শুভজিৎ অধিকারী: শীত মরশুম মানেই পিকনিক, চড়ুইভাতি কিংবা বনভোজন। হালকা হিমেল পরশ অথবা কনকনে ঠান্ডা গায়ে মেখে ছুটে চলা জঙ্গলে, পাহাড়ের কোলে, নদী অথবা সমুদ্রের চরে। রান্না-বান্না, খাওয়া-দাওয়া। ঘরোয়া কিছু ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। দিনভর সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনকে খানিক ঝালিয়ে নিয়ে সূর্যাস্তে ঘরে ফেরা। পিকনিকের চাওয়া-পাওয়া মূলত এটাই। বছর কয়েক হল আরও একটা বাড়তি ‘চাওয়া’ যোগ হয়েছে। পিকনিক মানেই খান কয়েক ডিজে বক্স। কানের পর্দা ফাটানো আওয়াজ। শীতের সতেজ শান্ত জঙ্গল, নদীর চরকে উথাল-পাথাল করে তবেই বাড়ির পথ ধরা। বিদেশি এই ‘হিপ-হপ’ হুল্লোড় ছাড়া নাকি জেন-জি’র পিকনিক জমে না!
আমরা যারা আশির কিংবা নব্বই দশকে গ্রামে বেড়ে উঠেছি, পিকনিক কথাটা তাদের কাছে খুব একটা পরিচিত ছিল না। চড়ুইভাতি কিংবা বনভোজন বলতে সবাই স্বচ্ছন্দ বোধ করতাম। পাড়ার কয়েকজন অথবা স্কুল-কলেজের বন্ধু-বান্ধবীরা সামর্থ্য মতো চাঁদা দিতাম। বড়দিন কিংবা পয়লা জানুয়ারিতে মায় কোনও একটা রবিবার হাঁড়ি-কড়া নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম। দলের মধ্যে যে রান্নায় পটু, সে খুন্তি ধরত। বাকি সবাই জোগাড়ি। মাংস কাটছে, চাল ধুচ্ছে, আলু কাটছে, জল আনছে...কত কাজ! তার মাঝে গানের লড়াই। একটু বেশি চাঁদা উঠলে ছোট্ট একটা সাউন্ড বক্স আর মাইক্রো ফোন। সবাই যে যার মতো গান গাইত। এখন সেই কণ্ঠ-গানের জায়গা দখল করেছে শব্দদানব ডিজে। পুজো, উৎসব ছাড়িয়ে এই ব্রহ্মদৈত্যি এখন দখল নিয়েছে পিকনিক স্পটগুলিতে।
আশির দশকে মাইক মানে ছিল একটা মহার্ঘ্য বস্তু। সর্বজনীন হোক অথবা পাড়ার ক’জনের পুজো, মা-কাকিমার শাড়ি টাঙিয়ে প্যান্ডেল। রাতে ঝোলানো ‘নিশীথ সূর্য’। আদতে হ্যাজাক লাইট। আর অবশ্যই একটা মাইক। প্যান্ডেল লাগোয়া কোনও একটা গাছকে অবলম্বন করে পোঁতা হতো লম্বা একটা বাঁশ। তার মাথায় বাঁধা হতো বেঁটে-খাটো নীলাভ লাউড স্পিকার, আরও পরে এল চোঙ। পাশাপাশি দু’টি গ্রামে একই সময়ে পুজো হলে মাইক নিয়ে একটা শীতল যুদ্ধ চলতই। যার বাঁশ যত লম্বা, তার সাউন্ড তত দূরে। অর্থাৎ, কে কতটা দূরবর্তী গ্রামের মানুষজনকে উৎসব-আনন্দে শরিক করতে পারে, তার চেষ্টা চলত। পুজোর আগের দিন রাতেই মাইক-সেট চলে আসত প্যান্ডেলে। ভোর ঠিক চারটে। চোখ ডলতে ডলতে আসতেন মাইকম্যান। তাঁর তখন ভীষণ কেতা। যেন অন্য গ্রহের জীব! গম্ভীর মুখ করে ট্যাঙ্কের চাবি খুলতেন। একে একে বের করে আনতেন গ্রামোফোন, মাইকের মেশিন (অ্যামপ্লিফায়ার)। তার সঙ্গে ছ’টি সেল বিশিষ্ট ব্যাটারির সংযোগ ঘটিয়ে গ্রামোফোনে পাম্প করতেন। নির্দিষ্ট পরিমাণ হাওয়া হলেই গ্রামোফোনের উপর চাকতিটা ঘুরতে শুরু করত। মাইকম্যান চাপিয়ে দিতেন মহিষাসুরমর্দ্দিনীর ইয়া বড়ো রেকর্ড। বাঁশ ঘুরিয়ে চোঙের মুখ একবার গ্রামের দক্ষিণে, একবার উত্তরে কিংবা পূর্ব-পশ্চিমে করা হতো। মাইকের সাউন্ডে একটা আবেশ ছড়িয়ে পড়ত পড়শি গ্রামগুলিতেও।
