Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

উত্তরবঙ্গে বিপর্যয়

দু’বছর আগের কথা। সিকিমের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে দক্ষিণ লোনক হ্রদ বিপর্যয়ে তিস্তার ভয়াবহ ধ্বংসলীলার সাক্ষী থেকেছে পাহাড় থেকে সমতল। ফের একবার বিপর্যয় আছড়ে পড়ল আমাদের ঘরে। উত্তরবঙ্গের পাহাড়-ডুয়ার্সে।

উত্তরবঙ্গে বিপর্যয়
  • ১২ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ব্রতীন দাস:
• দু’বছর আগের কথা। সিকিমের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে দক্ষিণ লোনক হ্রদ বিপর্যয়ে তিস্তার ভয়াবহ ধ্বংসলীলার সাক্ষী থেকেছে পাহাড় থেকে সমতল। ফের একবার বিপর্যয় আছড়ে পড়ল আমাদের ঘরে। উত্তরবঙ্গের পাহাড়-ডুয়ার্সে। সরকারি হিসেবে মৃত ৩৬। ঘরে ঘরে স্বজনহারার কান্না। গৃহহীন হাজার হাজার মানুষ। ধসে গিয়েছে রাস্তাঘাট, সেতু। জলের তোড়ে ডুয়ার্সের গোরুমারার জঙ্গল থেকে গন্ডার ভেসে চলে গিয়েছে বাংলাদেশে! ১৪০ কিমি দূরে ওপার বাংলার কুড়িগ্রামে জলঢাকা নদীতে উদ্ধার হয়েছে সেই গন্ডারের দেহ। যা ক্ষতি হয়েছে, কবে তা পূরণ হবে, জানা নেই।
এটা ঠিক, অল্প সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক অতিবৃষ্টি হয়েছে পাহাড় ও ডুয়ার্সে। সেইসঙ্গে সিকিম ও ভুটান পাহাড়ে প্রবল বর্ষণের কারণে হঠাৎ করে জল বেড়েছে ডুয়ার্সের নদীগুলিতে। দেখা দিয়েছে হড়পা বান। সঙ্গে পাহাড়ে ভূমিধস। নিশ্চিহ্ন একাধিক গ্রাম। শুধু কি অতিবৃষ্টির কারণেই এই বিপর্যয়? হিমালয়ান নেচার অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার ফাউন্ডেশনের কো-অর্ডিনেটর তথা পরিবেশবিদ অনিমেষ বসুর কথায়, পাহাড়ি ঝোরা বন্ধ করে কংক্রিটের নির্মাণ করলে, জল বেরনোর জায়গা না থাকলে তো এটাই হবে! আগে পাহাড়ে ছোটো ছোটো কাঠের বাড়ি ছিল। এখন বহু জায়গায় অট্টালিকা গড়ে উঠছে। সেসব করতে গিয়ে পাহাড়ের গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। দার্জিলিং পাহাড়ের এই ভার বহনের ক্ষমতা নেই। সেটা না বুঝেই ক্রমাগত চাপ বাড়িয়ে চলেছি আমরা।
পাহাড় ও ডুয়ার্স। একদিকে চিরতুষারাবৃত মোহময়ী কাঞ্চনজঙ্ঘা, সবুজে ঘেরা চা বাগান, টয়ট্রেন। অন্যদিকে জঙ্গল, পাহাড়ি নদী, প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের বিশাল ক্যানভাস। এরই টানে বারবার ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসুরা। কিন্তু সেই পাহাড়-ডুয়ার্সের বুকেই আজ প্রকৃতির কষাঘাত। এর আগেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়েছেন পাহাড়-ডুয়ার্সের মানুষ। কিন্তু এবারের বিপর্যয়ের ব্যাপকতা এতটাই যে, সবাই একবাক্যে স্বীকার করছেন, এটা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, প্রকৃতির প্রতিশোধও বটে!
