আন্টার্কটিকা। নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রাশি রাশি বরফের ছবি। সঙ্গে পেঙ্গুইন আর সিল। হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় তারা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। সিনেমা হোক বা কার্টুন। এই দৃশ্যের সঙ্গে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। চারদিক ধবধবে সাদা। সবুজের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। তাপমাত্রা মাইনাস ৯০ ডিগ্ৰি সেলসিয়াস এ পৌঁছে যায়। আর্দ্রতা নেই বললেই চলে। ছ’মাসের বেশি সূর্যের আলো পড়ে না। একটানা সেখানে মানুষের পক্ষে থাকা প্রায় অসম্ভব। থাকার চেষ্টা করলে তুষারঝড়ে মৃত্যু নিশ্চিত। পৃথিবীর দক্ষিণ প্রান্তে রহস্যে ঘেরা এই মহাদেশ কে আবিষ্কার করলেন? ইতিহাসের পাতা ঘেঁটে আজ বরং সেটাই জেনে নেওয়া যাক।
পৃথিবীর দক্ষিণ প্রান্তে যে একটি বড় জমি রয়েছে, সেটা অনেকেই জানতেন। কারণ উত্তর গোলার্ধের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য সেটা প্রয়োজনীয়। এই অজানা দেশের নামও দিয়েছিলেন অ্যারিস্টটল ও টলেমি। ‘টেরা অস্ট্র্যালিস ইনকগনিটা’। অর্থাৎ, ‘দ্য হিডেন সাদার্ন ল্যান্ড’। যেন এক অজানা গোলকধাঁধা। ১৫২০ সালে জাহাজ নিয়ে প্রথমবার দক্ষিণ আমেরিকার শেষ প্রান্তে পৌঁছন ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান। সেখানে থেকে তিনি একটি রাস্তা দেখতে পান। আর খানিকটা বরফ। সেই জায়গা অবশ্য আন্টার্কটিকা থেকে অনেক দূরে। ম্যাগেলান আর এগনোর সাহস দেখাননি। ১৭৭৩ সালে প্রথমবার কুমেরু বৃত্ত অতিক্রম করেন জেমস কুক। চারদিকে বরফের পাহাড় দেখে রীতিমতো অবাক হয়ে যান তিনি। কিন্তু আন্টার্কটিকার মূল ভূখণ্ডের কাছে যেতে পারেননি তিনি। ১৮২০ সালে অবশেষে আন্টার্কটিকার সন্ধান দেন ফেবিয়ান গটিলেব ভন বেলিংসাউসেন নামক এক রুশ অভিযাত্রিক। আন্টার্কটিকায় তো পৌঁছে গেলেন। এবার সেখানে নামবেন কীভাবে? জাহাজ নোঙর করার কোনও নির্দিষ্ট জায়গা নেই। সঙ্গে জলোচ্ছ্বাস আর কনকনে ঠান্ডা হাওয়া। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আড়াই হাজার মিটার উপরে অবস্থিত একটা গোটা মহাদেশ। পৃথিবীর উচ্চতম মহাদেশ। অথচ সেখানে পৌঁছেও ফেবিয়ানকে প্রাণের ভয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল।
১৯০১ সাল। ব্রিটিশ ন্যাশনাল আন্টার্কটিক এক্সপিডিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ক্যাপ্টেন রবার্ট স্কট। সঙ্গে রয়েছেন এডওয়ার্ড উইলসন ও আর্নেস্ট শ্যাকলটন। উদ্দেশ্য দক্ষিণ মেরু স্পর্শ করা। আন্টার্কটিকায় এলেও দক্ষিণ মেরুর কাছে আর যাওয়া হল না।
শুরু হল পরবর্তী অভিযানের প্রস্তুতি। ইতিহাসে এই অভিযান টেরা নোভা এক্সপিডিশন হিসেবে বিশেষ পরিচিত। ১৯১০ সালের ১৫ জুন। কার্ডিফ থেকে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দিল টেরা নোভা। প্রথমে জাহাজে ছিলেন না স্কট। অন্য অভিযানের কাজে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। পরে অন্য একটি জাহাজ ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান সেখান থেকে আন্টার্কটিকাগামী জাহাজে ওঠেন। এই যাত্রায় স্কটের সঙ্গী ছিলেন এডওয়ার্ড উইলসন, লরেন্স ওটেস, হেনরি রবার্টসন বোয়ার্স, এডগার ইভান্স। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে পৌঁছে আবার উইলসনদের সঙ্গে ত্যাগ করলেন স্কট। এদিকে মেলবোর্নে নেমেই একটি টেলিগ্ৰাম পেলেন স্কট। সেটি পাঠিয়েছিলেন নরওয়ের রোয়াল্ড আমুন্ডসেন। টেলিগ্ৰামে আমুন্ডসেন জানান, তিনিও দলবল নিয়ে দক্ষিণ মেরুর অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছেন। স্কট বুঝতে পারলেন, এই যাত্রায় তিনি আর একা নন। আরও এক অভিযাত্রিক তাঁর পিছু নিয়েছেন। রেষারেষি করতেই হবে। তা সত্ত্বেও দৌড় থেকে পিছু হটলেন না স্কট। তিনি বললেন, ‘এর জন্য আমার পরিকল্পনা বদলানোর কোনও প্রশ্নই ওঠে না। দক্ষিণ মেরুতে আগে পৌঁছনোর দৌড়ে শামিল হতে গিয়ে গবেষণার কাজ বিসর্জন দেওয়া সম্ভব নয়।’ নিউজিল্যান্ডে আবার টেরা নোভায় উঠে পড়লেন স্কট। সঙ্গে নিলেন ৩৪টি কুকুর, ১৯টি সাইবেরিয়ান ঘোড়া আর তিনটি মোটর চালিত স্লেজ। শুরু হল এক দীর্ঘ যাত্রা। মাঝপথে আচমকা এক বীভৎস ঝড়ের সম্মুখীন হন টেরা নোভার সদস্যরা। ঝড়ে দু’টি ঘোড়া ও একটি কুকুরের মৃত্যু হল। একইসঙ্গে ১০ হাজার কেজি কয়লা আর ৩০০ লিটার পেট্রল নষ্ট হয়। তা সত্ত্বেও যাত্রা বন্ধ হয়নি। বরফ ঠেলে এগিয়ে যেতে থাকে জাহাজ। এক সময় আমুন্ডসেনের তাঁবুও দেখতে পান স্কট। ডায়েরিতে তিনি লিখছেন, ‘ভয় না পেয়ে দেশের জন্য কাজ করে যেতে হবে।’ অবশেষে ১৯১২ সালের ১৭ জানুয়ারি দক্ষিণ মেরু পৌঁছলেন স্কট। সেখানেই পৌঁছেই তিনি দেখলেন, আগেই নয়ওয়ের পতাকা পুঁতে রেখেছেন আমুন্ডসন। ১৯১১ সালের ১৪ ডিসেম্বর গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছিলেন নরওয়ের এই অভিযাত্রিক। স্কটের থেকে ৩৪ দিন আগে। হয়তো সেই মুহূর্ত থেকেই টেরা নোভার সদস্যদের গ্ৰাস করতে থাকে হতাশা। ফেরার পথে তুষার ধসের কবলে পড়ে স্কটদের দল। লরেন্স তো নিজেই তাঁবু ছেড়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। পরে ১৯১২ সালের ১২ নভেম্বর বরফের তলা থেকে স্কট, বোয়ার্স ও উইলসনের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। একইসঙ্গে স্কটের ডায়েরি সহ আরও বেশকিছু ব্যক্তিগত সামগ্ৰীও উদ্ধার করে অ্যাটকিনসনের দল। আমুন্ডসনদের পরিণতি স্কটদের মতো হয়নি। অভিযান সম্পন্ন করে ফিরে এসেছিলেন তাঁরা।
রবার্ট স্কটদের সঙ্গেই প্রথম সারিতে রয়েছেন ডগলাস মাওসন। অস্ট্রেলিয়ার এই ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ভূতত্ত্ববিদও আন্টার্কটিকা পাড়ি দিয়েছিলেন। সেই কাহিনিও রোমাঞ্চে ভরা। ১৯১২ সালের ১০ নভেম্বর আন্টার্কটিকা উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন তিনি। সঙ্গী বেলগ্ৰেভ নিনিস ও জেভিয়ের মার্টজ। তিনটি স্লেজ টানার জন্য ১৬টি হাস্কি প্রজাতির কুকুরের ব্যবস্থা করা হয়। সঙ্গে প্রায় ৮০০ কেজি খাবার। প্রথমদিকে সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগচ্ছিল। ১৩ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ৪৮০ কিমি পথ অতিক্রম করা হয়ে গিয়েছিল। তবে সবকিছু তো আর মনের মতো হয় না। যাত্রার মাঝে তিনবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন নিনিস। এরপর কয়েকটি হাস্কি কুকুর অসুস্থ হয়ে পড়ে। ১৩ ডিসেম্বর একটি হিমবাহের মাঝখানে তাঁবু স্থাপন করেন মাওসন। পরদিন আবার শুরু হয় যাত্রা। হঠাৎ মাওসন দেখেন, মার্টজ দাঁড়িয়ে পড়েছেন। স্কি পোল দিয়ে তিনি বোঝানের চেষ্টা করেন যে সামনে বরফের তলায় ফাটল রয়েছে। নিনিসকে সতর্ক করার আগেই মাওসন দেখেন, স্লেজ ও কুকুর নিয়ে তিনি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছেন। নাম ধরে ডাকলেও ফিরে আসে শুধু ফাঁকা প্রতিধ্বনি। ৫০ মিটার নীচে একটি খাদে একটি আহত কুকুরের সন্ধান মেলে। কিন্তু নিনিসকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বরফের সেই ফাটল বা ক্রেভাসে পড়েই তাঁর মৃত্যু হয়। দেখতে দেখতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকে। ধীরে ধীরে চলার শক্তি হারান মার্টজ। কয়েকদিন পর তিনিও মারা যান। মাওসনের ডায়েরিতে তার উল্লেখ রয়েছে। বন্ধুকে বরফে সমাধিস্থ করে আবার যাত্রা শুরু করেন মাওসন। পথে মাঝেমধ্যেই ধেয়ে আসছে তুষারঝড়। একসময় মাওসনের পক্ষেও হাঁটাচলা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক কষ্টে বেস ক্যাম্পে পৌঁছন।
এভাবেই বহু বছর ধরে আন্টার্কটিকার রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা চালিয়েছে মানুষ। আজও সেখানে অত্যাধুনিক তাঁবু খাটিয়ে গবেষণার কাজ চলে। দক্ষিণ মেরুতে হাজির হন অভিযাত্রীরা। এত কিছুর পরেও আন্টার্কটিকার অনেক রহস্যের আজও সমাধান হয়নি।