সে এক মিষ্টি-মধুর দিন ছিল। উৎসব মানে সবার—এমন একটা অলিখিত বিধি মেনে চলার দায়বদ্ধতা পালন করতেন পুজো উদ্যোক্তারা। এখন সেটা হয়ে গিয়েছে একতরফা। পাড়ার কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল, বেয়াড়াপনা যুবকের নিয়ন্ত্রণে। উৎসবকে সবার আপন করে তোলার গরজ নেই কারও। চাঁদা দে, ফূর্তি কর। যাদের যত বেশি চাঁদা, তারাই আনন্দ প্রণেতা বিধাতা। আমাদের সময়ের সেই মাইক সেট এখন আর নেই। নতুন ভার্সানে এসেছে এই ডিজে বক্স। সাউন্ড প্রযুক্তির অভিশপ্ত এক বিপ্লব। যন্ত্রের মাধ্যমে সঙ্গীতকে কতটা বিকট-বিকৃত চিৎকারে হাওয়ায় ভাসিয়ে দেওয়া যায়, তারই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রযুক্তিবিদদের একাংশ। সেই কাজে তাঁরা সফলও বটে। ডিজে বক্সের ঢিপাং ঢিপাং আওয়াজের সঙ্গে কর্কশ গোঁ গোঁ বা সোঁ সোঁ শব্দের সমন্বয় মেদিনী কাঁপিয়ে ছাড়ছে। যেন ভূকম্প! অত্যাধুনিক সাউন্ড প্রযুক্তির বিশারদরা সত্যিই সফল! তাঁদের নামে ধন্যি ধন্যি করে পুজো প্যান্ডেলে চলে আসে আট-দশটা ডিজে বক্স। কোথাও কোথাও বারোটা থেকে পনেরোটা। তাতেও শব্দ-স্বাদ মেটে না। থরে থরে সাজানো বক্সের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয় চার-পাঁচটা করে চোঙ। সে দুর্গাপুজো হোক কিংবা বাসন্তী, জগদ্ধাত্রী, কালী, মনসা, শীতলা আরাধনা অথবা শিব সাধনা মায় বিয়েবাড়ি—ডিজে চাই-চাই-ই। অন্যান্য সম্প্রদায়গুলির অনুষ্ঠানেও একই শর্ত। পুজোর ক’দিন প্যান্ডেলে ডিজে বাজিয়ে চলে রাতভর উন্মাদ নৃত্য। তারপর শুরু নিরঞ্জনের শোভাযাত্রা। কোন পুজো কমিটির ডিজে কতটা বেশি দানবীয় হুঙ্কার ছাড়ছে, তা নিয়ে শুরু হয়ে যায় প্রতিযোগিতা।
এখন আবার এইসব উৎসব আঙিনা ছেড়ে ডিজের দাপট বেড়েছে পিকনিকে। পাশাপাশি দু’টো দলের পিকনিক হলে লড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে শব্দদানবকে। আশপাশের অসুস্থ মানুষজন, বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা, শিশু, অন্তঃসত্ত্বা মহিলারা কিংবা অবলা পশুপাখিরা শব্দের উন্মত্ততাকে গ্রহণ করতে পারবে কি পারবে না, তা নিয়ে হুঁশ থাকে না কারও। প্রতিবাদ করলেই তেড়ে এসে মারধর। প্রাণ দিতে হচ্ছে বেঘোরে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নীরব দর্শক পুলিশ-প্রশাসন। ডিজের আনন্দ চটাতে গিয়ে যদি হিতে বিপরীত হয়! কেননা, অনেক পুজো কমিটি, পিকনিক পার্টির সঙ্গে সরাসরি কিংবা লতায়-পাতায় জড়িয়ে থাকেন রাজনীতির প্রভাবশালীরা। রাজনৈতিক দলগুলির সৌজন্যে ‘স্পনসরশিপ’ পিকনিকের চলও ইদানীং চালু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। এমন পিকনিকে ডিজে নিষিদ্ধ করে সাধ্যি কার?