গঠনগত দিক থেকে দার্জিলিং পাহাড় মূলত সাব-হিমালয়ান অঞ্চল। হিমালয়ের অন্য অংশের তুলনায় এই অঞ্চল বরাবরই বেশি ধসপ্রবণ। বয়সে নবীণ এই পাহাড়ে বিস্তর চ্যুতি (ফল্ট) রয়েছে। সেকারণে সে বেশি অস্থির। ভূ-পদার্থবিদদের দাবি, বেশ কয়েক বছর আগে নেপালে বড়ো মাপের দু’টি ভূমিকম্পের সময় ভূ-স্তরের ইন্ডিয়ান প্লেট ঢুকে গিয়েছিল ইউরেশীয় প্লেটের ভিতরে। যার প্রতিক্রিয়ায় ছোটোখাটো পরমাণু বোমার সমান শক্তি উৎপন্ন হয়। সেই শক্তি যে পুরোপুরি মিলিয়ে গিয়েছে, এমনটা নয়। ফলে নিজেকে জাহির করতে মাঝেমধ্যেই নেপালে কম্পন হয়। নড়ে ওঠে দার্জিলিং পাহাড়ও। এর জেরে পাহাড়ে একাধিক চিড় ধরেছে। তা দিয়ে ঢুকছে বৃষ্টির জল। আলগা হচ্ছে মাটি। নামছে ধস।
শুধু পাহাড় কেন, ডুয়ার্সই বা কম যায় কীসে! চিলাপাতায় হোম স্টে’র নামে জঙ্গলের গায়ে কার্যত রিসর্টের ‘মেলা’। লাটাগুড়ি, মূর্তিতেও পর্যটনের নামে জঙ্গল ঘিরে তৈরি হয়েছে বড়ো বড়ো বিল্ডিং। কংক্রিটের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে একটু ভালোভাবে শ্বাস নেওয়ার জন্যই তো পর্যটকরা ছুটে আসেন ডুয়ার্সে, তাহলে সেখানে আবার কংক্রিটের জঙ্গল তৈরি করা কেন? প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রাই। রেহাই পাচ্ছে না ডুয়ার্সের নদীগুলিও। নিজের ছন্দে বয়ে চলা একটা নদীর প্রবাহকে বদলে দেওয়ায় সে সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছে।
দেশ-বিদেশের পর্যটকরা সারা বছর ভিড় জমান পাহাড়-ডুয়ার্সে। উত্তরের বাসিন্দারাও চান, পর্যটন বাড়ুক। কারণ, টি, টিম্বার আর ট্যুরিজম নিয়ে যে উত্তরবঙ্গ, তার মধ্যে কাঠের ব্যবসা আর নেই। চায়ের বাজারও ভালো নয়। পর্যটনে ভর করেই ঘুরে দাঁড়াতে পারে উত্তরের অর্থনীতি। কিন্তু পর্যটনের নামে একশ্রেণির মানুষ যেন প্রকৃতির উপর কার্যত অত্যাচার করে চলেছে। নদীখাত দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে বিলাসবহুল হোটেল ও রিসর্ট। চুরি হয়ে যাচ্ছে রিভার বেড। যার জেরে কোথাও কোথাও বদলে যাচ্ছে নদীর গতিপথ। মূর্তি নদীর কথাই ধরা যাক। একেবারে নদীর গায়ে গজিয়ে উঠেছে একাধিক রিসর্ট। নিয়ম অনুযায়ী, নদীবক্ষ থেকে অন্তত দেড়শো মিটার দূরে নির্মাণ করার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে কোথায়? কাগজপত্রেরও বালাই নেই।
২০২৩ সালের অক্টোবরে সিকিমে শুধু দক্ষিণ লোনক হ্রদ বিপর্যয় হয়নি, ভেসে যায় চুংথাং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও। জলের তোড়ে সেই ধ্বংসাবশেষ এসে জমা হয় তিস্তায়। দু’বছরেও তিস্তার বুক থেকে সেসব তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ সংস্থার সমীক্ষায় দাবি করা হয়, ২০২৩ সালের ওই বিপর্যয়ের জেরে মেল্লিতে তিস্তাগর্ভ প্রায় ৩০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়ে গিয়েছে। ওই এলাকাতেই তিস্তায় সবচেয়ে বেশি ধ্বংসাবশেষ জমা হয়ে রয়েছে। ফি বছর বর্ষায় তা একটু একটু করে নামিয়ে আনছে নীচে। সেচদপ্তরের সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ২০২৩ সালে সিকিমে হ্রদ বিপর্যয়ের পর সমতলে তিন থেকে আট ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়েছে তিস্তা। এখন ভারী বৃষ্টি হলেই ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের উপর দিয়ে বইতে থাকে নদী। জায়গায় জায়গায় নামে ধস। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। একদিকে সেভক-রংপো ৪৫ কিমি পথে ট্রেন চালানোর জন্য পাহাড় কেটে টানেল নির্মাণ। অন্যদিকে তিস্তার আগ্রাসন। এই দু’য়ের জেরে আগামী দিনে শিলিগুড়ি-সিকিমের লাইফলাইন ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের অস্তিত্ব থাকবে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। সেচদপ্তরের সমীক্ষায় আরও ধরা পড়েছে, সিকিমে বারবার বিপর্যয়ের জেরে ঘন ঘন গতিপথ বদলাচ্ছে খরস্রোতা তিস্তা। কখনও বাঁদিকে, কখনও আবার ডানদিকে বাঁক নিচ্ছে। সেচদপ্তরের আধিকারিকরা বলছেন, আগে যেখানে দেখা যেত দীর্ঘ বছর পর তিস্তার মূল জলধারা গতিপথ বদলায়, সেখানে সিকিমে হ্রদ বিপর্যয়ের পর থেকে তিস্তা যেন অস্থির হয়ে উঠেছে। এরই জেরে ঘনাচ্ছে বিপদ। সেভকের কাছেই তিস্তা গতিপথ বদলে ঢুকে এসেছে ডানদিকে। লালটং বস্তি ও চমকডাঙি গ্রাম দু’টি হারিয়ে গিয়েছে মানচিত্র থেকে। সেখানকার বাসিন্দাদের পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছে। ক্রান্তির চ্যাংমারিতে এসে আবার বাঁদিকে বাঁক নিয়েছে তিস্তা। ফলে সেখানেও বিপন্ন জনপদ। গজলডোবার কাছে মিলনপল্লি এলাকায় তিস্তা ডানদিকে ঘুরে যাওয়ায় বর্ষা এলেই বিপদের প্রহর গোনেন বাসিন্দারা। ময়নাগুড়িতে তিস্তা বাঁদিকে বাঁক নেওয়ায় বিপদের মুখে বাঁকালির বাসিন্দারা। ভুটান পাহাড়েও লাগাতার নির্মাণ, একের পর এক জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বড় রাস্তা তৈরির জন্য যেভাবে পাহাড় ফাটানো হচ্ছে, ডলোমাইট উত্তোলন করা হচ্ছে, তাতে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পড়শি দেশের পাহাড় থেকে ডুয়ার্সে নেমে আসা নদীগুলি। প্রচুর পরিমাণে পাথর বয়ে এনে সেগুলি জমা করছে ডুয়ার্সে। যোগীখোলা, শিসামারার মতো নদী জনপদের থেকে অনেকটাই উঁচু দিয়ে বইছে।
ডুয়ার্সে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করার নেপথ্যে বড়ো ভূমিকা রয়েছে বালি মাফিয়াদের। সরকারি নির্দেশিকা না মেনেই নদী থেকে তোলা হচ্ছে বোল্ডার, বালি। তাদের দাপট এতটাই যে, বালি পাচার বন্ধ করতে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন আধিকারিকরা। দিনের পর দিন অবৈধভাবে বালি, পাথর উত্তোলনের ফলে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে নদী ও পরিবেশের। বদলে যাচ্ছে নদীর গতিপথ। বাড়ছে ভাঙন। নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে চাষের জমি, চা-বাগান। ডুয়ার্সের চেল-ঘিস হোক বা তিস্তা-মাল বা ময়নাগুড়ির জর্দা নদী, ছবিটা সর্বত্র একই। এবারের বিপর্যয়ে আগ্রাসী বালাসনের জলের তোড়ে ভেঙে পড়েছে দুধিয়ায় লোহার ব্রিজ। সেতুর নীচ থেকে মাটি সরে বিচ্ছিন্ন দার্জিলিংয়ের বিজনবাড়ি, পুলবাজার। বিচ্ছিন্ন পর্যটকদের পছন্দের ডেস্টিনেশন তাবাকোশি। ধস বিধ্বস্ত রোহিনী রোড। মিরিকেও মারণ ধস। বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে গিয়ে অনেকেই ‘ভিলেন’ বানিয়ে দিচ্ছেন পাহাড়ি গ্রামে তৈরি হওয়া হোম স্টেগুলিকে।
এটা সত্যি যে, বছর কুড়ি আগে পাহাড়ে হোম স্টে শুরু হয়। তখন অল্প কিছু গ্রামে দু-একটা হোম স্টে ছিল। এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিয়ম চুলোয় তুলে পাহাড়ের প্রায় সব গ্রামে হোম স্টে। আর হোম স্টে মানে পাহাড়ের ঢালে পাকা বিল্ডিং। কোনওটা একতলা, কোনওটি দোতলা বা তিনতলা। তবে হোম স্টে’র সংখ্যা বৃদ্ধির কারণেই যে পাহাড়ে বিপর্যয় বাড়ছে, তা মানতে নারাজ অ্যাসোসিয়েশন ফর কনজারভেশন অ্যান্ড ট্যুরিজমের আহ্বায়ক রাজ বসু। তিনি বলেন, আগে পাহাড়ি গ্রামে ঘরের নকশা দেখে বলে দেওয়া যেত, কোনটা লেপচাদের বা কোনটা ভুটিয়াদের বাড়ি। এখন বেশিরভাগই পাকাবাড়ি। সেই বাড়ির একটা বা দু’টো ঘর নিয়ে চলছে  হোম স্টে। বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে এগুলিকে দাগিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। তবে অনেকেই রয়েছেন, যাঁরা বাইরে থেকে এসে পাহাড়ে জমি কিনে বা লিজ নিয়ে দোতলা, তিনতলা বাড়ি বানিয়ে সেটিকে হোম স্টে বলছেন। আমাদের বক্তব্য, পাহাড়ের মানুষ যাঁরা বোঝেন, কীভাবে বাড়ি বানালে বিপদের আশঙ্কা কম। তাঁরা সেইমতো হোম স্টে বানান। বাইরে থেকে যে কেউ শহর থেকে মিস্ত্রি নিয়ে এসে পাহাড়ে বিল্ডিং বানিয়ে হোম স্টে খুলে বসবেন, এটা বন্ধ হওয়া উচিত।
ধসে বিধ্বস্ত ডুয়ার্সও। জলদাপাড়ায় ভেসে গিয়েছে হলং নদীর উপর সেতু। ভেঙে পড়েছে লুকসান ব্রিজ। বামনডাঙা চা বাগানের মডেল ভিলেজ ছারখার। পরিবেশপ্রেমীদের আক্ষেপ, ডুয়ার্সের ঘন জঙ্গল এখন অনেকটাই ফিকে। উন্নয়নের নামে কাটা হচ্ছে গাছ। তৈরি হচ্ছে একের পর এক হোটেল, রিসর্ট। কোথাও আবার চোরাগোপ্তাভাবে গাছ কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ। সেসব গাছ কি পাচার হচ্ছে? দুর্যোগে তোর্সা নদীতে ভেসে আসা কাঠের বহর সেই জল্পনা উসকে দিয়েছে। বনদপ্তর অবশ্য বলছে, ওই কাঠ ভুটানের। তার পরেও সন্দেহ কাটছে না। বনদপ্তরের বক্তব্য সত্যি হলেও ডুয়ার্সের প্রকৃতি যে আহত, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

Advertisement


• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : উজ্জ্বল দাস

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