রাজদীপ গোস্বামী, মেদিনীপুর: উত্তাল অগ্নিযুগে এই জমিদার বাড়িই ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আনাগোনার অন্যতম ঠিকানা। এই বাড়িতে বসেই ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ছক কষতেন বিপ্লবীরা। মেদিনীপুর শহরের মল্লিক চক এলাকার সেই মল্লিক বাড়ির দুর্গাপুজো ঘিরে আজও উন্মাদনা রয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে এই পুজোর বহু পুরানো রীতির বদল ঘটে গিয়েছে। এবার বন্ধ হতে চলেছে বিজয়া দশমীতে বেহারার কাঁধে করে দেবীর প্রতিমা নিরঞ্জনের ঐতিহ্যবাহী প্রথা।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘ বছর ধরে দশমীর দিন বসিয়ে বেহারাদের কাঁধে করে মাতৃ প্রতিমা বিসর্জনের জন্য নিয়ে যাওয়া হত। প্রতিবছর সেই দৃশ্য দেখতে বহু মানুষ রাস্তার দু’ধারে ভিড় জমাতেন। কিন্তু বর্তমানে একসঙ্গে এতজন বেহারা জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি এই প্রথা বজায় রাখতে বাড়তি টাকাও খরচা হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা এবার পুরানো রীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জানা গিয়েছে, এই পরিবারের পাঁচ শরিক প্রতিবছর পালা করে পুজোর আয়োজন করে থাকে। পুজোর সময় পাঁচ শরিকের সদস্যরাই অংশ নেন।
এবছর মল্লিকবাড়ির সুদীপ মল্লিক ও তাঁর পরিবার পুজোর আয়োজন করছে। সুদীপবাবুর কথায়, সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই হারিয়ে গিয়েছে। পুজোর রীতিনীতিতেও এসেছে পরিবর্তন। প্রতিপদ থেকেই ঘটে পুজোর সূচনা হয়। দশমীর দিনেই হয় বিসর্জন। এতদিন বেহারার কাঁধে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হলেও এবার সেই প্রথা থাকছে না।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রায় তিনশো বছর আগে পূর্বপুরুষ জন্মেঞ্জয় মল্লিকের হাত ধরে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। একসময় মল্লিক বাড়ির পুজো দেখতে দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ ভিড় জমাতেন। পরবর্তী সময়ে পরিবারের সদস্য বিষ্ণুপদ মল্লিক পুজোর দায়িত্ব সামলেছিলেন। তৎকালীন সময়েও এই পরিবারের অনেকেই ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। এই পরিবারের অনেক সদস্য বন্দুক চালনাতেও পারদর্শী ছিলেন বলে জানা যায়। এছাড়া একসময় এই জমিদার বাড়িতে পুজোর সময় কামান দাগার রীতিও চালু ছিল। তবে সেই কামানের শব্দ আজ ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে। মল্লিক বাড়ির দুর্গাপ্রতিমা এখনো সাবেকি রীতিতেই হয়। বংশ পরম্পরায় কয়েক প্রজন্ম ধরে মৃৎশিল্পী শম্ভু ঠাকুর এই বাড়ির দালানে প্রতিমা গড়ে আসছেন। এবছরও ঠাকুর তৈরির কাজ চলছে জোরকদমে। এই পরিবারের সদস্যরা দুর্গাপুজোর পাশাপাশি রাস পূর্ণিমা, সরস্বতী পুজো এবং রথেরও আয়োজন করে। এই জমিদার বাড়ির দুর্গামন্দিরের পাশেই রয়েছে রাধাকান্ত জিউয়ের মন্দির।এই পুজোয় বলি প্রথা নেই। তার পরিবর্তে বিভিন্ন সবজি বলি দেওয়ার রীতি আজও চালু রয়েছে। মেদিনীপুর শহর লাগোয়া মোহনপুর এলাকার বাসিন্দা সত্যম রায় বলেন, মল্লিক বাড়ির আনাচে-কানাচে স্বাধীনতা সংগ্রামের নানা ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। এই বাড়ির মা দুর্গা খুবই জাগ্রত। সন্ধিপুজোর সময় নানা অলৌকিক ঘটনার কথাও শোনা যায়। -নিজস্ব চিত্র