শব্দ-প্রযুক্তির বিবর্তন ধারায় আজকের এই ডিজে নামক দানব সৃষ্টি হবে, তা সম্ভবত কল্পনাও করতে পারেননি রে নিউবি। তা না হলে রেডিওতে প্রথমবার রেকর্ড ডিস্ক বাজাতে গিয়ে একশোবার ভাবতেন তিনি! নিউবি ছিলেন হেরোল্ড কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ওয়্যারলেস (পরে কলেজটি ক্যালিফোর্নিয়ার সান জোসে স্টেট ইউনির্ভাসিটির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়)-এর ছাত্র। সময়টা ১৯০৯ সাল। নিউবির বয়স তখন মাত্র ১৬ বছর। রেডিওতে রেকর্ড ডিস্ক বাজিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তামাম দুনিয়াকে। বিদ্যুৎ তরঙ্গের মাধ্যমে কথা ও সুরকে বাজনার সঙ্গে মিক্সিং করে সঙ্গীতকে এক অন্যমাত্রায় পৌঁছে দিয়েছিলেন নিউবি। গোটা বিশ্বে জনপ্রিয়তা লাভ করে তাঁর এই মিক্সিং পদ্ধতি। ১৯৩৫ সালে তাঁর আবিষ্কৃত পদ্ধতিটিকে ‘ডিস্ক জকি’ নামে ডাকতে শুরু করেন শব্দ বিজ্ঞানীদের একাংশ। যাকে সংক্ষেপে বলা হয় ডিজে। আর আজকের এই আধুনিক ডিজের সৃষ্টি ১৯৫০-এর দশকে। সাউন্ড সিস্টেমে দু’টি টার্নটেবল এবং একটি মিক্সার ব্যবহার করে নতুন ধরনের মাধুর্যপূর্ণ সঙ্গীত পরিবেশন শুরু হয়। টানা প্রায় দু’টি দশক শ্রোতাদের মোহিত করে রাখে এই ব্যবস্থা। এরপর ডিজের দানবীয় চেহারা এল ‘ব্রেকবিট’ কৌশল থেকে। সময়টা ১৯৭৩ সাল। বিদেশের হিপ-হপ কালচার ও ইলেকট্রনিক্স সঙ্গীত বিপ্লবের ধারায় এই কৌশলটির আবির্ভাব। কুল হার্ক নামে এক মার্কিন শব্দ বিজ্ঞানী নিজের ব্লক পার্টিতে প্রথম ‘ব্রেকবিট’ অবলম্বন করে সঙ্গীত শুনিয়ে বাজিমাত করেন। কৌশলটি এরকম—দু’টি একই রেকর্ড পৃথক পৃথক ডিস্কে চড়িয়ে একটি গানের নির্দিষ্ট অংশ বারবার বাজিয়ে শোনাতেন হার্ক। তাতে দেখা গেল, গানের ওই অংশে যে সব যন্ত্র যেমন, অ্যাকোস্টিকস ড্রামস, বেস গিটার, অক্টোপ্যাড, নাল কিংবা তবলা ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলির আওয়াজ অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। হার্কের এই মিক্সিং সাউন্ডে তখন গোটা মার্কিন দুনিয়া উন্মত্ত। ধীরে ধীরে ‘ব্রেকবিট’ ছড়িয়ে পড়ে ব্রিটেন সহ গোটা ইউরোপে। হার্কের এই কৌশল আরও পরে অত্যাধুনিক মিক্সার মেশিন ও দৈত্যাকার সাউন্ড বক্সের পাল্লায় পড়ে হয়ে উঠল ভয়ঙ্কর।
বিদেশি এই হিপ-হপ ও ব্রেকবিট কালচার এখন বাংলাকেও গ্রাস করেছে। হারিয়ে যাচ্ছে বাংলা ও বাঙালির নিজস্ব সঙ্গীত-সংস্কৃতি। বিকৃতভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে ভক্তিমূলক গানকেও। তার চেয়েও বড়ো কথা, শব্দের পরিমিত সীমার ধার ধারছে না ডিজের সাউন্ড। যা নিষিদ্ধ শব্দবাজির চেয়েও ভয়াবহ। ভারতের ‘শব্দদূষণ বিধিমালা-২০০০’কে গাইড লাইন ধরে সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড (সিপিসিবি) সামাজিক পরিবেশকে চারটি এলাকায় ভাগ করে স্পষ্ট করে দিয়েছে, কোন এলাকায় কত ডেসিবেল শব্দ গ্রহণযোগ্য। বলা হয়েছে, শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ ডেসিবেল, রাতে ৭০ ডেসিবেল। বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৬৫ ডেসিবেল, রাতে ৫৫ ডেসিবেল। আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ ডেসিবেল, রাতে মাত্র ৪৫ ডেসিবেল। আর নীরবতা অঞ্চল অর্থাৎ, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল, কলেজ সংলগ্ন এলাকায় দিনে ৫০ ডেসিবেল ও রাতে মাত্র ৪০ ডেসিবেল। এই গাইড লাইন লঙ্ঘন করলেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নিষিদ্ধ শব্দবাজির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যদিও রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ তাদের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে শব্দবাজির মাত্রা ১২৫ ডেসিবেল পর্যন্ত বাড়িয়েছে। আগে ছিল ৯০ ডেসিবেল। ফলে, বাজির শব্দের মাত্রা ১২৫ ডেসিবেল পার করলেই সেটা নিষিদ্ধ শব্দবাজি। কিন্তু ডিজের শব্দ-মাত্রা কোনও মানদণ্ডকেই কেয়ার করে না। যেখানে ডিজের প্রতিযোগিতা চলে, সেখানে ১২৫ ডেসিবেলকে অনেক পিছনে ফেলে ছাড়িয়ে যায় শব্দের মাত্রা। পাশাপাশি, এটাও মনে রাখা দরকার, শব্দবাজি কিন্তু একনাগাড়ে শব্দের মাত্রা লঙ্ঘন করে না। একটা কিংবা দু’টো বাজি ফাটার পর কিছু সময় বিরাম থাকে। ডিজে কিন্তু একটানা চলতেই থাকে। অথচ, নিষিদ্ধ শব্দবাজি নিয়ে পুলিশ-প্রশাসন যতটা তৎপর, ঠিক ততটাই উদাসীন ডিজের শব্দ নিয়ন্ত্রণে।
ডিজে সাউন্ডের কুপ্রভাব নিয়ে রীতিমতো উদ্বিগ্ন চিকিৎসক মহল। তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ‘ডিজের আওয়াজ মানুষকে চিরকাল শয্যাশায়ী করে দিতে পারে! হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক। ব্রেনস্ট্রোকে আক্রান্তদের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। শুধু মানব জীবনে নয়, ডিজের উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বিট আওয়াজ পিকনিক স্পটের পাখি ও অন্যান্য প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনচক্রেও ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।
সময় এসেছে, এই বিদেশি ‘ব্রেকবিট’ কালচারকে অবিলম্বে বর্জন করার। উপায় খুঁজতে হবে আমাদেরকেই। ফিরতে হবে বাংলার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে। সঙ্গে অবশ্যই জনসচেতনতা বৃদ্ধির আন্দোলন। আর অবশ্যই প্রয়োজন পুলিশ-প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা।