুখে। শুকনো মুখে যেমন সিঙ্গুরের সভা থেকে ফিরতে হয়েছিল, ব্রিগেড থেকেও তাই। শেষ ফাল্গুনের হাওয়ায় এলোমেলো ভেসে বেড়ালো বহিরাগতদের মুখে ‘পাল্টানোর স্লোগান’, ‘চাকরি চাই’ ব্যানার। মাটিতে লুটালো বাঙালিপ্রেমী সাজতে মঞ্চের ব্যাকগ্রাউন্ডে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের ছোঁয়া। ভ্রম হচ্ছিল, সাত মাস আগেই দুর্গাপুজোর থিম নাকি! রানি রাসমণির ঐতিহাসিক মন্দিরের যুগশ্রেষ্ঠ পূজারি কিন্তু বিভেদের হিন্দুধর্মের কথা বলেননি, পদে পদে হিন্দু-মুসলমানও করেননি সংকীর্ণ স্বার্থে, শুধু মেলানোর কথা বলে গিয়েছেন আজীবন। ধর্মের আড়ালে মেরুকরণের বিষ তাই বাঙালির পক্ষে গেলা কঠিন। আসন্ন নির্বাচনের ফলাফলেই তা আর একবার স্পষ্ট হয়ে যাবে।  

Advertisement

একথা সবার জানা, ভোট এলে তবেই তিনি আসেন গেরুয়া উড়িয়ে। তথাকথিত ‘জঙ্গলরাজ’ সাফ করতে। নির্বাচন ফুরোলেই আর মনে থাকে না বাংলার ধুলোধূসরিত পথ-প্রান্তর থেকে কল্লোলিনীর মহার্ঘ ব্রিগেড ময়দানের কথা। জঙ্গল বাড়ে, পানাপুকুরে ঢাকে চারদিক, কিন্তু তিনি বেপাত্তা। সম্মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে কথা। তাঁকে নেহাতই ভোটপাখি ভাবা সমীচীন নয় মোটেই। এটাও সত্যি, একমাত্র ভোটের বছরেই তাঁর পায়ের ধুলো পড়ে এই তল্লাটের মহতী সভায়। এর অন্যথা হয় না কখনো। চোদ্দো, ষোলো, উনিশ, একুশ এবং ২০২৬ সাল। হাওয়াই জাহাজের ধুলোয় গ্রামেগঞ্জে গরিবকে 
ঢেকে দেওয়ার একই ট্র্যাডিশন চলছে সমানে। মধ্যিখানে পনেরো, সতেরো, কোভিডের ভয়াবহ কুড়ি, বাইশ, তেইশ পঁচিশ সালে ভোট ছিল না, মোদিজিরও দেখা মেলেনি ব্রিগেডের মাঠে। অনেক হাপিত্যেশ করেও রাজ্যের জনগণ তাঁর টিকি ছুঁতে পারেনি মহামারীর সংকটে। বাংলার মানুষের জ্বালাযন্ত্রণা, উন্নয়ন নিয়ে কেন্দ্রের টানাপোড়েন, সাফল্য-বিপর্যয়, টানা ৪ বছর একশো দিনের টাকা না পাওয়া, আবাসের টাকা ও জিএসটির ক্ষতিপূরণ আটকে রাখা—এমন দু’শো বঞ্চনার মরুভূমির উপর দাঁড়িয়ে পরিবর্তনের সংকল্প যাত্রা বড্ড বেমানান নয় কী! বেমানান জঙ্গলরাজ খতমের ক্লিশে উপাখ্যানও। লোকে বুঝে গিয়েছে বিজেপির বহিরাগত কেষ্টবিষ্টু, মন্ত্রীসান্ত্রিরা বাংলার কল্যাণে নয়, স্রেফ ক্ষমতা দখলের চক্করেই নির্বাচনের আগে বাংলামুখী। ভোট না থাকলে ‘জঙ্গলরাজ খতম’, ‘ডবল ইঞ্জিন লাড্ডু’, ‘সুনার বাংলা’ গড়ার মতো চোখা চোখা শব্দগুলির ছুটি। ছুটি রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম সহ তাবৎ মনীষীদের বিকৃত নাম আওড়ে অকৃত্রিম বাঙালিপ্রেমী সাজার কুনাট্যেরও। চলতি ভোটপর্ব পেরিয়ে গেলে আবার ঊনত্রিশের লোকসভা নির্বাচনের আগে খুব জরুরি কাজ ছাড়া শতাব্দীর সেরা গুজরাতি ও তাঁর সেকেন্ড ইন কমান্ডের পদচিহ্ন পড়বে বলে মনে হয় না বাংলার মাটিতে। বনসল, যাদবদেরও অখণ্ড ছুটি। একুশে কৈলাশ বিজয়বর্গীয় সাহেব সকাল বিকেল একই আওয়াজ তুলতেন। ভোট মিটতেই সেই যে বাংলা ছেড়ে তিনি পিঠটান দিয়েছেন, আর দেখা গিয়েছে কি? তাঁর চারিত্রিক দোষগুণ সম্পর্কে বিজেপিরই একাধিক নেতার টিপ্পনি কিন্তু সযত্নে বাঁধিয়ে রাখার মতো!  
নিঃসন্দেহে এবার নরেন্দ্র মোদির বাংলা নিয়ে তাগিদটা একটু বেশি। সেই  নেশা থেকেই কাড়া নাকাড়া বাজিয়ে ঘুরতে আসা। ভুল হল, বলা ভালো ডেলি প্যাসেঞ্জারির মহোৎসব। তাঁর নেতৃত্বে এটাই সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফোটানোর শেষ লড়াই। এরাজ্যে গেরুয়া সংগঠন যেহেতু এখনও চোরাবালিতে নিমজ্জিত তাই একরাশ প্রতিশ্রুতি বিলিয়েই লড়াই জমাতে চাইছেন তিনি। পরের বিধানসভা নির্বাচনে ৮২ বছর বয়সেও তিনি যদি প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে আসীন থাকেন তা বাজপেয়ি-আদবানি পরবর্তী গেরুয়া রাজনীতিতে এক অভিনব অধ্যায় হিসাবেই বিবেচিত হবে। দুঃখ একটাই, পরিবারবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা বিজেপি আজ একনায়কতন্ত্রের পূর্ণগ্রাসে আচ্ছন্ন। মত একজনের, অনুসরণ সবার। আসন্ন নির্বাচনে বাংলার মানুষের সামান্য ভুলচুক হলেই এরাজ্য নিয়ন্ত্রিত হবে নবান্ন কিংবা রাইটার্স থেকে নয়, সুদূর দিল্লি থেকে। কোনো গুজরাতি বাংলার ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করবে এটা মানবে রবীন্দ্রনাথ-নেতাজির বাংলা? এই বঙ্গে মোদিজির দৌড়টা শুরু ১২ বছর আগে। ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ থেকে শনিবারের এই বারবেলা পর্যন্ত। ভোটে জিততে প্রতিশ্রুতির ফোয়ারা নতুন নয়। বারবার শোনা গিয়েছে একই কথা। আম নাগরিকদের কাছে এক যুগ পেরিয়ে তা নিতান্তই ক্লিশে। দশ বছর আগে নোট বাতিলের ফ্লপ নাটকে কালো টাকার দপদপানি যেমন কমেনি, তেমনি হালের গালভরা  এসআইআরের ইন্দ্রজালেও ভোটার সব জব্দ হয়েছে ভাবা শুধু ভুলই নয়, বালখিল্য মন্তব্য। বিজেপির এজেন্ডা পূরণ করতে গিয়ে চরম হেনস্তার সম্মুখীন বাংলার সাধারণ মানুষ। সংখ্যালঘুদের শায়েস্তা করার অছিলায় দশকের পর দশক ভোট দেওয়া হিন্দুদেরও কম হয়রানি করা হয়নি। এখনও ৬০ লক্ষ ভোটারের ভাগ্য বিচারাধীন। কমিশনের প্রাথমিক হিসাবই বলছে, ৬০ লক্ষের মধ্যে মোটের উপর ২৪ লক্ষ নাম বাদ পড়ছে। এখন সাপ্লিমেন্টারি লিস্টের অপেক্ষা।
বিজেপি বলছে, মানুষ পরিবর্তন চায় উন্নয়নের জন্য। কিন্তু মানুষ দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে দেখছে, মোদি শাসনের ১২ বছরেও সোনার ভারত হয়নি, বিজেপি শাসনে ৫০০ দিন পেরিয়েও সোনার ওড়িশার খোয়াব স্রেফ লবডঙ্কা! অসমের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও তথৈবচ, এখনও অনুপ্রবেশ আর মাদকের স্বর্গরাজ্য। অগত্যা মন ভোলাতে সোনার বাংলার স্বপ্ন ফেরিতে মরিয়া নরেন্দ্র মোদি। উনিশে, একুশে এবং চব্বিশের ফ্লপ শোয়ের পর এবার ছাব্বিশের মেগা শো। তাঁর অস্ত্র লম্বা চওড়া ভাষণ আর সম্ভব-অসম্ভব প্রতিশ্রুতির গাজর, বিট, বেগুন ঝোলানো, যা তাঁর গত ১২ বছরের ম্লান হয়ে যাওয়া ইউএসপিকে চাঙ্গা করতে পারবে কি না, বলবে ভোটের ফল। বাংলার মানুষ জানে এই পূর্ব ভারতে গেরুয়া আগ্রাসন থেকে এখনও বেঁচে রয়েছে একমাত্র এ রাজ্যই। এবারও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামক পূর্ব ভারতের দুর্ভেদ্য চাইনিজ ওয়ালের সামনে নিতান্তই খর্বাকার দেখাচ্ছে মোদিজির উন্নয়নের হাতছানি। 
পূর্ব ভারতে বিজেপির দখলদারি শুরু অসম দিয়ে। অসমে গেরুয়া সরকার শপথ নেয় ২৪ মে ২০১৬। ত্রিপুরায় গেরুয়া সবকারের শপথ ২০১৮ সালে। তারপর একে একে ওড়িশা এবং বিহারে জোট সরকারের জুনিয়র পার্টনার থেকে সিনিয়র শরিকে উত্তরণ সম্পন্ন হয়েছে নিপুণ রাজনৈতিক চালে। ‘সুনার’ ওড়িশা গড়ার স্বপ্ন দেখিয়ে বিজেপি সরকার ভুবনেশ্বরে শপথ নিয়েছিল ১২ জুন ২০২৪। আর তিন মাস পরেই দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি। খুন ধর্ষণ রাহাজানি ছাড়া কী পেয়েছে ভগবান জগন্নাথের দেশের মানুষ। দু’বছরেরও কম সময়ে মহিলাদের উপর ৩৭ হাজার ৫০০টি ভয়ংকর অত্যাচার, যৌন নিগ্রহ শ্লীলতাহানির ঘটনা রাজ্যকে উত্তাল করেছে। গোপালপুরের গণধর্ষণ, বালেশ্বরে এক ছাত্রীর অপমানে আত্মহত্যা, বোলাঙ্গিরে এক তরুণীর আগুনে পুড়ে মৃত্যুর ঘটনা গোটা দেশের বিবেককে স্তব্ধ করে দিয়েছে। অপরাধের বিচারে দেশের মধ্যে ওড়িশার স্থান আজ অষ্টম। বিজেপি ক্ষমতায় আসার কুড়ি মাসে কলিঙ্গ রাজ্যে ৫৪টি দাঙ্গা হাঙ্গামার ঘটনা ঘটেছে। গণহত্যার ঘটনা ২০। এই অমিত শাহদের সোনার ওড়িশা! উত্তরপ্রদেশে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিগত ৯ বছরে বেছে বেছে এনকাউন্টারে মারা হয়েছে তিনশোরও বেশি বিরোধীকে। মুখে বলা হচ্ছে, অপরাধী নিকেশ। কিন্তু যে কথাটা উহ্য রাখা হচ্ছে তা হচ্ছে, সমাজবিরোধী এবং গুণ্ডাদেরও আমরা-ওরা মেরুকরণ করেছে যোগী সরকার। তারপরই এনকাউন্টারে খতম করার অপারেশন।
বাংলার মানুষ ঠেকে শিখেছে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ দিয়ে পেট ভরে না, কর্মসংস্থান আর সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশই আসল। সঙ্গে চাই হাতে নগদ টাকা। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবসাথী, কন্যাশ্রীর সঙ্গে এইখানেই পাল্লা দিতে গেরুয়া শিবির ব্যর্থ। এই কারণেই মমতার দেওয়ালে বারবার ধাক্কা খেয়ে আটকে যায় বিজেপির রথের চাকা। সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের সমস্যা—সঠিক মজুরি এবং হাতে কাজ নিয়ে বিজেপির কোনো সদর্থক ভূমিকা নেই। তারা কেবল নির্বাচনের আগে ‘পরিযায়ী পাখি’র মতো দেখা দেয়। আসার আগে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে সিবিআই-ইডি-কে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেই ব্যস্ত থাকে। এমন বিভেদকামী প্রতিহিংসাপরায়ণ দলের হাতে বাংলার ভাগ্য? নিঃসন্দেহে বাঙালির ইতিহাস বিরাট চ্যালেঞ্জের সামনে। ‘মোদির গ্যারান্টি’ আর ‘মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’ আর কত দিন? বাংলার মানুষ বদলার রাজনীতি চায় না। তাই মন্ত্রী শশী পাঁজার উপর বর্বরোচিত হামলাকে ধিক্কার। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