নিজস্ব প্রতিনিধি, বর্ধমান: তখন অবিভক্ত বর্ধমান জেলায় লালপার্টির দাপট। সালানপুর থেকে কেতুগ্রাম, সর্বত্রই বাম নেতাদের ইশারায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে যেত। সেই জমানায় বিজেপির ঝাণ্ডা ধরে এগিয়ে গিয়েছিলেন নরেশ কোনার, সাক্ষী গোপাল ঘোষ, দেবীপ্রসাদ মল্লিকের মতো বহু নেতা। বামেদের প্রবল দাপটেও দলের ঝাণ্ডা ধরতে ভয় করেননি। সেই বাম জমানার অবসান হয়েছে। যে বাংলায় এক সময় বিজেপির তিন থেকে চার শতাংশ ভোট ছিল, সেখানে তারা ৩৭ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছে। অন্য দল থেকে নতুন নেতারা এসেছেন। শুধু ব্রাত্য থেকে গিয়েছেন সেই প্রবীণ নেতারা। যাঁদের কোনো কথা এখন আর দলে গুরুত্ব পায় না। কোনো কোনো প্রার্থী হয়তো তাঁদের কাউকে কাউকে প্রচারে ডাকছেন ঠিকই কিন্তু সেই আন্তরিকতা নেই। যা দেখে প্রবীণদের অনেকেই বলছেন, তৃণমূলকে দেখে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বর শিক্ষা নেওয়া উচিত। তারা প্রার্থী তালিকায় নতুনদের জায়গা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু পুরনোদেরও সম্মান দিয়েছে।
সেসব কঠিন সময়ের কথা শোনাচ্ছিলেন প্রবীণ বিজেপি নেতা নরেশ কোনার। তিনি বলেন, অবিভক্ত জেলার সভাপতি থাকার দৌলতে কাটোয়া থেকে কুলটি, সর্বত্রই চষে বেড়িয়েছে। দল আমাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারত। এখন যারা দল করছে, তারা তো সেই দুর্দিন দেখেনি। বিজেপি করার অপরাধে অনেক খেসারত দিতে হয়েছে। কিন্তু দল ছেড়ে যায়নি। দলের আর এক প্রবীণ নেতা সাক্ষী গোপাল ঘোষের আক্ষেপ, হয়তো আমরা দলকে আমাদের গুরুত্ব বোঝাতে পারেনি। আমিও অবিভক্ত বর্ধমান জেলায় সর্বত্র সংগঠন বিস্তারের কাজ করে গিয়েছি। দাল এখন যা ভাল বুঝেছে, সেটাই করেছে। দলীয় সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, কয়েক দিন আগে প্রবীণ নেতাদের কয়েকজন রাজ্য নেতৃত্বর সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের সান্ত্বনা দিয়ে জেলায় পাঠানো হয়েছে। দল ক্ষমতায় এলে প্রবীণদের জায়গা দেবে বলে তাঁদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই আশ্বাসে অনেকের ভরসা নেই। দলের আর এক প্রবীণ নেতা বলেন, প্রার্থী তালিকায় নব্যদেরই দাপট রয়েছে। যাঁরা অন্য দল থেকে এসেছেন, তাঁদেরকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেউ সিপিএম আবার কেউ বিজেপি থেকে এসে এই জেলাতেই প্রার্থী হয়েছেন। বিজেপির একাংশের দাবি, এই দলে কাজ মিটে গেলে আর প্রবীণদের গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তার বড়ো প্রমাণ লালকৃষ্ণ আদবানি। শুধু পূর্ব বর্ধমান নয়, অন্য জেলাগুলিতেও ছবিটা অন্য রকম। আদি নেতাদের অভিমান ভাঙাতে ভিনরাজ্যের পর্যবেক্ষকদের কালঘাম ছুটে যাচ্ছে। তাঁরা ফোনে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাতে লাভ হচ্ছে না। প্রবীণদের অনেকেই বলছেন, ২০২১ সালের নির্বাচনেও আদিদের গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তার ফল কী হয়েছে, তা রাজ্যের বাসিন্দারা দেখেছেন। এবারও তারই পুনরাবৃত্তি হবে না তো? এখন সেই প্রশ্নই প্রবীণদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।