সোহম কর, কলকাতা: গত শনিবার দুপুর। ধর্মতলার একটি ভাতের হোটেলে খেতে এসেছেন এক অফিসবাবু। পরিচিত কমবয়সি ওয়েটারকে দেখে তিনি বলে উঠলেন, ‘তুই মাধ্যমিক দিয়েছিস না? সার্টিফিকেট আছে তো?’ সদ্য তরুণ সেই ওয়েটার মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ জানাতেই অফিসবাবুর অভয়বাণী, ‘এবার বাড়ি গেলে ওটা নিয়ে আসিস। আমি বলে দেব, কী করতে হবে। দেড় হাজার টাকা পাবি মাসে মাসে’। ওয়েটার হেসে চলে যায়। পাশের টেবিলে বসে থাকা চাকরির ইন্টারভিউ ফেরত যুবক স্বপ্নের জাল বোনে! দেড় হাজার টাকা পাওয়ার বিষয়টা আসলে কী? কারা পাবেন? কী করতে হবে? পাড়ায় যাঁরা নিয়মিত খবরকাগজ পড়েন বা সমাজ-সংসারের খবর রাখেন, এমন অভিজ্ঞরা গত ক’দিন এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলেছেন।
সব মিলিয়ে ভোটমুখী বাংলায় এবার নয়া চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে ‘বাংলার যুবসাথী’। পাড়ার চায়ের দোকান থেকে ব্যস্ত অফিসপাড়ায় কান পাতলে শোনা যাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের নতুন এই প্রকল্প নিয়ে কথাবার্তা। শিক্ষিত যুব সমাজের উৎসাহ চোখে পড়ার মতো। পড়াশোনা শেষে কাজ খুঁজছেন বা চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এমন কমবয়সিরা দৃশ্যতই খুশি।সংসারের খরচ টানতে যে তরুণ বা তরুণী নামমাত্র পারিশ্রমিকে রাতদিন খাটছেন, বৃহস্পতিবার রাজ্য বাজেটের পর তাঁর চোখেও আশার আলো।
রাজ্য বাজেটে কী ঘোষণা করা হয়েছে? ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সি মাধ্যমিক উত্তীর্ণরা ‘বাংলার যুবসাথী’ প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। শিক্ষা সংক্রান্ত স্কলারশিপ ছাড়া সরকারি কোনো প্রকল্পের সুযোগ পাচ্ছেন না, এমন যুবরা কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত দেড় হাজার টাকা করে পাবেন মাসে মাসে। তবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর মিলবে সহায়তা। আগামী ১৫ আগস্ট থেকে সুবিধা প্রদান শুরু হবে। প্রশ্ন উঠছে, তাহলে ‘যুবশ্রী’ কী? মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য স্পষ্ট জানিয়েছেন, দু’টি আলাদা। ‘যুবশ্রী’র ক্ষেত্রে কোনো সময়সীমা নেই। দু’টি প্রকল্পই পাশাপাশি চলবে। কেউ ‘যুবশ্রী’ পেলে ‘যুবসাথী’ পাবেন না।
এখন যাঁরা সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের অনেকেই হাত খরচ চালাতে গৃহশিক্ষকতা করেন। পরীক্ষা প্রস্তুতির জন্য কোচিং বাবদ খরচও থাকে ভালোই। এই শিক্ষিত বেকাররা ‘বাংলার যুবসাথী’ নিয়ে আশাবাদী। স্কলারশিপ পাচ্ছেন, এমন এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘ভালো একটা চাকরির চেষ্টা করছি। যতদিন না পাচ্ছি, তত দিন যদি সরকারের কাছ থেকে মাসে মাসে কিছু টাকা পাই, তাহলে তো খুব ভালো।’
এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী বলছিলেন, ‘পাড়ার অনেকেই এখন সংসার চালানোর জন্য সামান্য মাইনেতে যে কোনো কাজ করছে। সেই কাজ শেষে কয়েক ঘণ্টার জন্য বাইক ট্যাক্সি চালাচ্ছে বা ডেলিভারি বয়ের কাজ করছে। কেউ কেউ এর মধ্যেই সরকারি চাকরির স্বপ্ন দেখছে। কেউ পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে। মাসে মাসে সরকার দেড় হাজার টাকা দিলে তারা প্রস্তুতিতে আরও বেশি সময় দিতে পারবে।’ তাই ‘বাংলার যুবসাথী’ স্রেফ আরেকটি ভাতা না হয়ে অনেক তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন পূরণের সাথী হয়ে উঠবে বলে আশাবাদী অনেকে।